বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

অনিন্দিতা মণ্ডল

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
অর্জন
অফিসে বেরোবার আগে তিস্যা বাথরুমে সময় নেয় খুব কম। যতটুকু লাগে আর কি। শৌচকর্মতেই সময় লাগে যা। তারপর শাওয়ার খুলে দিয়ে ব্রহ্মতালুতে ঠাণ্ডা জলের ধারা উপভোগ করতে করতে সারাদিনের রুটিন ঝটপট ঝালিয়ে নেওয়া। আজ যেমন, হুঁ, যেতে হবে আসানসোল। ঠিক আসানসোলও নয়। আরও ভেতরে। মরে যাওয়া কয়লা খনি অঞ্চলের জঙ্গল ঘেঁষা গ্রামগুলোতে। শালা পঞ্চায়েতের লোকটা হেব্বি বদ। এত দূর থেকে গিয়ে রাতে ফেরাটা সমস্যা। আগে তো অফিসে যেতে হবে। কাগজপত্র গুছিয়ে ছক কষে বেরোতে হবে। সে একাই এটা ডিল করছে এবারে। কলিগ অমিতাভ একবার বলেছিল, বেশি সাহসকে দুঃসাহস বলা হয় ম্যাডাম। তিস্যা ব্যপারটা একাই নিতে চেয়েছে। দেখাই যাক না, কি হয়। আজ হয়ত যেতে যেতে বিকেল গড়িয়ে যাবে। কাল মিটিং। এ সময় ট্রেন ধরে আসানসোল গিয়ে তারপর কাজের ঘাঁটিতে পৌঁছনো তো আরও অসম্ভব। 

বাইকে স্টার্ট দিয়ে সে আলগোছে হাত নেড়ে দিলো। মা বারান্দায় ঝুঁকে পরে দেখছেন। মুখে চোখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা। এ মেয়েকে সামলানো আর তাঁর হাতের মধ্যে নেই। “আস্তে চালাবি। ওহ! এমন গাছ চালানো মেয়ে জুটেছিল আমার কপালে!” কপালে হাত ঠেকিয়ে হাত নামানোর অপেক্ষা। বাইক দৃষ্টিপথের বাইরে। 

বাইক নিয়ে তিস্যা শহুরে রাস্তা ছেড়ে বাইপাস ধরে। অফিসের টুকিটাকি কাজ সেরে বেরোতে একটু সময় লাগল। তবু সন্ধ্যের আগেই ঢুকে পড়া যাবে মনে হয়। আর একটু গেলেই এক্সপ্রেস ওয়ে। আঃ! কি সুন্দর হাইওয়ে! মাঝে মাঝে দুহাত ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। সিক্সলেন রাস্তায় বাইকে বসে হাওয়াটা গায়ে লাগাতে যে কি ভালোই লাগে! কিন্তু না, অতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়া চলেনা। মা একা বাড়িতে। কিছু হলে বেচারা মা...কি যে করবে! 

