বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

শাশ্বতী সরকার

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
অহল্যা
প্রাতঃভ্রমণে যেতে যেতে পাহাড়ী পথে দেখা হয়ে গেল দুজনের। দুমাস আগে একটা আর্ট একজিবিশনে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ইন্দ্র ও অহল্যার। তখনই ইন্দ্রকে খুব ভাল লেগেছিল। লম্বা,স্মার্ট, সুদর্শন ও অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি বলে মনে হয়েছিল। অহল্যা একটু সময় কাটাতে চাইল ইন্দ্রর সাথে,তাই সিগারেট বক্সটা বার করে ইন্দ্রকে অফার করল। ইন্দ্র বলল, আরে এই জন্যই একটু বেরিয়েছি, সিগারেট শেষ।লাইটারটা বের করে জ্বালিয়ে ইন্দ্র অহল্যার সামনে ধরল, তারপর নিজেরটা ধরাল। জানা গেল ইন্দ্রর বন্ধুদের একটা বিশাল দল এসেছে ,গ্যান্টক ঘুরে এসে কালিম্পঙের একটা হোটেলে উঠেছে দুদিনের জন্য। অহল্যা জানাল গরমের ছূটিটা একটু নিরিবিলিতে কাটানোর জন্যই এসেছে, একসপ্তাহ থাকবে। পরীক্ষার খাতা দেখার চাপও আছে। কোন্‌ হোটেলে কত নম্বর ঘরে আছে অহল্যা ইন্দ্র জেনে নিল। অহল্যা আজ একটু গভীরভাবেই ইন্দ্রকে দেখছিল। ইন্দ্র স্বাভাবিকভাবেই সিগারেটের ধোঁয়া অন্যদিকে ছাড়তে ছাড়তে সেদিকে তাকিয়েই কথা বলছিল।অহল্যার চোখে ঘোর লাগল, মনে হল এই সেই মানুষ যাকে সে খুঁজছে। যাকে পেলে জীবনটা আবার নতুন করে অন্যভাবে সাজিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু ইন্দ্র বিবাহিত এবং দাম্পত্য জীবন বেশ সুখের। ইন্দ্র কেন রাজী হবে অন্য একটা সম্পর্কে জড়াতে! অথচ অহল্যার অতসব ভাবার ইচ্ছে বা সময় নেই। আপাততঃ ইন্দ্রকে ছাড়া অহল্যা এই মুহুর্তে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার কোন রাস্তা পাচ্ছে না। জেনে নিল ওরা পরের দিন কখন রওনা দেবে? সন্ধ্যায় হোটেলে চায়ের নিমন্ত্রণ করল। ইন্দ্র একটু ইতঃস্তত করলেও এত ভাল মানুষ যে কাউকে না বলতে পারে না, সুতরাং রাজী হল। অহল্যা সারাদিনে ঠিক করে নিল পরিস্থিতিকে কিভাবে হ্যান্ডেল করবে,বলতে কি মনে মনে একটা ছক কষে নিল। 

