বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায় , শর্মিষ্ঠা ঘোষ - ১ মুঠো প্রলাপ
পূর্ব প্রকাশিতর পর... 


কর্ম জীবনে তো ঘুরেছেন অনেক। কখনও ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন? 





ব্যাচেলার লাইফে বলতে গেলে খুব কম ঘুরেছি। চক্রধরপুরে থাকতাম , ওখানেই বাবা রেলে চাকরি করতেন। হয়তো চারপাঁচ বন্ধু ১৬ মাইল উজিযে সাইকেলেই চাইবাসা গেলাম, আবার ফিরলাম। কবি নবেন্দু চক্রবর্তীর সঙ্গে দু-তিন দিনের জন্যে রাঁচী গেলাম। হুডরু ফল্স ও জোনা ফল্স দেখলাম ;তখন তো তরতাজা যুবক। এরকম কিছু বেড়ানো আছে। ৬১ সালে ডি বি কে রেলের চাকরি পেয়ে চলে গেলাম ওড়িষার সুদূর শহর বোলাঙ্গিরের কাছাকাছি একটা প্রান্তিক অজ অন্ধকারময় জায়গায়। ব্রিজ, কালভার্ট, কওয়ার্টারস, বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণকাজে। ৮টা তাঁবু আর একটা বড় অফিসঘর। যাওযা মাত্রই লোকেরা সাবধান করে দিল 'দুধ 'বলবেন না। তবে? বলবেন গুরস্ মানে গোরস আরকি। দুধওয়ালি কে পরে জিজ্ঞেস করেছিলাম মোষের দুধকে কি বলো ! মৃদু হেসে বললো ভৈসা গুরস্। এক খাটিয়ায় আমার বসের সাথেই শুতাম, বিহারী ছেলে, বিবাহিত, কয়েকবছর বড় এই যা ;তবে মাই ডিয়ার বেশ। ওর অনেক কাজ আমিই করে দিযেছি , এতে আবার ওপরের বস একটু কুপিত। জানিনা, হিচ ছিল ---নানা ব্যাপার স্যাপার থাকে। একদিন সকালে ঘুম থেকে সিমেন্টের মেজেয় পা দিয়েছি সবে, দেখি এক বিরাট লম্বা সাপ সোঁ করে ছুটে পালিয়ে গেল তাঁবুর বাইরে। কাটিয়ার নিভৃত আশ্রয়ে তিনিও শুয়েছিলেন। একবার হ্যাঙ্গার থেকে নামিয়ে প্যান্ট পরেছি, দেখি কুটুস -- ছোট খয়েরি কাঁকড়াবিছে পালিয়ে যাচ্ছে। মারলাম চটি দিয়ে, তখন একটা জিপে করে কযেকজন 'জিস দেশ মে গঙ্গা বহতি হ্যায়' দেখতে যাচ্ছি বোলাঙ্গিরে, মোটে ২৬ মাইল দূর ওখান থেকে। দৈনিক কাগজও যেত না। মাছই কচিৎ, হয়তো মুরগি কখনও আর রান্নার লোকটি, বলার কথা নয়। ব্যাচেলার লাইফ বিদেশ বিভূঁইতে এমনিই হতো তখনকার দিনে। সকালে ঘটি নিযে মাঠেই যেতে হতো, মনে হলে এখনও হাসি মনে মনে। ভারতবর্ষের লক্ষকোটি মানুষের এই তো জীবনের হাল। এখন খুব বেশি আর কি পাল্টেছে। দুপুরে একটা বাঁধানো খাতায় লিখতাম এই সব জীবনের কথা নিজের কথা মিশিয়ে। রাতে টিমটিমে বাল্ব জ্বলতো তাঁবুগুলোর মধ্যেখানে। আমাদের সব তাঁবুতে হ্যারিকেন বোধহয়। যাইহোক, মাস পাঁচেক পর চলে এলাম, মা বললো দরকার নেই। ১৩৯ টাকা মাইনে পেতাম। ওপরমহল থাকার অনুরোধ করেছিল ;বলেছিল কোয়ালিফায়েড লোক, চটচট প্রমোশন পেয়ে যাবেন, প্রোজেক্টের কাজ --রেল লাইন পাতা হবে ওই পথ দিয়ে।  চলেই এলাম, কুলি- কামিন, কনট্র্যাকটর ও কলিগদেরও দেখলাম মনটা খারাপ ।

