বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

আখতার মাহমুদ

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
আখতার মাহমুদ
রিক্সায় চড়ে বাদাম খাওয়ার মজা জানে ক’জন? দু আঙুলে টিপে বাদাম ভেঙে, যত্ন করে পাতলা পর্দা ঘষে বাতাসে সাবধানে উড়িয়ে দাঁতের তলায় গুড়ো গুড়ো করে বাদাম চিবোনোর যে কী অমৃত স্বাদ, জানা থাকলে, রিক্সা চড়লেই মানুষ বাদাম খেত। অবশ্যই এটা আমাকে শিখিয়েছিল, জারা। প্রগাঢ় মমতায়-ও যে বাদাম খাওয়া যায়, সেটা জারা ছাড়া আর কেউ জানতো বলে আমার জানা নেই। রিক্সায় বসে জারার ভঙ্গিতে বাদাম চিবোতে চিবোতে খেয়াল করি, রিক্সাওয়ালা লোলুপ দৃষ্টি ফেলছে। হাসলাম। মাত্র দশ টাকার বাদামেরও দারুণ সম্মোহন! 

সাধলাম- ‘ও পাইলট, বাদাম লও!’

রিক্সাওয়ালা খুশি মনেই বাদাম নিল। বাদাম না ভেঙেই ময়লা শার্টে মুছে-টুছে খোসাসমেত মুখে পুরে তৃপ্তিতে চিবোতে থাকল। অবাক বিষয়। এটা আগে দেখিনি। খোসা শুদ্ধও যে বাদাম খাওয়া যায়, জানা ছিল না। একই চেষ্টা করতে গিয়ে মুখ বিস্বাদ হয়ে গেল। বাদামটা নষ্ট ছিল। তবে আরেকটা ভাল বাদাম ভেঙে মুখে দিয়েই মন আবার ফুরফুরে। খুশিমনে শিষ দিতে শুরু করি।

রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করে, ‘ভাইজান, খুব হাসি-খুশি মনে হয়? আমার হাসি-খুশি মানুষ দ্যাকতে ভাল্লাগে।’

‘হুম। আমি হাসি-খুশি। একটা কাজ সুন্দরমত কইরা আসছি। তাই হাসি-খুশি আরো বেশি।’

সমঝদারের মত মাথা ঝাঁকাল রিক্সাওয়ালা। ‘মনমত কাজ শেষ অইলে আনন্দ।’

হাসলাম আপনমনে। কাজ আমার শিল্পীর স্তরের। এটা রিক্সাওয়ালার বোঝাতো দূরে থাক, উপলব্দিও করার কথা না। আর শিল্পী মাত্রই নিজ নিজ কাজে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। একটা কাজ শেষ করেছি, সন্ধ্যায় আরেকটা কাজ বাকি। আনন্দময় শৈল্পিক কাজ। কাজেই আনন্দ।

বাসায় ফিরতেই বুয়া জানায়, মা ঝামেলা করছে। দীর্ঘশ্বাস চেপে মায়ের রুমে গেলাম। 

আমাকে দেখেই প্রশ্ন, ‘জারা কখন ফিরবে?’

‘ফিরবে। তুমি খেয়েছ?’

‘জারা ফিরলে একসাথে খাব।’

‘জারা অনেক ব্যস্ত। ওর ভার্সিটি আছে, কোচিং আছে। ফিরতে দেরি হবে। তুমি খেয়ে নাও। আচ্ছা এসো, আমি খাইয়ে দিই...’

মাকে খাইয়ে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে নিজের রুমে গেলাম। মা সাইকোজেনিক অ্যামনেশিয়ায় ভুগছে। জারা কোনদিনই যে ফিরবে না, সেটা মায়ের মনে নেই। জারার সাথে মায়ের বেশ ভাব ছিল। মায়ের অল্পবয়সে বিয়ে হয়েছিল বলে, জারা মাকে ডাকতো- আমাদের তরুণী মা! মা কখনো জারাকে ছাড়া খেতে বসেনি। ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে চঞ্চল জারার ছবি ভাসে চোখে। অফিস ও টুকটাক বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মায়ের সাথে তেমন কথা-বার্তা হতো না। অবশ্যই একটা বয়সে এসে মায়েদের এড়ানোর দারুণ উপায় ব্যস্ততা। তবে ব্যস্ততা দেখিয়ে মাকে এড়ানো গেলেও, জারাকে এড়িয়ে থাকা সম্ভব হতো না কখনোই। বন্ধের দিনে আমার আয়োজন করে ঘুমোনোর এবং কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকার অভ্যাস। জারা তাতে নারাজ ছিল। সে আমাকে ঘুম থেকে তুলে আবদার করত বাইরে খাবে। আর বাইরে বেরুলেই আমার জন্যে মেয়ে খুঁজত। 