বাদ সাধল সন্ধ্যায় ইন্দ্র যখন তার এক মহিলা বন্ধুকে নিয়ে আসল সঙ্গে। ইচ্ছে করেই নিয়ে এসেছে কারণ একজন স্বল্প পরিচিত মহিলার সঙ্গে বন্ধ ঘরে সময় কাটালে নানারকম কথা উঠতে পারে তাই একজন সাক্ষী থাকা ভাল। অহল্যার সমস্ত প্ল্যান চৌপাট হয়ে গেল।অপ্রয়োজনীয় হাল্কা নানা কথায় কাটিয়ে সন্ধ্যেটা পুরো মাটি হয়ে গেল, খাতা দেখলেও বোঝা কিছুটা কমত। কিন্তু বুদ্ধি করে ইন্দ্রর ফোন নাম্বারটা নিয়ে রাখল অহল্যা, ইন্দ্রও সেভ করে নিল অহল্যার নম্বর। এছাড়া বলল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে, ওখানেও যোগাযোগ করা যেতে পারে। ইন্দ্ররা ফিরে যেতেই অহল্যা তাড়াতাড়ি ফেসবুকে খুঁজে খুঁজে ইন্দ্রকে বের করে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। প্রোফাইল পিকে কি হ্যান্ডসাম লাগছে ইন্দ্রকে –প্রাণভরে দেখতে লাগল অহল্যা। কভার পিকে গিয়ে চোখ আটকে গেল। ইন্দ্রর স্ত্রী এবং তার বাবা মা-র ছবি খুব সুন্দর পাহাড়ী ব্যাকগ্রাউন্ডে। স্মিতহাসিনী ইন্দ্রর স্ত্রীকে দেখে অহল্যারও খুব ভাল লাগল – যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি ব্যক্তিত্ব, আলাপ করতে ইচ্ছে হয়। আশ্চর্য,অহল্যার কিন্তু কোন ঈর্ষা হল না। সাধারণতঃ ভালবাসা বা ভাললাগার কোন ব্যক্তির স্ত্রীকে দেখলেই অন্য অনুভূতি হওয়ার কথা, নিজের সঙ্গে কম্পেয়ার করে দেখার কথা মানুষ ভাবে। কিন্তু ইন্দ্রকে সত্যিই ভালবেসে ফেলেছে অহল্যা, বড় গভীর সে ভালবাসা। তাই ইন্দ্র সুখী থাকলেই তারও সুখ। ইন্দ্রর এতটুকু ব্যথা যেন সহ্য করতে পারবে না অহল্যা। ইন্দ্রকে ছেড়ে থাকাও সম্ভব নয় অহল্যার পক্ষে।

প্রোফাইল পিকে ইন্দ্রর ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে অহল্যা ফিরে যায় নিজের কাজে। খাতার বান্ডিল নিয়ে বসে। ভারী রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার ফেসবুক চেক করতে গিয়ে দেখে ইন্দ্র রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছে। ইনবক্সে একটা থ্যাঙ্কস জানিয়ে ইন্দ্রর প্রো.পিক ও কভার পিকে লাইক দিয়ে ফিরে আসে। তারপর মোবাইল বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। শেষ রাতে স্বপ্ন দেখে কে যেন তাকে গভীরভাবে আদর করছে, আহ্‌! সুখের সাগরে ভেসে যাচ্ছে অহল্যা,এমন আদরই তো সে চায়। কোন শিল্পী ছাড়া কে করতে পারে এমন আদর? কিন্তু কিছুতেই তার মুখ দেখতে পাচ্ছে না কেন? কে, কে গো তুমি? আহ! আহ! শীৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসে অহল্যা, কিছুক্ষণ যেন ঘোরের মধ্যে থাকে,তারপর উঠে জল খায়,ব্যালকনির ছিটকিনি খুলে রেলিং-এ গিয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। 

সবে ক্ষীণ আলো ফুটতে শুরু করেছে আকাশে। সামনে অনন্ত সৌন্দর্যরাশি বিস্তৃত।এ ই পাহাড় নদী আকাশ – সবাই যেন অনন্ত বিস্ময়ে তাকে দেখছে। মনে পড়ে গেল অনেক কাল আগে দেখা দুটো চোখের কথা। ঝর্‌ঝর্‌ করে জল ঝরতে থাকে অহল্যার চোখ বেয়ে, ঠোঁটদুটো কাঁপতে থাকে তির্‌তির্‌ করে। এমন সময় কোথা থেকে এক পাগলা হাওয়া এসে জড়িয়ে নেয় তাকে ,পরম যত্নে চোখের জল মুছিয়ে দেয়।দূর পাহাড়ের কোল বেয়ে রক্তিম সূর্য মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। 

ধীরে ধীরে অহল্যা আবার ইন্দ্রর ঘোরে ডুবে যেতে থাকে।




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-