এরপর বাবা-মার কাছে ফিরে আবার বন্ধুদের সাথে জমাটি গল্প, দেশ-এর কবিতা, অন্য পত্রিকা তো রয়েছেই। বোদলেয়ার, বার্ণার্ড শ', গুড আর্থ, বুদ্ধদেব বসুর লেখা, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস, প্রবন্ধ, গল্প --- অন্য ফরাসি কবিদের এক আধজনের লেখা পাগলের মতো পড়ছি আর এক কবি বন্ধুর সাথে আলোচনা, তর্কবিতর্ক। এইভাবেই চলছিল। চাকরিও তো দরকার, সেটাও সিরিয়াসলি ভাবছি। তারপর একসাথেই দুটো ভাল চাকরির দরজা খুলে গেল। কলকাতারটা সরকারি চাকরি, রাওরকেলা স্টিলও তাই। দ্বিতীয়টা কাছে, রেলে দু'ঘন্টার পথ, ওখানেই যোগ দিলাম। প্রথমটা পাবো ভাবিই নি, ওরা আবার কেন জানিনা টেলিগ্রাম করে আমাকে জয়েন করতে বলেছিল। কিন্তু স্টিলে যাব বলে মনস্থির করে ফেলেছিলাম ; ওখানেই চলে গেলাম। ওখানেও অনেক কাজ, খাটুনি। রাতে এসে ব্যাডমিন্টনও খেলতাম, একবার স্টিলে রানার্স-আপও হযেছিলাম, দারুণ ইনডোর কোর্ট। কিন্তু বলেছিলাম না মাথায কেবল নানান পড়াশোনার চিন্তা ঘুরতো, খেলা ছেড়ে দিলাম সকলকে অবাক করে দিয়ে। এরকম উৎকেন্দ্রিকতা (!) তো থাকেই আমার মতো লোকের । ওখানে আমরা ছোটখাটো বেড়িয়েছি ---হীরাকুদ ড্যাম, সম্বলপুর, পানপোষের বেদব্যাসের মন্দির, বাহ্মণি নদী, মন্দিরা ড্যাম এইসব। লেখা হয় নি কোনও বেড়ানোর গল্প, সময় কম আর যেটুকু পেয়েছি অন্যদিকে দিয়েছি। এখানে পাঁচবছর প্রায় চাকরি করেছি। থাকলে অনেক ওপরেই চলে যেতাম কিন্তু কোনওই দুঃখ নেই ; তাহলে আমার আমিকে হয়তো পেতামই না।

হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সের ( কলকাতা পোর্ট ট্রাষ্ট) চাকরিটায় যোগ দিলাম ১৯৬৮ সালে। বিশাল কর্মযজ্ঞ ঠিক, তবে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ যথেষ্টভাবেই থাকল। বাবা-মা বোনরা সিঁথির ভাড়াবাড়িতে, আমার কর্মস্থল হলদিয়ায়।  ৭৬-৭৭ সালে বন্দর চালু হলো। জাহাজ ঢুকতে শুরু করলো। আমরা নির্মাণের গোড়া থেকেই ছিলাম, সুতরাং একটু জোর তো থাকবেই মনে। এখানে পোর্টের কোয়ার্টারে আসি ৭২ সালে (৭১ সালের ফেব্রুয়ারি তে বিবাহ)। 