দূরে কোন মেয়ে দেখিয়ে বলত, ‘আচ্ছা ওই মেয়েটার মত হলে চলবে না তোর?’

সব মেয়েরই নাক বোঁচা মনে হত আমার। বলতাম, ‘ওটার নাক বোঁচা। বোঁচা নাক মেয়ে পছন্দ না।’

‘যাহ, নাক বোঁচা হলে সমস্যা কী? মেয়ে তো সুন্দর। চাইনিজগুলো দেখিস না? কী গুলু গুলু সুন্দর হয়! ওদের প্রায় সবারই নাক বোঁচা।’

‘আমার জন্যে জলি টাইপ মেয়ে দেখ। চায়না-মায়না লাগবে না।’

‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি? ধুর! ওরকম দেখলেই আমার লুজ ক্যারেক্টার মনে হয়। ঠোঁটগুলা কেমন হাসের মত ফাঁক করে রাখে সারাক্ষণ। না না, জলি-মলি বাদ!’

আমি হেসে বলতাম, ‘আচ্ছা, বাদ।’

জারা চলে গেছে আজ দু’বছর। ও যেদিন যাবে, সেদিন মিহি-মৃদু বৃষ্টি ছিল। কাক ভেজার মত যথেষ্ট বৃষ্টি-ও ছিল না তা। অথচ, সেদিন আমি প্রবল বৃষ্টি চেয়েছিলাম। দুর্দান্ত, প্রচন্ড মেঘ চিৎকারসমেত, পৃথিবী ঝাপসা করে দেয়া, এক দীর্ঘ প্রলয়ংকারী ঝড় চেয়েছিলাম। তুলোর মত নরোম বাতাস ছিল সেদিন। অথচ আমি চেয়েছিলাম প্রবল, বিক্ষুব্দ, ভয়ানক বাতাস; সমস্ত পৃথিবী লন্ডভন্ড করে দেয়া বিপুল বাতাস। সেদিন আমি পৃথিবীর ধ্বংস চেয়েছিলাম।

জারার প্রেমিক ছিল একজন। জারা ভাবত, কেউ জানে না। অথচ আমার শহরে বোনের প্রেমের খবর আমি জানব না, এটা অসম্ভব ছিল। আমার অজস্র বন্ধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সবখানেই। সবাই চেনে জারাকে। সুতরাং ওর প্রেমিক আছে, এটা আমি জানতাম। ছেলেটা মোটামুটি ভালই ছিল। তাই বাঁধা দিইনি। যাকে সে ভাল মনে করে জীবন সঙ্গী করে নিতে চাইবে, তাকে আমিও গ্রহণ করব। এছাড়া জারা অন্যায় কোনো কাজ করবে না, এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম। অথচ সে আচমকা বদলে গেল। অথবা ওকে ওর প্রেমিক বদলে ফেলেছিল। ছেলেটা ওকে ক্রমাগত হোটেলে নিতে শুরু করেছিল। খবরটা পাই মাস খানেক পর। অফিসের কাজে দেশের বাইরে ছিলাম মাসখানেক। বোধহয় ছেলেটা আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়েছিল।

