বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

নাসির ওয়াদেন

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ | |
Views:
●এ প্রজন্মের দুই নবীন কবির দুটো কবিতাগ্রন্থ●
কবিতা মন জগতে বিচরণ করে জোছনার বুকে উপোসী আলোর খিদে নিয়ে। খিদে পেলে যা হাতের কাছে থাকে, তাই চেটেপুটে ক্ষ্ন্নাবৃত্তি পূরণ করা জীবের ধর্ম। জীব মাত্রেই আবেগ, অনুভূতি,সহানুভূতি,রাগ,ঘৃণা, শোক জ্বালা প্রভৃতির দ্বারা আক্রান্ত। কবিতা মনের দুয়ারে হানে আঘাত, সে আঘাত কখনও সাবলীল গতিধারা হয়ে খিলখিল হাসিতে পরিপূর্ণ, আবার কখনও নিরাশার ঘন বুকে আশার আলো হয়ে পথ চলতে সহায়তা করে। কবি ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ কবিতা সম্পর্কে বলেছেন : Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings."কোল্ডরিজ ভাবের থেকে উর্ধ্বে ওঠে, শব্দের উপর জোর দেয়, তিনি বলেন যে,''best words in the best order " ফলে শব্দ চয়নের দক্ষতা, শব্দ ব্যবহারে বিচক্ষণতা কবিতাকে উর্ধ্ব মার্গে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আবেগ থেকে কবিতা ঠিকই, কিন্তু আবেগ ধরে রাখার সময় সীমাবদ্ধ। তাই আবেগ অল্পদিনের মধ্যে বিলীন হওয়া আশ্চর্যের নয় , এ কবিতা মনে গেঁথে যেতে পারে। গেঁথে থাকতে পারে বঁড়শির ডগায় ছিপের সরু সুতোর বন্ধনে। তাই কবিকে চিনতে হবে শব্দ, জানতে হবে পারিপার্শিক অবস্থান,সময় চেতনা, চিন্তার গতিপ্রকৃতি --কালখণ্ডের বিচারে কবিতা হৃদয়গ্রাহী হবে, হবে মর্মস্পর্শী, অবচেতন মনের গভীরে টংকার শোনা যাবে, রিদিম্ রিদিম্ ধ্বনি শোনা যাবে মগ্ন চৈতন্যের সুপ্ত প্রকোষ্ঠে । পদে পদে থাকবে ছন্দের ঝংকার, নিপুণ শব্দ বিন্যাস, ও গতিময়তা, থাকতে পারে সহজ সরল গার্হস্থ্য প্রেম, প্রীতি, কোথাও প্রবল ইন্দ্রিয়াসক্তি,আবার লালসাহীন মানবিক আবেগ আবেদন ও রূপতৃষ্ণা,কোথাও পবিত্র, আদর্শায়িত আত্মিক ভাব সংযোজনও ঘটতে পারে। ফ্রয়েড মানব মনের যে তিন স্তরের কথা বারবার উল্লেখ গেছেন, তা ইদ্, ইগো, সুপার ইগো। তিনটি মনের স্তরের সাথে মিলন থাকলে মন থাকবে সুস্থ ও স্বাভাবিক, সমগ্র জগতের সাথে থাকবে সুসম্পর্ক ও সান্নিধ্য। কোন একটার ঘাটতি থেকেই অসুস্থতার জন্ম --তার থেকেই বিভ্রান্তি, আক্ষেপ ও হতাশা, এমনকী আত্মাহূতিও। তবে কবি,যখন বাস্তবের ইগো থেকে অতিক্রান্ত হতে পারেন না, তখন কল্পনার জগতে প্রবেশ করে, অতীন্দ্রিয় শক্তির উপাসনা শুরু করে, দেহে, মনে, দৈবশক্তি অনুভব করে এবং কবিতার জনক হয়ে জন্মাতে সহায়তা করে । নবীন প্রজন্মের কবিদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ ,কবিতা লেখার চেয়ে "ইজম" আয়ত্ত করতে, দেশ কাল পাত্র সম্পর্কে বুঝে নেওয়া, পাঠকের রুচিকে অনুসন্ধান করা,--দেখবে কবিতা সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে মনের গভীরে স্রোতের সাথে --কবিতা মুক্ত হয়ে উঠছে। 

