বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

পিয়ালী গাঙ্গুলী

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
ইতি তোমার মেয়ে
ডিয়ার বাবা, 

সরি, এতদিনে তোমায় মেল করার সময় পেলাম। পৌঁছনো সংবাদ তো আগেই হোয়াটস্যাপ করে দিয়েছিলাম। উফ, এবারে যাতায়াতে বড্ড কষ্ট হয়েছে। এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। একে তো গতবছর থেকে সেই মহালয়া থেকে যেতে হচ্ছে, তারপর ফেরার পথে ওই কার্নিভাল। আর পারা যায় বলো? সাজিয়ে গুজিয়ে লোকের সামনে দিয়ে নিয়ে ঘোরানো। আমরা কি ফ্যাশন মডেল নাকি? বয়েস হচ্ছে তো। আজকাল আর আগের মত ধকল সইতে পারি না। আমি কি আর তোমার ছোট্ট উমাটি আছি গো?

আর সিংহটারও বাতের ব্যাথাটা খুব বেড়েছে। আমার ওজন নিয়ে বেচারা আর চলতে পারে না। ফিরে এসে ওর্থোপেডিক দেখালাম। বলল মনে হচ্ছে এবার হাঁটু চারটের অপারেশন করানোর সময় এসে গেছে। এই আবার আমার আরেকটা টেনশান যোগ হল। নি রিপ্লেসমেন্টের সাকসেস রেট তো খুব একটা ভালো নয়। আমার নিজেরও শরীর ভালো যাচ্ছে না, ভাবছি একটা কমপ্লিট হেল্থ চেকআপ করাব। তোমাদের ওখানে তো করানোর উপায় নেই। আমি যখন বাড়ি যাই, তোমাদের ওখানের ডাক্তারগুলো তো তখন ওষুধের কোম্পানির টাকায় বাইরে ঘুরতে যায়। এখানেই করাব।

তোমাদের ওখানে ওয়েদারটাও এবার খারাপ ছিল। ভ্যাপসা গরম আর মাঝে মাঝেই বৃষ্টি। ছেলেমেয়েগুলোর সবকটার সর্দিগর্মি হয়েছে। অবশ্য সে তো নাকি সবই আমার দোষ। আমি চাইলেই ওয়েদার ভাল রাখতে পারি। ওরে, তোরা যে গ্লোবাল ওয়ার্মিং করে করে প্রকৃতির সব হিসেব নিকেশ ওলোট পালোট করে দিচ্ছিস সে খেয়াল আছে? শুনলাম গ্রেট বেরিয়ার রিফটাও নাকি মরে গেছে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ঠেলায়। এই রেটে বরফ গললে পোলার বেয়ার, সিল আর পেঙ্গুইন গুলোও আর থাকবে না। তোরা গাছ কেটে ফেলবি, ইয়া বড় বড় বাড়ি বানাবি, কারখানা বানাবি, বাতাসে আজে বাজে গ্যাস ছড়াবি আর যেখানে যত প্রাকৃতিক বিপর্যয় হবে তার দোষ হবে আমার। ভালো পেয়েছিস বটে আমাকে!

এদিকে বাড়ি ফিরেই তো কাজের আর শেষ নেই। শুধু বাড়িতে পা দেওয়ার অপেক্ষা। তোমার জামাইকে তো তুমি চেনোই। ঘর বাড়ির যা অবস্থা করে রেখেছে। ঢুকেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। তোমার কাছে তো আর লুকোনোর কিছু নেই বাবা। গাঁজার নেশাটা তো আর ছাড়াতে পারলাম না এত বছরেও। ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে, আজকাল ওরাও রাগ করে। তাতেও কোনো ফল হয়না। আর আমরা না থাকলে তো সুবর্ণ সুযোগ। নেশার ডোজ আরো বেড়ে যায়। এই কদিন আর নাওয়া খাওয়া কিছুই হয়নি বুঝতে পারছি। সারাদিন গাঁজা টেনে পড়েছিল। কদিনেই চেহারার কি হাল হয়েছে। 

পই পই করে বলে গেছিলাম ফ্রিজে রান্না করে রাখা আছে, মাইক্রোয়েভে গরম করে খেও। কিছু করেনি। এখন ফ্রিজ ভর্তি বাসি খাবার। ওয়ার্ডড্রোবে অতগুলো ফ্রেশ বাঘছাল রেখে বলে গেলাম রোজ চান করে ফ্রেশ পড়ো । সেই একটা পরেই এতদিন কাটিয়ে দিল। কি নোংরা মাগো! যেমন গা দিয়ে গন্ধ বেরোচ্ছে, তেমনি ঘর বাড়ি দিয়ে। আমি তো এসেই আগে সমস্ত দরজা জানলা খুলে দিয়েছি। কি দেখে যে প্রেমে পড়েছিলাম তাই ভাবি। মেয়েরা আবার ওনার মত স্বামী চায়। আমি মনে মনে হাসি। ভাবি ঘর করতে গেলে হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