এবার বেড়ানোর কথায় আসি। বিশদে বলতে গিযে অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথাও চরে আসছে, হযতো দরকারই নেই। হ্যাঁ, হলদিয়ায় চাকরিকালে, অনেক না হলেও বেড়ানো একটু হয়েছেই, কোথাও একাধিক বারও। শিমলা- কুলু মানালি রোটাংপাস, নৈনিতাল-রানিখেত-কৌশানি, রাজস্থান, দিল্লি-আগ্রা- মথুরা-বৃন্দাবন, দক্ষিণ ভারতের কিছুটা অংশ, কন্যাকুমারি এবং সর্বশেষে কাশ্মীর(২০১১)। তবে ২০০০৮ সালে শিলং গুয়াহাটি ও গিয়েছি ; ওই একবারই জীবনে প্লেনেই যাতায়াত, হা হা হা । অথচ এখনকার জীবনের মান ও ধরনধারণ কোথায় চলে গেছে। সময় কম আর প্রযুক্তি-পরিষেবার গুণে মধ্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেদেরও আয়ত্তে এসে গেছে ভ্রমণের নানা সুযোগ সুবিধে। এছাড়া, ছোটখাট বেশ কিছু আনন্দময় বেড়ানোর স্মৃতি মনকে আন্দোলিত করে আজও। আমি কোথাও বেড়াতে গেলেই স্থানীয় মানুষদের সাথে এবং অন্যান্য আগত ভ্রমনার্থীদের সাথে কথা বলতাম। আর একটু বেপরোয়া চালেও চলতাম। বয়েস ও স্বাস্থ্যে কুলিয়ে গিয়েছে, এমনকি ৬০ -এর পরেও। দার্জিলিঙে বাথরুমে ঢুকে একঘটি বরফ-ঠান্ডা জল ঢেলে ব্রহ্মরূপ দেখার জোগাড় প্রায়। মুহূর্তের মধ্যে গরমজল ঢেলেছিলাম, না হলে জানিনা কি নাজেহাল করতাম সকলকে (১৯৭৭ সাল)। আমার দুর্ভাগ্য ঘোর শীতের রাজ্যেও কোথাও পঁজাতুলো-বরফ পাই নি। আমার স্ত্রীও সঙ্গে থাকত সব বেড়ানোতেই। দু'বার পুত্রও ছিল। অধিকাংশ ভ্রমণই গ্রুপটুর। তাতে মজাও বেশি, সঙ্গীরা খুব বেরসিক, সংস্কৃতি-উদাসীন হলে বেড়ানো অনেকটাই মার খেয়ে যায়। আমি সাউথে গিয়েও ওখানকার খাবারদাবারও খাওয়ার চেষ্টা করেছি অনেক জায়গায়। ভাষা কখনও পুরো অন্তরায় হয় না কোথাও, মানুষ ঠিক বোঝে মূল প্রযোজনটা কি ! তিনটে ভাষায় আমরা সকলেই দড়, মানে বাঙালিরা। অনেকে হিন্দি তেমন বলতে পারে না, বুঝতে পারে। চেন্নাই-তে এক হোটেলে তেঁতুল বোঝাতে আমার ইংরেজি ভোকাবুলারির হিমশিম অবস্থা। আমাদের এক মহিলার সোনারচুড়ি পরিষ্কার করার জন্য ওটা চাইছিলেন। ভাবতাম ওখানে সবাই প্রায় ইংরেজি-সড়গড়। ভুল ধারণা (১৯৮৫ সালে)। ৬০/৬২ বছর বযেসে বিশাখাপট্টম, আরাকুভ্যালি গিয়েছিলাম, ওখানেও প্রাদেশিক মানুষ ইংরেজির ধার ধারতো না, হিন্দিও বুঝতো না --- মানুষের কাছে পৌঁছাতে কেবল কথ্যভাষাই একমাত্র পথ নয় মোটেই। অন্তত সাধারণ প্রয়োজনের জিনিষ বোঝাতে। মনে পড়ে, ত্রিবেন্দ্রামের গোল্ডেনবিচে আমি সাঁতরে বেশ একটু দূরের একটা বয়া-তে পৌঁছালাম, আমাকে দেখে আরেক বন্ধুও সাহস পেল, ওটা যদিও ব্যাকওয়াটার জোন, একদমই নিরাপদ একটু ভাল সাঁতার জানলেই। পন্ডিচেরির অরোভিলে কযেকজন ইঞ্জিনিয়রের সাথে কথা হলো, ওরাই শ্রমিকের কাজও করছে। ওরা তো ইংরেজি-চোস্ত। আশ্রমে রিটায়ার্ড আই এ এস দেখলাম খাওয়ার টেবিল মুছে দিলেন, বাসনমাজার মহিলাদের কাউকে কাউকে ফিল্মস্টারের মতো চেহারা। এক ফেঞ্চ সাহেব সমুদ্রের দিকে তাকিযে কি ভাবছিলেন, খালি গা, খাঁকি হাফপ্যান্ট পরিহিত এক প্রৌঢ়। জানলাম ফ্রান্সেই থাকেন, চিফ ইন্জিনিয়ার। স্ত্রী পন্ডি-তেই সংস্কৃত পড়ান। উনিও এখানে স্থায়ীভাবে চলে আসবেন ৬ মাস পরে। বিভিন্ন জায়গার মানুষদের মধ্যে গেলে নিজেও কেমন বদলে যায় মানুষ। বাইরের দেখা, ভেতরের দেখা, অনুভূতি, উপলব্ধি সব কতো পাল্টে যায় যেন। তুচ্ছ আচারবিচার, ধর্মের ভিন্নতা, সুখ-দুঃখের আদল, ভাষা-সংস্কৃতির বৈভিন্ন ইত্যাদি বহু বহু বিষয়ে সম্যক ধারণা তৈরি হতে থাকে মনে। সব মানুষই যেন এক সুতোয় গাঁথা বিশ্বজগতে --এই বোধ উঁকিঝুকি মারতে থাকে মনে। আমরা জাতপাত, ধর্মভেদ, প্রাদেশিকতা, এমনকি একধরনের মেকি-জাতীয়তাবোধ নিয়ে মাথা ঠোকাঠুকি করে মরি । হযতো একদিন সব মানুষকেই বিম্বনাগরিকতার সরনি ধরেই চলতে হবে। অনেক উন্নয়ন ও ইকোলজি সামলাতে 'এক বিশ্ব' ভাবনার আবশ্যিকতা অনিবার্য হয়ে যেতে পারে। এই ব্লু-প্রিন্ট হয়তো দূরদূরান্তরের এক বাস্তবতা। শিল্পে হয়তো পরাবাস্তবতার দূরবিনে দেখছি কখনও।