আমি কখনোই ছেড়ে দেবার পাত্র ছিলাম না। এটা আমার কাছে আমার ছোটবোনকে ধর্ষণের মত অপরাধ। আমার সামর্থ্য ছিল এর সমাধানের। জারা সম্পর্কে কিছু কথা বলব বলে ছেলেটিকে একা ডেকেছিলাম। এক নির্জন ঘরে। ছেলেটি আমার মুখোমুখি হয়ে হাতে চাপাতি দেখেই ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিল। এছাড়াও আমার মত সাড়ে ছয় ফুটি শরীরের দানবের সামনে সে ছিল অসহায় । জবাই করার আগে ফুঁপিয়ে উঠে বলেছিল- জীবনে দ্বিতীয়বার সে জারার মুখোমুখি হবে না। কসম খাচ্ছিল বারবার। জবাই করেও যখন রাগ কমছিল না, তখন পুরুষাঙ্গ কেটে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম কোনদিকে কে জানে। ব্যাপারটা হুট করেই মাথায় এসেছিল, অথবা হয়তো আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম ধর্ষকের ভাগ্য নির্ধারণ করে তার পুরুষাঙ্গ। এছাড়াও ব্যাপারটা আমার কাছে এক মহৎ শিল্প বলে মনে হয়েছিল। একবারও মনে হয়নি, প্রথমবার করছি কাজটা । ওই সময় কেন যেন কৈশোরের কিছু সুখস্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর স্মৃতি। এরপর থেকেই শিল্পী হয়ে ওঠার নেশা চেপে গেল। এখন আমি শিল্পী।

পরদিন সমস্ত পত্র-পত্রিকা ফলাও করে ছাপে খবরটা- ‘নৃশংসভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খুন!’ কয়েকদিন খবরপাড়া গরম থাকে। পুলিশের ধারণা কোনো হিংসুটে প্রেমিকার কান্ড ওটা। ধীরে ঝিমিয়ে আসে সব। পুলিশ কোনো ক্লু খুঁজে পায় না বলে তদন্ত এগোয় না। ঘটনার পর জারা বিমর্ষ হয়ে পড়ে। দিনদিন তার বিষণ্নতা বাড়তে দেখে আর সহ্য হয়নি। ওকে জানিয়েছিলাম আমিই কাজটা করেছি এবং আমি মোটেও অপরাধবোধে ভুগছি না। কেননা ওটা একটা ন্যায়বিচার ছিল।- ভেবেছিলাম আমার স্বীকারোক্তি ওকে স্বস্তি দেবে। কিন্তু প্রথমে সে বিস্মিত হয়েছিল। অবিশ্বাস করেছিল। কেঁদে উঠে বলেছিল, ‘তুমি ঘৃণ্য জীব। আমি জানতাম না, তুমি মানসিকভাবে অসুস্থ।’

পরদিন জারা চলে যায়। একদম পৃথিবী ছেড়েই। এতটা করবে ভাবিনি। একদম জীবন দিয়ে ফেলতে হবে? তার কাছে আমার বা মায়ের কোনো মূল্য নেই? প্রেমিক কি অতটা বড় হতে পারে জীবনে? জীবনের চেয়েও বড়? ভীষণ অভিমান হয়েছিল। ছাদ থেকে লাফিয়ে ঘাড় মটকে গেছিল। মায়ের সামনে পাঁজাকোলা করে হাজির করেছিলাম। পরম মমতায় ধরে রেখেছিলাম একদম বুকের কাছে। যেন একটি হালকা পালক। পলকা, ভঙ্গুর। সামান্য বাতাসেই উড়ে যাবে, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যাবে। জারার বিশ্রী মটকানো ঘাড় দেখে মা জ্ঞান হারায় সাথে সাথেই। সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল। ভাগ্যিস, বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়ে তাকেও সামলানোর ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছেন। সেই থেকে মা মনে করে, জারা বেঁচে আছে। যে কোন মুহূর্তে ফিরবে।