প্রায় ঘণ্টা তিনেক চলার পর জুবিলীর মোড় থেকে বাঁদিকে ঢুকে এলো তিস্যা। এ রাস্তাটা স্টেট হাইওয়ে। সরু হয়ে গেছে। টু লেন বলাই ঠিক। পেটে ছুঁচোর দৌড়োদৌড়ি টের পাওয়া যাচ্ছে। আরেকটু এগিয়ে যেতে হবে। ক্রমশ নির্জন চারধার। এদিকে প্রকৃতি একটু রুক্ষ। বৃক্ষবিরল। পিচের রাস্তার দুধারে টকটকে লালমাটির পাড়। সূর্য ঢলে আসছে দেখে শেষ বাঁকটার মুখে এসে বাইক থামাল তিস্যা। এরপর নেমে যেতে হবে লালমাটির রাস্তায়। এই তেমাথার মোড়ে একমাত্র ছোট্ট ধাবাটায় এসে দাঁড়ালো। একপাশে বাইক দাঁড় করিয়ে সে এসে বসল একটা কাঠের চেয়ারে। রুটি আর ডিম ভুজিয়া। সঙ্গে বড় করে এক গ্লাস চা। দোকানের ছোকরা চাকরটা ভূত দেখার মতো করে দেখছিল তাকে। তিস্যা গালে টোল ফেলে হাসল। “কিরে, ওরকম গোল গোল করে কি দেখছিস?” মাত্র সাতাশের যুবতী, একা বাইক নিয়ে, এই অজ গাঁয়ে, কিশোরের তো অবাক হবারই কথা। খেতে খেতে তিস্যা চারপাশ দেখতে থাকে। কি সুন্দর যে! লাল জমিতে সবুজ গাছ। ঢেউ খেলান মাটি। কাছে দূরে দুএকটা ঢিবি। ওই একটা ইঁদারা দেখা যাচ্ছে। অনেক মেয়ে বউ জল তুলছে। বালতি কলসী জারিকেনের লাইন। এখানে জলের বড় কষ্ট। দেখতে দেখতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সে। পুরুষ কণ্ঠে হুঁশ ফিরল। “স্যার এবারের কন্ট্রাক্টটা পেলে আমাদের একটু দেখবে স্যার। পোল বসানো প্রায় কমপ্লিট। সিমেন্টের গাঁথনি শুধু বাকি।” লোকটার পানের ছোপ লাগা দাঁতের হাসিতে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছিল তিস্যার। সে কড়া গলায় বলল – আমাকে স্যার মনে হচ্ছে নাকি? লোকটা ফ্যাসফ্যাসে হেসে সরু চোখ করে বলল – মাইন্ডে নেবেন না ম্যাডাম। আপনি তো আমাদের ঘরের মতন নয়। তারপরে আবার সিভিল ইঞ্জিনিয়র সাহেব! তাই স্যার বলে ফেলেছি। কাঞ্জিলাল বাবু হুবহু আপনার ছবি বলে দিয়েছেন। চলুন, ফরেস্ট বাংলোতে আপনার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। একা কোথায় থাকবেন আর! তিস্যা বিরক্তি মাখা মুখে বাইকে স্টার্ট দিয়ে লোকটার মুখের ওপর হুশ করে চালিয়ে দিলো। নেমে গেলো কাঁচা রাস্তায়। তার গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে অপারগ লোকটা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল – রাণ্ডী। কিশোর ছেলেটি টেবিল থেকে এঁটো থালা গেলাস সরাতে সরাতে তিস্যার দেওয়া পঞ্চাশ টাকার বখশিস পকেটে রাখছিল। লোকটার কথাটা কানে যেতে চোখটা ধ্বক করে জ্বলে উঠল। 

তিস্যা কেমন যেন বুঝতে পারছিল। বিপদ, বিপদ। কয়লা বেল্ট এমনিতেই কালো মেখে বসে আছে। তার ওপর এই চক্রটা ছোট নয় তো! বন বাংলোতে রাত কাটিয়ে কাল সকালে পঞ্চায়েতের মিটিং। এ কাজের বেশি টেন্ডার জমা পড়েনি। প্রাণ হাতে কাজ করতে আর কেউ আসতে চাইছেনা। এ রাজ্যে এখন কাজে ভাঁটা। তিস্যার কম্পানি টিকে থাকার তাগিদে টেন্ডার দিয়েছে। পেয়েও যাবে। কিন্তু কাজটা এক্সিকিউট করা যে কি ভীষণ ব্যপার! কিন্তু ওই কাঞ্জিলাল লোকটা নিজে এলনা কেন? তিস্যা তো তাকে সব বলে রেখেছিল! ওই দোকানটা থেকে এসে ওই লোকটারই তো তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা! তবে এ কে? কাঞ্জিলালের ফোনও বন্ধ! একটা লিংক কি মিসিং? বন বাংলোড় ঘরের লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল তিস্যা। দূরে ঢেউ খেলান টাঁড়ের শেষে প্রায় দিগন্তে কেমন একটা ধোঁয়ার আস্তরণ দিগন্তরেখাকে ঢেকে ফেলছে। সন্ধ্যে পেরোতেই দূরে আঁধারে সেই ধোঁয়ার তলায় যেন হাজার হাজার উনুন ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করেছে। যেন আদিম কালের এক সম্রাটের সেনা ছাউনি ফেলেছে। রান্না হবে। কিন্তু সত্যিটা বড়ই নির্মম। সে জানে, ওখানে কলিয়ারির খাদানের মৃত্যুফাঁদ। পরিত্যক্ত খাদানের ফাঁক দিয়ে অক্সিজেন ঢুকে কয়লায় আগুন জ্বলে যায়। সে আগুন নেভানোর সাধ্য অন্তত ওখানকার গরীব লোকগুলোর নেই। দূর থেকে এ দৃশ্য যতই মায়াবী লাগুক। এ আসলে মরণফাঁদ। কিন্তু তিস্যারও তো সম্মুখে ফাঁদ! 