অনেক লিখে ফেললাম মামুলি হাবিজাবি কথা। কেবল বিষ্ময়ভরা প্রকৃতির কথা বলি নি একটাও। সমুদ্র পাহাড় সবুজ অরণ্য অন্তহীন আকাশ মাটি ঘাস ফুল নিজেরা যেমন সহস্র ভাষায় আমার মনকে কতো অজানা অচেনা অনুভূতিতে, রঙে রসে অন্যলোকে নিয়ে যায়, তেমন করে আর কেউ পারে কি! মুহূর্তে বিবর্তিত হতে শুরু করি ! সেটা পরে অনেকটা সরে যায় মানছি, কিন্তু সেই অলৌকিক স্বাদ ও বিশ্বসত্তার কিছু ভগ্নাংশ পরবর্তী সময়েও থেকে যায়। সমুদ্র বা পাহাড়ে বা দিগন্তহীন মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে, বসে মহাকাশের দিকে তাকিযে থাকলে এক অনির্বচনীয় শান্ত তরঙ্গ যেন মস্তিষ্কের মধ্যে দিয়ে নিচে নামতে থাকে। দিনে এক রূপ, রাতের নক্ষত্রভরা আকাশ অন্য এক রূপ নিয়ে আসে। আমার এক কবি বন্ধু নবেন্দুদা বলতো, তাকিয়ে থাকো, নিমগ্ন হও ওই মহাকাশের একটা স্থির বিন্দুতে। অনেক্ষণ পর বলতো 'কসমিক আইডেন্টিফিকেশন' বলে একটা ব্যাপার আছে। সেটা খুবই কঠিন শ্যামল। মনে মনে ভাবতাম অবাঙমানসগোচর । আমরা দুজনেই এমনিতে ঈশ্বরবাদী ছিলাম না ( আমি এখনও তাই, নবেন্দুদা অকাল প্রয়াত) ।কেউ কেউ ক্ষুণ্ণ হতে পারেন, তবু একটা ঈশদ অপ্রাসঙ্গিক কোট এখানে জুড়ে দিলাম "The word God is for me nothing more than the expression and product of human weaknesses "---Albert Einstein.। মনটা খুব সুস্থির ছিল না, শরীরও তেমন সায় দিচ্ছিল না ---তবু বেশি রাত করেও এটা সমাপন করলাম।


জানতে চাই আপনার পরিধি র কাব্যিক পরিমণ্ডল এবং সহ লেখকদের কথা। 





তোমার প্রশ্নাবলির মধ্যে এইটা সবচেয়ে বোধহয় দুরূহ এবং দীর্ঘ হয়ে পড়বে লিখতে গেলে। লেখক তালিকা, মন মননের নানাবেশী পরিচয়, আর্থ-সমাজিক-রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক -ইতিহসিক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কিছু নতুনকথা, কিছু চর্বিতচর্ব্যন ---এরকম অনেক কথা এসে পড়ে। এসে পড়ে কাব্যাদর্শ, ফর্মবিচিত্রা, অভিব্যক্তি, অনুভূতিবৈচিত্রের কতশত মতও পথ, আসবে দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বেশকিছু সুষম-বিষম সংবেদী বিবাদী তর্কজাল। এই বয়েসে, এই স্মৃতি-নির্ভর সরাসরি লেখায় যাওয়া এখন অসম্ভব, শর্মিষ্ঠা ! এমনিতেই লেখা পোষ্ট করে দেওয়ার পরে কতো জায়গায় ছোটখাট ভুল থেকে গেছে, যা আর সংশোধনের উপায় নেই (বা আমি জানি না, সে পদ্ধতি) এবং এতে পাঠকরা অনেকে ভুরু কুঁচকাতে পারে ; তাদেরও বা দোষ দিই কি করে ! এবার মূল বক্তব্যে আসি।

রবীন্দ্রনাথের ওই কাব্য-সাহিত্য সংস্কৃতির বিরাটত্ব, বৈচিত্র ও উৎকর্ষময় রচনা দেখাশোনার পর আমি ১৯৬০ সাল নাগাদ কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থ হাতে পাই ; পড়ে স্তম্ভিত হযে যাই, বারবার পড়ছি লেখার অাঙ্গিকের চিত্রময়তার মন-মননের স্বাতন্ত্য ও অনন্যতা আমায় পুলকে ও নির্বেদে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে নিয়ে চললো। তখন সব ধরতেও পারছি না। ওই বয়সে যতটুকু উপলব্ধির মধ্যে এসেছিল তাতেই একটু দিশাহারা। অন্য আধুনিক কবিদেরও পড়তে থাকি, এবং আর একটু ভেতরে পৌঁছাতে সমর্থ হই। বুঝতে পারছি বাংলা কবিতার একটা পরশপাথর হস্তগত হযেছে আমার। ১৯৬৬ সালে কলকাতায় আসার পর সংস্কৃতির বন্ধুদের ও গুণীদের সংস্পর্শে এলাম। তারপর জীবনানন্দ, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে অনেকটা খুঁটিয়ে ভালকরে পড়লাম। কবিতার উপর প্রচুর প্রবন্ধ ও আলোচনার বই পত্রিকা পড়তে শুরু করলাম। বন্ধু কবি নবেন্দু চক্রবর্তী ( নবেন্দু দা, একসময় কিছুদিন 'মানব মন-এর সহসম্পাদকও ছিলেন) আমায় অনেক শিখিয়েছেন, সাহচর্যদান করেছেন, অনেক জায়গায় নিয়েও গিয়েছেন। ওনার সাথেই একবার কবি বিষ্ণু-দের বাড়ি গিয়ে ঐ দার্শনিক কবিকে দেখার ও ওঁর জ্ঞান-অনুভব মন্ডিত কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল, নবেন্দুদার বিষ্ণুদে সম্পর্কিত একটি বড় প্রবন্ধ বিদগ্ধজনের মধ্যেও আলোড়ন তুলেছিল ( কবির স্ত্রী নবেন্দুদার খুব তারিফ করলেন, দেখলাম) । যাই হোক এটা অতিশয়োক্তি কিনা জানি না, আমার যেন জীবনান্দের কাব্যগ্রন্থকে একটা ' জলবিভাজিকা'-র সমতুল মনে হযেছিল। সুধীন দত্তের কাব্যাদর্শে নেতিবাদ, শূণ্যবাদ, ক্ষণিকবাদ অাছে কিন্তু শব্দপ্রযোগ, ছন্দ ও বুদ্ধিবাদের ছটার অসামান্য অভিব্যক্তিতে উনি চিরভাস্বর হয়ে  থাকবেন। আর বিষ্ণুদে আমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। 