জারা, আমার প্রতিশোধ স্পৃহা বাড়িয়ে দিয়ে গেছে…. অথবা ঘটনাটা হয়তো প্রয়োজন ছিল, মানুষের শিল্পী সত্ত্বা কখনো কখনো কোনো ব্যক্তিগত দুর্ঘটনাতেই প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। এরপর থেকে আমি তীব্রভাবে বিশ্বাস করি, প্রতিজন প্রেমিকই এক একজন ধর্ষক। ধর্ষকের শাস্তি দেয়া আমার শৈল্পিক দায়িত্ব। এভাবেই আমি শিকারী হয়ে পড়ি। শৈল্পিক শিকারী। বলা চলে, এটা আমার নেশাও হয়ে দাঁড়ায়। জারার চলে যাওয়ার পর আট-দশজন জারার প্রেমিকের পরিণতি লাভ করেছে। কেউ কেউ ছিল আমার চারপাশের চেনা-অচেনা প্রেমিক। কেউ কেউ ছিল ধর্ষণ মামলার জামিনপ্রাপ্ত আসামী। সাংবাদিকরা প্রতি ঘটনার পরই আমাকে নিয়ে রসালো খবর ছাপে। ওরা আমার গালভরা একটা নামও দিয়েছে- ‘প্রেতাত্মা’। আমি বুঝি মানুষ আমার কাজ উপভোগ করে। কেননা ফেসবুকে আমার নামে ফ্যানপেইজও চালু করে দিয়েছে কেউ একজন। ওখানে ধর্ষণের খবরগুলো পোস্ট করে মানুষেরা আশা করে আমি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। ওদিকে পুলিশ আমাকে খুঁজছে হন্যে হয়ে। যদিও ওরা কখনো আমাকে খুঁজে পাবে না। আমি ক্লু রাখি না। কাজটা সারাজীবন করে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কেননা এটা আমাকে শিল্পের আনন্দ দেয়। হ্যাঁ, আমি নিজেকে শিল্পী বলি।

আজ দুপুরে করে আসা শিল্পকর্মটি ছিল এক বন্ধুকে নিয়ে। সে জানতে চেয়েছিল, বান্ধবীকে নিয়ে রাত কাটানোর মত ভাল হোটেল পাওয়া যাবে কোথায়...বড় তৃপ্তি হয়েছিল প্রশ্নটা শুনে। শিকার নিজেই ধরা দিলে মধুর আনন্দ হয়। এ আনন্দ ঠিক কতটা মধুর তা একজন শিকারীই বুঝবে। সিসি ক্যামেরাবিহীন একটা হোটেল আগেই ঠিকঠাক করে বন্ধুটিকে দেখানোর নাম করে রুমে নিয়ে জবাই করেছি। কেবল একটা বিষয়ই আমাকে খোঁচাচ্ছে, খুব কাছের বন্ধু ছিল। মৃত্যুর আগে আমার মুখে থু থু ছিটিয়ে বলেছিল, ‘তুই মানসিকভাবে অসুস্থ।’

একজন শিল্পীকে কেউ যদি মানসিকভাবে অসুস্থ বলে তাহলে শিল্পীর রেগে যাওয়া উচিত না? আমিও রেগেছি। রেগে এত জোরে চাপাতি চালিয়েছি যে মাথা আলাদা হয়ে গেছিল শরীর থেকে। আর পাপী অঙ্গটা কেটে বাদ দেয়ার সময় অন্ডকোষ পর্যন্ত কেটে ফেলেছিলাম। সব নিখুঁত হয়নি। তবু কাজ তো শেষ হলো? এতেই খুশি আমি। কিন্তু সে কেন বলল, আমি অসুস্থ? এখানে অসুস্থ হবার কী আছে? আমি অন্যায়ের প্রতিকার করছি। বেছে বেছে ধর্ষকদের মহৎ শিল্পীর মত সরিয়ে দিচ্ছি। এখানে অসুস্থতার কিচ্ছু নেই। তবে ভাবনাটা মাথায় কুট কুট করতে লাগল। কিছু একটা ভাবনা মাথায় ঢুকে গেলে তাড়াতে পারি না। বিশেষ করে কাছের মানুষেরা কিছু একটা বললে। জারাও কথাটা বলেছিল। আমি কি তবে মানসিকভাবে অসুস্থ? কোনো অসুস্থ মানুষের পক্ষে কি সুক্ষ্মশৈল্পিক কাজ করা সম্ভব? যেমনটা আমি করি? আমি জানি সম্ভব না।