কবি রুমা চোঙদার, একজন তরুণ প্রজন্মের কবি ।তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ " ঝিনুক "-পাঠকের হৃদয় কতটুকু তরঙ্গিত হবে, সেটা বড় কথা নয়,আসলে তার কবিতার ছত্রে ছত্রে কাব্যময়তা ও বৈচিত্র্য রূপ মুগ্ধ করবে। মুখবন্ধে বলা হয়েছে, " প্রতিটি কবিতা এক একটি মূল্যবান মুক্তোর মতো শীতল আর আকর্ষণীয় এবং পাঠকের মনকে শান্ত ও নির্মল করে, কাব্যরস করে তুলতে সক্ষম ...।" তেত্রিশ বছরের কবি বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখছে, "মনের সম্রাট "হতে গেলেই চাই ভালোবাসাময় এক হৃদয়(ধর্মশোক ), প্রকৃত হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে চাইছে, কবি চায়, ' হেমন্তের শিশির কণায় ঘাম ভেজা উঠোনে '--পা রেখে স্নাত হতে । সময়কে ভাবতে গিয়ে " সময়ের পাহাড় ডিঙিয়ে বাস্তবের প্রখর রৌদ্রে-" পুড়তেও রাজী। সমাজের পচাগলা পুড়ে যাওয়া মুখগুলোকে একত্রিত করে তুলি দিয়ে আঁকতে চাইছে --' নির্লজ্জতার চরমতম তুলির আঁচড়ে ' সমাজের বুকে ফুটে ওঠা নির্লজ্জতা। মাঝেমধ্যে হতাশার জলে ডুবে যায় মন," জীবন সম্পর্কে এক উদাসীন মানুষ হয়েই রয়ে গেলাম'( গাছ ) শব্দ আক্ষেপে ঝরে পড়ে । ভালবাসে জীবনকে, ভালবাসে জন্মভূমিকে, মানুষকে তাই বলতেই পারে," ভালবাসায়, ভাললাগায় নতুন কোনো অনুভবে / জানি, আমার এই নিবেদন পূর্ণ হবে ।' আমরাও সেই পরিপূর্ণতা দেখতে চাই, ভালবাসার স্বপ্ন সৌধ রচিত হোক মানবজমিনে। 

আর এক তরুণী কবি একজন সুদক্ষ সঞ্চালিকা মধুমিতা পিরি আমাদের চোখে আশা জাগিয়ে তোলে ।কবিতা কাঁচা পাকা যাই হোক, কবিতা মনের মাধুর্য, মনের সৌন্দর্যকে বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারে। কবির কোলকাতার জল হাওয়ায় শৈশব কেটেছে, যৌবনের নিস্তরঙ্গ স্রোতে মফস্বল শহরে বর্ধমানের বধূ হয়ে আমাদের কবিতার জগতে ঢুকে পড়েছে, কবিতার ক্ষেত্রকে পরিপূর্ণ করতে প্রয়াসী।
তার কবিতার মধ্যে নানান ও নানা তির্ষকতা, সারল্য, নিপুনতার নিখুঁত ছবি, প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। সংসার জীবন সম্পর্কে দারুণ সজাগ ও সতর্ক । কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে সাংসারিক জীবনের নানা চিত্র। " সংসার কী বিচিত্র, সবাই কি তা বোঝে?"--সত্যিই তো আমরা সংসারের নিখুঁত যন্ত্রণা ও লালিত্য কতটুকু অনুভব করতে পারছি ।আবার পরেই বলছে -' ঝিনুকটাকে ফেলে দিয়ে মুক্তোটাকে খোঁজে--'সকলেই মুক্তো চাই, অমৃত চাই, অমৃত পান করে অমরণশীল হতে প্রত্যাশী। সমুদ্র মন্থনে ওঠে আসা হলাহল শিবের কণ্ঠে সঞ্চিত হওয়ার সাথে দানবদের পান করার অর্থ মানবজাতিকে রক্ষা করা। ভালোমন্দ, আশা নিরাশা, সুখদুঃখ,অভিলাষ অনীহা আমাদের নিত্যসঙ্গী । আলো আঁধারির খেলায় আমরা নিমগ্ন -স্বপ্নে মত্ত --কবি সেই স্বপ্নের ভেতর স্বপ্ন নিয়ে খেলা করতে আগ্রহী। " বেঘোরে স্বপ্নদের নিয়ে /খেলা করি শহরের অলিতে গলিতে /মালতী যাস না আজ ফিরে আয়, ফিরে আয়/,মনের ওই জানালাতে ••••"। মনের দরোজা, জানালা খোলা, সেই খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে কবিতার সিক্ত বাতাসে শ্বাস নিয়ে কবি অতীন্দ্রিয় চিন্তা জগতে নিমগ্ন হয়ে পড়তে চায়। কবি প্রতিভার স্ফুরণ ধীরে ধীরে ঘটছে, বিকশিত হচ্ছে পাঁকে ফুটে ওঠা পদ্মের পাপড়ির মতো  ।যেদিন মেলিবে পাখা নয়ন না ফেরে --সেই প্রত্যাশা রইল দুইকবির প্রতি । আন্তরিক ভালবাসা ছুঁয়ে রাখলাম । 




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-