রবীন্দ্রনাথে সিক্ত হযেও উনি সূর্যালোকে নিজেকে সেঁকে বাদামি করেই এক কবিতায় বললেন : ' একথা তো জানি তোমাতে আমার মুক্তি নেই / তবু বার বার তোমারি উঠানে ছুটে আসা '। এঁরা তিনজন আমার খুব প্রাণের কবি। রবীন্দ্রনাথের কথা কিছু বলার দরকার মনে করি নি, উনি ছাড়া বাঙলাসংস্কৃতি কোন আধোঅন্ধকারে পড়ে থাকত। মাইকেল এবং আরো আরো উজ্জ্বল ফলক পোঁতা আছে বহু বহু দীর্ঘ সাহিত্য-কবিতার রাস্তায়, সে সব সকলেরই জানা। তবে স্বর্ণসেতুটা বিশ্বকবিই হয়তো গড়ে গিযেছেন শেষদিকে।

আমি অনেক বিশিষ্ট কবির খন্ড ও শ্রেষ্ঠ কবিতা মন দিযেই পড়েছি। অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, সুনীল-শক্তি গোষ্ঠি, জয় গোস্বামী, জয়দেব বসু,  মণিভূষণ ভট্টাচার্য, অরুণ মিত্র, নীরেন চক্রবর্তী, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরি, মল্লিকা সেনগুপ্ত, সুবোধ সরকার, কেতকীক কুশারী ডাইসন, নবনীতা দেবসেন, জয়া মিত্র, দেবারতি মিত্র, রমা ঘোষ, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান, নির্মরেন্দু গুণ, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, মোহন রায়হান, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তসলিমা নাসরিন, রাম বসু, বাংলাদেশের বেশ কিছু ভাল কবিরা (পুরুষ মহিলা দুইই আছেন) , সাগর চক্রবর্তী, তরুণ সান্যাল  ( তরুণ সান্যালকে একবার আমাদের মানবমন দপ্তরের সভায় 'মার্কসীয় অর্থনীতি ও দাস ক্যাপিট্যাল বিষয়ক আলোচনায় ডেকেছিলেন ডাঃ গাঙুলি। অসাধারণ পান্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য। সকলে শ্রদ্ধায়, সৌজন্যে অবনত। আমাদের  সম্পাদকও খুবই পন্ডিত তথা বিনয়ী লোক। উনি শুধু বললেন :তরুণবাবু , এত গভীর বিষয়টি আপনি বললেন অথচ অবাক হচ্ছি একটা ইংরেজি শব্দ পর্যন্ত ব্যবহার করলেন না। মার্কসীয় এতো টার্মিনোলজি  কি করে যে তাৎক্ষণিক ভাবে অক্লেশে এসে পড়ছিল কবির ঠোঁটে, সত্যি জবাব নেই । ডাঃ ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায়ের দু'একটা কাব্যগ্রন্থ আমায় দিযেছেন, প্রথম দিকে লেখা। নাটক তো লিখতেনই শেষদিক পর্যন্ত। 'পািনাস' এবং অন্য দলও মঞ্চস্থ করেছে।) । 