দুপুরে হাল্কা বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার কাজের প্রস্তুতি নিতে বিকেলে বেরুলাম। টার্গেট এরিয়ার আশ-পাশ শেষবারের মত রেকি করা দরকার। টার্গেট অনেকদিন আগে থেকেই করা। সহজ শিকার। আমার অফিসের বস। নারী সহকর্মীদের সাথে অশালীন আচরণের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে ভদ্রলোকের নামে। আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছিলাম, আমার কাছে সুপরিচিত কিছু উঠতি মডেলের খোঁজ আছে। ফাঁদে পা দিয়ে আমার বস এক পায়ে খাড়া হয়ে আছেন দীর্ঘদিন। সময় দিয়েছেন আজ। একটা হোটেলে রুম বুক করে রেখেছেন, যেখানে আমি সুন্দরী মডেল নিয়ে যাব সন্ধ্যার দিকে। শেষ মুহূর্তে তার মুখের ভাব কেমন হবে ভাবতেই হাসলাম আনমনে। কিন্তু দুপুরে আমার বন্ধু আমাকে মানসিক ভাবে অসুস্থ বলল কেন? এর তো সমাধান দরকার। ভীষণ দরকার! বন্ধুর মন্তব্য আমাকে অস্থির করে তুলছে। মন অস্থির হলে আমি স্বস্তি পাই না।

পাব্লিক বাসে উঠে গন্তব্যে যেতে যেতে, ফেসবুকে অসংখ্য ফেইক আইডির একটিতে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে লগইন করলাম। সীম-মোবাইল দুটোই নতুন, আজই বেনামে নেয়া। আইডিটায় একজন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রেন্ডলিস্টে আছে। সৌভাগ্যের বিষয়, নক করার সাথে সাথেই ভদ্রলোক সাড়া দিলেন।

বললাম, ‘একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই আপনার সাথে। বিষয়টা জরুরি।’

‘বলুন, কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’

‘আমি একটা কাজ নিয়মিত করতে ভালবাসি। কাজটা শিল্পীর মত ভালবেসে করি। এছাড়াও, আমি বিশ্বাস করি- ভুল করছি না। কিন্তু এজন্যে কি কেউ আমাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলতে পারে?’

‘কাজের ধরণ, মানে ঠিক কী কাজ করেন আপনি, তা জানতে হবে আমাকে।’

‘সবাই আমাকে প্রেতাত্মা নামে চেনে।’

কয়েক মুহূর্ত সাড়া দিলেন না ভদ্রলোক। ভাবলাম, ভদ্রলোক ভয় পেয়ে আর চ্যাট করবেন না।

প্রায় মিনিট খানেক পর ভদ্রলোক সাড়া দিলেন। ‘আই অ্যাম সারপ্রাইজড। বিষয়টা অদ্ভুত। সামান্য আগেও, আমি ঠিক আপনার বিষয়টি নিয়ে এক সহকর্মীর সাথে আলোচনা করছিলাম। যেহেতু আজ বিকেলেই আপনার একটা কাজের খবর আমরা পেয়েছি। আমরা বুঝতে চাইছিলাম, কোনো মানসিক বিপর্যয়ের কারণ আপনার এই কাজের পেছনে থাকতে পারে কী-না। আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই সে? আপনি কী একজন নারী?’

‘আমিই সে। আমি পুরুষ।’

‘আপনি কি সারেন্ডার করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এভাবে আমার কাছে স্বীকার করছেন সব?’

‘আপনার কাছে স্বীকার করলে কিছু যায় আসে না। পুলিশ জানলেও কিছু যায় আসে না। আমাকে কেউ ট্রেস করতে পারবে না।’

‘আচ্ছা বলুন, কেন আপনি এই কাজ করছেন?’

সাইকিয়াট্রিস্টকে সংক্ষেপে আমার আদরের ছোটবোনের কথা জানালাম। জানালাম প্রথম কাজের অনুভূতির কথা; জারার মৃত্যুর কথা; জারার মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে বেছে বেছে ধর্ষকদের শৈল্পিক শাস্তি দেবার কথা; সব!

ভদ্রলোক বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ‘ধর্ষকের শাস্তির জন্যে আইন আছে। আপনি কেন শাস্তি দেবেন?’