তবে হ্যাঁ, নন্দী ভৃঙ্গী কাজে অনেক সাহায্য করে। ওরা না থাকলে আমি একা সামলে উঠতে পারতাম না। নিজেদের চারজনের চারখানা লাগেজ, জামাকাপড় ভর্তি। ছেলেমেয়েরা তো একেকবেলা একেকটা পড়েছে আর ছেড়েছে, বিশেষ করে লক্ষী আর কার্তিক। ওদের দুটোর তো আর সাজের শেষ নেই। সেইসব আনপ্যাকিং করে, ওয়াশিং মেশিনে কেচে আবার গুছিয়ে তুলে রাখা, সেকি কম হ্যাপা। তারপর আবার ফ্লিপকার্ট আর এমাজন থেকে একগাদা অনলাইন শপিং করে এনেছে। তারপর বাহনগুলোরও তো আছে। আমি তো সবারই মা বলো? দু দুটো মেয়ে হয়েছে, একটা বাড়ির কাজে নেই। সব মায়ের ঘাড়ে। একজন সারাক্ষণ পড়াশুনো আর গানবাজনা নিয়ে আছেন, আর আরেকজন সারাক্ষণ সাজগোজ আর কে তাকে ভক্তিভরে পুজো করছে না করছে সেই গোয়েন্দাগিরিতে ব্যস্ত।

গনুটার কি বিচ্ছিরি বেঢপ চেহারা হয়েছে দেখেছো? সারাক্ষণ গান্ডে পিণ্ডে খেয়ে চলেছে। বলে বলেও জিমে পাঠাতে পারি না। এই মামারবাড়ি থেকে এত্ত খেয়ে এল তাতেও আশ মিটল না। রোজই এটা সেটা রান্নার ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছে। আমি বলে দিয়েছি আমি টায়ার্ড, আমি পারব না। খাওয়ার অত লোভ থাকলে নিজে রান্না করতে শেখো। কাতু কে নিয়ে আবার আরেক সমস্যা। সিক্স প্যাক, এইট প্যাক কিসব বানিয়ে চলেছে আর এটা খাব না, সেটা খাব না করে চলেছে। সবেতেই নাকি ওর ওজন বেড়ে যাবে। ওদের বাবাকে নিয়ে অবশ্য এসব ঝামেলা নেই, যাই দাও হাসিমুখে খেয়ে নেয়। মিথ্যে বলব না বাবা, তোমার জামাই আমায় বলে, বয়েস হচ্ছে, তুমি এবার একটু রেস্ট নাও। নইলে অসুস্থ হয়ে পড়বে। মাঝে মাঝে একটু পার্লারে যাও, বডি ম্যাসাজ করাও, স্পা করাও, আরাম পাবে।

এ তো গেল আমার সংসারের খুঁটিনাটি। এরপর আবার বিশ্বসংসারের যত ঝামেলা। তোমাদের ওখানে তো যে কোনোদিন যুদ্ধ লাগতে পারে। যাও বাবা আপাতত ডোকালাম টা ঠেকানো গেছে, কিন্তু পাকিস্তান তো মনে হচ্ছে যুদ্ধ করার জন্য নাছোড়বান্দা। আবার কত মানুষ মরবে, কত ক্ষয় ক্ষতি হবে। ঘরে ঘরে বৌগুলোকে অত্যাচার করে মেরে ফেলছে, মুড়ি মুরকির মত ধর্ষণ হচ্ছে। এদিকে বাজার দর আগুন, গরিব লোক না খেতে পেয়ে মরছে, অক্সিজেনের অভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে। ওই যে চিট ফান্ড না চিটিং ফান্ড, তাতে যে শয়তানগুলো গরিব মানুষ কে ঠকালো তাদের এতদিনেও কোনো শাস্তি দিতে পারলাম না।  

নোট বাতিল নিয়েও কত ঝামেলা, কত মানুষ বেঘোরে মারা গেল। এইসব অসুরগুলোর সাথে আমিও এঁটে উঠতে পারছি না বাবা। মহিষাসুরকে বধ করা অনেক সহজ ছিল। ওই যে বললাম আমারও তো বয়েস হচ্ছে। শক্তি আর সাহস দুইই বোধহয় কমে গেছে। রোহিঙ্গার মুসলমান সমস্যা নিয়েও যে কি করি! একটাই উপায়। সব ধংস করে আবার নতুন করে সৃষ্টি করা। দেখি সময় করে প্রজাপতি, বিষ্ণু আর ওনার সাথে কথা বলব। কিছু একটা করতে হবে, তাড়াতাড়িই। নইলে আমি এবার সিভিয়ার ডিপ্রেশনে ভুগব। ইতিমধ্যেই ডিপ্রেশন শুরু হয়ে গেছে ভাবছি একটা ভালো সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়ে একটু কাউন্সেলিং করাব। যাকগে, মাকে আর এত কথা বলো না। এমনিতেই আমায় নিয়ে বড্ড চিন্তা করে, এসব শুনে আরো দুশ্চিন্তা বাড়বে। আর তুমিও নিজের খেয়াল রেখ বাবা। ওষুধগুলো নিয়ম করে খেও, বিশেষ করে প্রেশারের ওষুধটা। তোমাদের জন্য খুব মন খারাপ করে গো। মিস ইউ বাবা।

ইতি তোমার মেয়ে

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-