অনেক অনেক অনেক কবির নাম করতে পারলাম না। এক তালিকাই সার হবে, দুই স্মৃতিতে এই মুহূর্তে সব নেই। তাও অনেকে বলে আমার মেমারি নাকি এখনও খুবই ভাল। একটু ভাল লাগে শুনতে, নিজের প্রশংসা বলে কথা। এখানে আমি অনেক লিটল ম্যাগাজিনের কবিদের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করি নি। অনেক ভাল কবিরাও লেখেন সে সব পত্রিকায়। লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা কেন্দ্র ও লাইব্রেরির কর্ণধার সন্দীপ দত্ত আমার বিশেষ পরিচিত। ওখানে গিযেছি আগে। উনি হলদিয়ায়  একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ; রাতে আমাদের বাড়িতে থাকলেন, আমাদের ভাল লেগেছিল খুব। নিজে লেখক, কবিতাও লেখেন হয়তো কম, দিয়েছেন ওঁর কবিতার বই। লেখক পঞ্জি ইত্যাদি কিনেছি। এক সময়ে প্রচুর বই কিনতাম, বাংলা ইংরেজি নাম করা বিভিন্ন রকমের পুঁথিপত্তর। মাষ্টার পেন্টারদের প্লেটস গুলোও আছে একটায়। মডার্ন ড্রামার ওপর প্রবন্ধ। আমরা একসময় প্রচুর নাটক দেখতাম, ভাল সিনেমাগুলোও। নাটক সিনেমা ভাল করে বুঝতে গেলে সেখানেও পড়তে-বুঝতে হয়। গান তো প্রাণের প্রাণ। কতো অপ্রাপ্তি তো গানের মধ্যে দিয়েই একটু পূর্ণ হয়। গাইতামও কখনও, যেমনই হোক, বাথরুম থেকে শুরু করে বন্ধুদের আড্ডায়, সভায় এমনকি মঞ্চেও ---এমনই দুঃসাহস। আসলে গান কবিতা তো অনেকটাই নিজের জন্যে, নিজেকে প্রকাশ করতে না পারলে, কিছুটা অন্তত উজাড় করতে না পারলে, সুখ-দুঃখ গুলো অন্যের সাথে ভাগ করতে না পারলে বেঁচে কোনো আনন্দ নেই। জীবনটা কেমন জৈবিক, যান্ত্রিক ও কৃত্রিম হযে যাবে। এমনিতেই আত্মদ্বন্দ্ব, বিবাদ-বিসংসবাদ, প্রাত্যহিকের বত্রিশ দাঁত আঁচড়ে -কামড়ে একাকার করে দেয় অনেক। নিজেকে পরিচ্ছন্নভাবে খুলতে পারলে সেটা অনেকটা 'ক্যাথারসিস'-এর মতোও কাজ করে। রবীন্দ্রনাথের 'সারপ্লাস ইন ম্যান' কনসেপ্টের মূলে ছিল মহৎ, বৃহৎ দুঃখের ভান্ডারও। সেই 'দুঃখ রাতের রাজা ' রবীন্দ্রনাথের আনন্দময়তার ওপরেও যেন একটা দুঃখের হাল্কা কুয়াশা ছড়িয়ে দিত। আর আনন্দগান বা কবিতা -গল্প-নাটকেও এই উপস্থিতি অলক্ষিত থাকে না । অনেক আপাত -অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছি জানি  : ম্যাটার থাকলেই তার চতুর্দিকে একটা স্পেস থাকে। আধুনিক পদার্থবিদ্যায় জানি এই তড়িদচুম্বক বিচ্ছুরণ একটা অনিবার্য ধর্ম। আমার বা সকলেরই মনে হয়,  জীবন থাকলেই তাকে ঘিরে একটা সংস্কৃতির আবহ তৈরি হয়ই, কম আর বেশি ---এছাড়া জীবন ঠিক জীবনের মতো থাকে না। মনুষ্যসমাজ গড়ে ওঠার সময় থেকেই এটা শুরু হয়েছে। তখন  আর্কেয়িক ফর্মে ছিল। কবিতা বা শিল্পের উদ্দেশ্য বিধেয় নিয়ে  কেন যে বলতে চাইছি। এখানে থেমে গিয়ে বিষয়কেন্দ্রিক কথাগুলো ঝটপট লিখে দিই। ভুলে যাব।

আমার কবি তালিকায় কযেকটা নাম না রাখলে অপরাধবোধে কষ্ট পাব। আমি পূর্ণেন্দু পত্রী, অলক রঞ্জন দাশগুপ্ত, সুজাত, এবং অত্যন্ত প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষের নামই ঢোকাই নি । কি মুশকিল, আরো কত কত কবিতা পড়ে আমি আমার অস্তিত্ত্বের, অনুভূতির সমর্থনে জল মাটি আকাশ খুঁজে পেয়েছি।