‘প্রেমিকরূপী ধর্ষকের শাস্তির কোনো আইন নেই। এছাড়া আমার বোনের মৃত্যু আমার জন্যে দারুণ অনুপ্রেরণা।’

‘আপনাকে কি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি? যেহেতু আপনিই জানতে চাইছেন, আপনি আসলেই অসুস্থ কী-না। যদি আমার প্রশ্ন যুক্তি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন, তাহলে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করে বলতে পারি। হয়তো এতে করে আপনি ভেবে নেয়ার প্রয়াস পাবেন, আপনি আপনার বোনের ঘটনাকে অনুপ্রেরণা বললেও এটা আসলে অজুহাত।’

‘ব্যাখ্যা করুন।’

‘আমার ধারণা, আপনি নিজস্ব এক হাহাকার থেকে এই পথে এসেছেন। আমি প্রায়ই নিশ্চিত যে, কোনো এক গোপন ইর্ষা থেকে আপনি এই ভয়ংকর কাজ করছেন। আপনার বোনের ব্যাপারটা আপনার কাজের পেছনে অনুঘটক নয়। ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ-হতাশা-ব্যর্থতা থেকে আপনি এ কাজ করছেন। আচ্ছা, আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছিলেন? বা কারো সাথে ফিজিক্যাল অ্যাটাচ্মেন্ট ছিল আপনার? কেউ কখনো আপনাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল?’

ভদ্রলোক কোন পথে এগুতে চাইছেন বুঝতে পেরে চ্যাট অসমাপ্ত রেখেই ফেসবুক থেকে লগআউট করলাম। 

স্মৃতিকাতরতা জাপটে ধরতে চাইছে আমাকে। রাতে আরেকটা জরুরি কাজ আছে, এই অবস্থায় সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলা ঠিক হয়নি। এতে মনোযোগ সরে যাবার সম্ভাবনা আছে। না চাইলেও আবছা অতীতের স্মৃতি হুড়মুড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে বর্তমানে। যদিও জানি, অতীতে ফিরে দেখা মানে দেয়ালের ফাঁক ফোকর দিয়ে নিষিদ্ধ কিছু দেখার মতন; যা দেখতে নেই, আবার দেখার লোভ সামলানোও চিরকাল বৃথা। অতীতে অনিচ্ছুক-দ্বিধাগ্রস্ত চোখ রাখতেই ভেসে ওঠে শাম্মী আপার নিষ্পাপ মুখ। 

বিকেলে খেলতে যাওয়ার সময়, ভার্সিটি পড়ুয়া শাম্মী আপার উদাস দৃষ্টি; আমাকে আমার চেনা-জানার বাইরের অদ্ভুত এক মুগ্ধতায় বারবার দেখতে থাকা; কখনো সখনো দোকানে পাঠানোর জন্যে ডেকে বিছানার তলা থেকে টাকা বের করার আপ্রাণ চেষ্টায় তার মিনিটখানেক ঝুঁকে থাকা আর ইতস্তত সরে পড়া ওড়নার আড়ালে শ্বেত বিদ্যুতের ঝলকানিতে আমাকে অন্ধ করে দেয়া; কোনো কোনো রাত্রিতে, সুনসান রাত্রিতে, লোডশেডিংয়ের মুহূর্তে আতংকিত হয়ে আমাকে ঝাপটে ধরা...... 

কৈশোরে প্রকৃতির গোপন রহস্যের ক্রমাগত পাঠ দিয়েছিল শাম্মী আপা। হয়তো দেখতে গায়ে-গতরে বড়সড় ছিলাম বলে অথবা প্রতিবেশি হিসেবে পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের তুলনায় কাছাকাছি বসবাস ছিল বলে কিংবা একান্তই নির্বোধ ছিলাম বলে শাম্মী আপার ভীষণ আগ্রহ ছিল আমাকে নিয়ে। এক বৈশাখের রাতে, পাশের বাড়িতে বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছিল সবাই; আমার এবং শাম্মী আপার বাসার লোকেরা সকলেই। আমার পরদিন পরীক্ষা ছিল বলে যাইনি। সেদিন শাম্মী আপা এসেছিল বাসায়। 

বলেছিল, ‘আয় তোকে জীবন সিলেবাসের শেষ পড়াটা শেখাই।’