মাথাটার দাম আছে তার। অন্তত কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সেকথাই বলে। সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরই হয়না তার। বাংলোতে কেউ নেই। একমাত্র সরকারী কর্মচারী সাত তাড়াতাড়ি ডিনার সার্ভ করে চলে গেছে। গেটের চাবিটা সে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিল। হতবাক তিস্যা জোর করে চাবিটা নিয়ে নেয়। এ আবার কি? আপনি হঠাৎ চাবি নিয়ে বাড়ি যাবেন কেন? তিস্যার সন্দেহ গাঢ় করে সে চলে গেলো। খাওয়া সেরে তিস্যা আবার বাইকে চেপে বসল। এবার গন্তব্য ওই রাবণের চুল্লি। রাতে বাংলোটা নিরাপদ নয়। 

এই মৃত্যুফাঁদে মানুষ থাকে? অবাক তিস্যা। ছায়া ছায়া অন্ধকারে একটা বস্তি। ভুতের মত লোকজন নড়াচড়া করছে সেখানে। বাইকে হেলান দিয়ে দেখতে দেখতে নজরে এলো একটা ঘর। ঘরটার তিন্দিকে দুটো দেওয়াল। সামনের দিকটা আর লাগোয়া একটা দেওয়াল নেই। ছাতেরও খানিক উড়ে গেছে। কেমন যেন বেআব্রু হয়ে গেছে ঘরটা। এককোণে একটা বুড়ি বসে। বস্তির গলি ধরে হেঁটে আসছে একটা কমবয়সী মেয়ে। হাতে ধরা একটা কাঁসি। ধীরে ধীরে নির্জন একটা জায়গায় বাইকটাকে শুইয়ে দিয়ে তিস্যা হেঁটে এসে দাঁড়ালো ঘরের মধ্যে। 

বেশ আলাপ হয়ে গেলো এদের সঙ্গে। বুড়ির নাম যমুনা। ওটি তার মেয়ে শিবানী। এদের বাপ ঠাকুরদা পুরুষানুক্রমে খনির শ্রমিক। তিস্যা বুঝতে পারেনা। খনি আর কই? বুড়ি অস্পষ্ট উত্তর দেয়। এরা এখানেই মাটি কামড়ে পরে থাকে। যা থাকে কপালে। খাওয়া না খাওয়া নিয়েই জীবন কাটে। এবার তার পালা। বুড়ি জিজ্ঞেস করে – তু ইখানে এলি কেনে? তিস্যার উত্তর শুনে খুনখুনে হেসে বলে – তু মরদ আছিস নাকি রে? ই সব তো মরদের কাম! তু বিয়াসাদী কর কেনে? ইক্কা এস্যেচিস? সাহস বটি তুর! তিস্যা হাসে – আজ রাতটা থাকতে দিবি? তোর ঘরে তো আর বিটাছেলে নাই। কাল সক্কালবেলা চলে যাবো। থাকতে দিবি? বুড়ির মেয়ের মুখটা অন্ধকারে স্পষ্ট নয়। কিন্তু তার কথা স্পষ্ট। সে বলে – ঘর দেখেচিস? ই এখনই মাটি টেনে লিতে পারে জানিস? ই বুড়িটোর মরদ, হামার বাপটো চৌকি লিয়ে হুই ভিত্রে চলে গ্যেচে। শুলাম, সক্কালে দেখলি কেউ লাই, সব ভিত্রে। মেয়েটার গলায় এমন অবধারিত মৃত্যু নিয়ে কী কৌতুক! ভয় মৃত্যু তাকে কি দেখাবে, সেই বরং ছেলেখেলা করছে যেন। তিস্যা চমকে ওঠে। এরাও তো তার মতো ভয়ের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে আছে! পৃথিবী চুল্লি হয়ে নিরন্তর ঝাঁজরা করে দিচ্ছে জীবন। এঁর চেয়ে বেশি কি ভয়ংকর হতে পারে কাঞ্জিলাল আর তার চক্র? 

মা মেয়ের সঙ্গে শুয়ে পড়ে তিস্যা। সকাল হলে সে যাবে গন্তব্যে। শিবানী যাবে দূরের খাদানে কয়লা কুড়োতে। শুয়ে শুয়ে সে জিন্সের পকেটে হাত রাখে। অনুভব করে নেয় ছোট্ট মাউসারটা। সে তো তাও লড়াইয়ের অস্ত্র সঙ্গে রাখে! এরা? সকাল হোক। পৃথিবীর মধ্যে ঢুকে যাওয়ার আগে পুরুষের পথের মাঝখানে একবার দাঁড়াতে চায় সে। একবার বেঁচে নিতে চায় অর্জিত জীবন। 


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-