হলদিয়ায় থাকার দরুণ মেদিনীপুর জেলার বেশ কিছু কবিসভায় গিয়েছি। কাঁথি, মেচেদা, মেদিনীপুর শহর বেশ কযেকজন স্থানীয় কবির সাথে বেশ পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। কলকাতা থেকেও কবিরা  আসতেন । তাদের বেশকিছু কাব্যগ্রন্থের আদান প্রদান হযেছে। সমীরণ মজুমদার, মনোরঞ্জন খাঁড়া, দেবাশিস প্রধান, প্রণব মাইতি, সনৎ বসু (কলকাতার বেলঘরিয়াই থাকেন) । অনেক আছে। হলদিয়া উৎসবে তো কবিতা-সাহিত্য-সেমিনারের কার্নিভ্যাল লেগে যেত। এছাড়া আমি 'গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ'-এরও সদস্য ছিলাম। হলদিয়া ভবনের ঘরে বসে আলাপচারিতা ও কবিতা গল্পের সেই হলদি-হাওয়ার রাত, ওই দম্পতির সাথে চা-পান সবই মনে আছে ( ইন্দ্রনাথ নেই আর)। কতো সম্মেলনে ছিলাম। হলদিয়া উৎসবেই কবি পুন্যশ্লোক দাশগুপ্ত ( সদ্য প্রয়াত ), তপোধীর ভট্টাচার্য  প্রমুখের সাথে আলাপ পরিচয়। হলদিয়া পোর্টের হলে সীতারাম ইয়েচুরির বক্তৃতার নোট নিচ্ছিলাম, আপনজনে লেখার জন্যে হয়তো। কত কত এমন খুচরো স্মৃতি যা কেবল আমার মনেই কোথাও হাল্কাভাবে আজও রয়ে গেছে। নাম বলে শেষ করা যাবে না, আর কত খুছখাচ গল্পকবিতা, ইয়ার্কি ফাজলেমিও কতই। হলদিয়া 'আপনজন'-এর কতো অনুষ্ঠান। তমালিকা শেঠ ( সম্পাদক)  চোখে দুষ্টু হাসি নিয়ে হয়তো কলকাতার দুজন মহিলা কবির  ম্যানাসক্রিপ্ট আমার হাতে দিয়ে বলল --নিন, দেখুন আপনার অমুকও রয়েছে। দাদা বলতো, জানতোও আমাকে। আমি হেসে নিতাম, বলতাম হ্যাঁ, ভাল তো লেখেই, দেখেই আমার মতামত লিখব। নো ইয়ার্কি!  আমাকে হলদিয়াতেই অনেকে চেনে।তাও কতো মজা আর ইয়ার্কি আছে সংস্কৃতির পাড় ঘেঁষে। ভাল জায়গায় চাকরি করতাম এবং অনেক দায়িত্ব ছিল কাঁধে। বন্দরের কাজ, তারপর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, লাখ কোটি টাকার ব্যাপার । এসব করেও মন মননে বুদ্ধিজীবিতা ও কবিতার নিরন্তর প্রবাহ অব্যাহত ছিল পুরো সময়। আমাদের 'মুক্তকলা চক্রের ' আসরে কতো গান,  কবিতা, আলোচনায় হাজির থাকতেন পুরুষ মহিলারা। কলকাতা থেকেও এসেছেন কবিরা ক্কচিৎ কখনো। ওই গোষ্ঠিরই একজন প্রবন্ধিক তপোব্রত সান্যাল ( যিনি নামটি ঠিক করেছিলেন, পরে কলকাতা বন্দরের চিফ হাইড্রলিক ইঞ্জিনিযার, ফেসবুকেও আছেন আমার) যাঁর বক্তা হিসেবেও বেশ খ্যাতি ছিল, বাংলা, ইংরেজি দুটোতেই সুদক্ষ। হলদিয়ায় শ্যামলকান্তি দাস, মৃণালকান্তি দাস, মধুসূদন ঘাটি (আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'যতোই এগিয়ে যাই' ওই করে দিযেছিল, ১৯৮৫ তে) ওর দাদা রতনতনু ঘাটির সাথেও হলদিয়াতেই  আলাপ ---কত কবিতাও শুনেছি পড়েছি। কবিতা তো আমারও আশ্রয় ও আয়ুধ হয়ে রয়েছে কবে থেকেই। কুসুম ও বারুদ হয়ত আমার কবিতাতেও আছে । যারা জানেন কিছুটা বুঝতে পারবেন। যদিও, অনুজ্জ্বল কবি, তবু আমার আমার মতো করে এসব আছে। ঘটনা, সংবাদ, উপস্থিতি, আমার সামান্য জ্ঞান, প্রত্যয়, অনুভব  ইত্যাদি এসেছে কিছু। বাস্তব, অন্তর্বাস্তব, অতিবাস্তব এবং পরাবাস্তবও ছায়া ফেলেছে এখানে ওখানে। অনেক ভাব-অনুভূতি মুক্ত কবিতায় বলেছি ইচ্ছে করেই। যাদুর মতো শব্দ আনতে হয়, আনা যায়, কবিদের পক্ষে অপেক্ষাকৃত সহজ খেলা সেটা ( সুধীন দত্ত 'উড্ডীন পদধূিল,-র উড্ডীন খুঁজতে সারা সন্ধ্যে উপুড় করে দিযেছিলেন দেখে রবিঠাকুর একটু মস্করা করেছিরেন) । তবে আমার বিচরণ যেহেতু নানান দিকে, আর সময়ও কম, কবিতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা বলতে গেলে যথেষ্ট করি নি। সবগুলোতেই পাশমার্কই পেয়েছি বড়জোর। দুঃখ একটাই, জীবনে অনেক অনেক কিছুই লেখার ছিল, হলো না, হবেও না। নিজের মন অন্য মন ও সমাজমনে যেটুকু যুক্ত করতে পেরেছি সেটা নিয়েই থাকলাম। অনেক অপ্রকামিত কবিতা ও কয়েকটা বড় গদ্য আছে ;ছাপানোও মুশকিল, টাকা কোথায়  অতো। অনেক কবি পি এফ- এর টাকাতেও বই করেছেন। কিন্তু পড়ার লোক কতো আর কেনারই বা কতো। সে সব যাক, ভাবি না। নিজের চিন্তা-চেতনা সত্তাকে, নিজের খন্ডতা-অপূর্ণতাকে যতোটা সমাগ্রিক সমষ্টিজীবন সত্তায় মিশিয়ে দিতে পারি, আহরণ করতে পারি এবং নিজেকেও সেখানে নিয়ে যেতে পারি ততোটুকুই  আমার সিদ্ধি।সৌরজগৎ, নক্ষত্রজগৎ, বিগ ব্যাং,  ব্ল্যাকহোল, হোমোইরেক্টাস থেকে টাইমমেশিনের বিজ্ঞানচিন্তা বা ফ্যানটাসি-ফ্যানটাসাইজিং, ম্যাজিক বাস্তব আরো কতো আজগুবি ব্যাপারে আমার ইন্ট্রেষ্ট , কি আর বলবো। দৈনিক কাগজগুলোও  ভাল করে নেড়েচেড়ে দেখতে ইচ্ছে করে। তাই কবিতায় ঢিলেমি আসে, এখন তো অতো খেটেখুটে দেখার মতো শক্তপোক্ত শরীর মনও নেই আর।