দিকভ্রান্ত আমি সেদিন অস্পষ্ট হলেও বুঝতে পারি, কোথাও একটা অস্বাভাবিকতা আছে। মিনিট তিরিশেক পর বিরক্তি-ঘৃণায় আমাকে ঠেলে দিয়ে শাম্মী আপা বলেছিল- ‘ইমপোটেন্ট।’

শাম্মী আপার বিরক্তি-ঘৃণার কারণ কেন হয়েছিলাম, বুঝেছি শাম্মী আপার বিয়ের পর। বাসর হয়েছিল শাম্মী আপার রুমেই, দোতলায়। প্রায় শেষরাতে বিয়ে-বাড়ি ঘুমে নিশ্চুপ হয়ে এলে দোতলার সাথে লাগোয়া আমগাছের ডাল বেয়ে কিশোর কৌতুহলে নিঃশব্দে পৌঁছে গিয়েছিলাম জানালার কাছে। কান পাততেই শুনেছি সুখি শীৎকার। লাইট জ্বলছে বুঝে কাঠের জানালার টিপ পরিমাণ ফুটো দিয়ে উঁকি দিতেই ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মত ঝাঁকি খেয়ে দৃষ্টি খুলেছিল। খোলাসা হয়ে গেছিল, সেদিন শাম্মী আপার বিরক্তির কারণ। অর্থ না জেনেও ‘ইমপোটেন্ট’শব্দটা বুঝে ফেলেছিলাম পলকেই। মুহূর্তেই জল নেমেছিল চোখে। উপলব্দি করেছি, আমি সম্পূর্ণ নই। কেঁদেছিলাম অনন্ত। চোখে ভরা জল আর তীব্র-ভয়ানক ইর্ষা নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম।

সাইকিয়াট্রিস্টকে কৈশোরের এই ঘটনাগুলো জানালে তিনি বলতেন- কৈশোরের ইর্ষাই আমার বর্তমানে ধর্ষকদের শৈল্পিক শাস্তি দেবার কারণ। অথচ বিষয়টা তা নয়। এটা আমি উপভোগ করি। প্রতিটা কাজের সময় শাম্মী আপার সুখি শীৎকার কল্পনা করি। আমি ভাবতে থাকি যাকে জবাই করছি সে শাম্মী আপার বর। এই ভাবনা আমাকে অস্থির আনন্দে উদ্বেলিত করে। 

বাস, যাত্রী ওঠানোর জন্যে থামতেই সস্তা এন্ড্রয়েড ফোনটা রুমালে ভাল করে মুছে-টুছে সীটের কোণায় ফেলে নেমে গেলাম আমার গন্তব্যের এক স্টপেজ আগে। আমি জানি, ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করলেও সতর্ক থাকা উচিত। ডার্ক ওয়েবে কাউকে ট্রেস করা দুঃসাধ্য হলেও অসম্ভব কিছু না। সেক্ষেত্রে মোবাইল-সীম বিসর্জন দেয়াটাই সবচেয়ে যৌক্তিক। আর আমি চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারি- এই মুহূর্তে সাইকিয়াট্রিস্ট পুলিশকে আমার সাথে চ্যাটিংয়ের বিষয়টা জানাচ্ছে। আপনমনে হাসতে হাসতে সিগারেট ধরিয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকি। কিছুটা দেরি হয়ে গেছে, জলদি সন্ধ্যার কাজের প্রস্তুতি নিতে হবে। মন থেকে সব চিন্তা-দুশ্চিন্তা মুছে ফেলি। আমার সামনে অপেক্ষা করছে একটি মহৎ শিল্প কর্ম।



পরিচিতিঃ
জন্মস্থানঃ কাউখালি, রাঙ্গামাটি, বাংলাদেশ। পড়াশুনা বেড়ে ওঠা, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশে। পড়াশুনাঃ ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স, এম.এ। লেখালেখিতে পছন্দের বিষয়বস্তু- মানুষের মনস্তত্ত্ব । প্রকাশিত উপন্যাসসমূহঃ পথিক রাজপুত্র, মায়ামৃগ, স্বপ্নবন্দী।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-