     কলকাতায় যেহেতু মাঝে মাঝেই যেতাম। ওখানেও কবি ও সাহিত্য সভায় বেশ কযেক জায়গায় যেতাম। লিটল ম্যাগাজিনের কবিদের সাথে জীবনানন্দ সভাঘর, নন্দন, বোটানিক্স-এর সাহিত্য প্রধান পিকনিক এসব করেছিই। 'সাহিত্য প্রয়াসী', প্রোরেনাটা, ইন্দ্রানী, সাংস্কৃতিক খবর, অঞ্জস, উদীচি ( শান্তিনিকেতন) আরো বেশ কযেকটা আছে --যেখানে আমার পড়াপড়ি, আড্ডা ছিল। হলদিয়ার কবি নরেশ দাসের 'তকমিনা'-য় বরাবরই লিখতাম। আড্ডায়ও থেকেছি। দ্রুত লিখছি কোনওভাবে, শরীর ততো ভাল নেই তবু। এখানে 'ইচ্ছে কুসুম', সাহিত্য অঙ্গন ', 'রণসৃজ' এইরকম কিছু কাগজে লিখছি। কবি জ্যোতি ঘোষ ( একজোট পত্রিকা)  আমার অন্যতম বন্ধুকবি  (চরে গেলেন গতবছর) । অলক মিত্র, কমল মুখোপাধ্যায়, কেদারনাথ দাস, ইরা দোলুই, দীনেশ ভট্টাচার্য , শ্যামল মুখোপাধ্যায়, কয়েকজন  মহিলা কবি (নামটা এই মুহূর্তে পুরোটা আসছে না মনে, সময়ও নেই। খারাপ লাগছে)  আরও কতো কবিরা এলেন না  স্পেসের অভাবে। এতেই যা কান্ড করছি, তাতেই লজ্জা পাচ্ছি, কিন্তু কি করি!  অবজেকটিভ টাইপ উত্তর তো দেওয়া যায় না এ প্রশ্নাবলির। 

   হলদিয়ার আরো কিছু কবির কাব্য ও লেখা এবং আড্ডার কথা না বললে আপরাধবোধ ও অবিচার পীড়িত করবে আমায়। আমি তাদের নামগুলো অন্তত বলি এখানে ----যেমন তমালিকা পন্ডাশেঠ( প্রয়াত ) , প্রলয় চট্টোপাধ্যায়, তুষারকান্তি দাস, বিশ্বজিত মিশ্র (ভাল সেতারবাদকও), দেবদাস মুখোপাধ্যায়, অরূপ পান্তী, নরেশ দাস, তপন মাইতি, জীবানন্দ চক্রবর্তী, আরিফ ইকবাল খান, ননীগোপাল মন্ডল, সুদীপ্ত চক্রবর্তী .....। মুক্তকলা চক্রের  'কাছের মানুষ' পত্রিকাটির কথাও  এ প্রসঙ্গে স্মতর্ব্য। কিছু ইংরেজি কবিতাও আমি লিখেছি, পড়েছিও সাহিত্য সভায়। লেখাই বাহুল্য আসে না ঠিকমতো, ওই ভাষার জলমাটিআকাশ কতটুকুই বা চিনি। এমনি খেয়ালের লেখা ;বরং প্যানেল আলোচনায় ইংরেজিতে একআধবার বলেওছি, কোনও ভাবে উতরেছে। এখন চর্চা অনেক কমে গেছে,ভাল বোঝানো যাবে না। এই প্রশ্নটার যবনিকা টানলাম।



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-