Thursday, September 21, 2017

পূজা মৈত্র

sobdermichil | September 21, 2017 | |
পূজা মৈত্র
( পর্ব-চার )

মামমাম সন্ধেবেলা সেই যে নিজের ঘরে ঢুকেছে বেরোচ্ছেই না। ন’টা বেজে গেল। অরিন কত কষ্ট করে জেগে আছে। মামমাম এলে ডিনার করবে। মায়ামাসি এক্ষুনি ওর খাবার নিয়ে চলে আসবে। খাইয়ে দাইয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। মামমামের আজ খুব কাজ মনে হয়। অনেক লিখতে হবে। তাই ঘরেই বসে আছে। নীল আঙ্কল আসেনি আজ। ঐ জন্যই কি মামমামের মন খারাপ? নীল আঙ্কল একদম ভালো না। ওর জন্যই মামমাম বাবাকে ছেড়ে চলে এসেছে। পিসিমণি বলেছে অরিনকে। নীল আঙ্কলের থেকে অরিনের বাবা অনেক ভালো। গল্প বলে,খেলা করে,ঘুম পাড়ায়-নীল আঙ্কল মামমামকে ডেকে ওর কাছে নিয়ে চলে যায়। অরিনের সাথে একটুক্ষণ কথা বলতেও দেয় না। সবসময় “গৈরিকা দেখে যাও” “গৈরিকা শোনো"-আজ আসেনি ভালো হয়েছে। মামমাম কথা বলতে পারবে অরিনের সাথে,আজ স্টোরি শুনবেই অরিন। মামমাম এত ভালো স্টোরি লেখে,অরিনকে একটা স্টোরিও বলে না। বাবা তো কত্ত স্টোরি বলে। রুপকাথার গল্প,পরীদের গল্প,ভূতের গল্প-সব জানে বাবা। বাবাকে বলেছে অরিন, “বাবা,মামমাম তো স্টোরি লেখে। তো আমাকে বলে না কেন?” বাবা হেসেছিল, “মামমাম এখন বড়দের জন্য লেখে,আর আমি তোকে যে সমস্ত স্টোরি বলি,সব তোর মামমামের থেকে শেখা।” “তোমাকে বলত?” “বলতই তো। রোজ রাতে আমাকে একটা করে ঘুমপাড়ানি স্টোরি বলত।” “ভূতের?” “হ্যাঁ। ভূতেরও বলত। আমি ভয়ে গুটিসুটি মেরে কম্বলের তলায় শুয়ে থাকতাম।” “এত্ত ভয়?” “এত্ত।” “তাহলে এবার আমি মামমামকে বলব ভূতের স্টোরি বলতে।” আজ মামমামকে বলবেই অরিন। মামমামের থেকে শিখেই যখন বাবা এত্ত ভালো স্টোরি বলে তো মামমাম না জানি কত ভালো স্টোরি বলবে।

-খেয়ে নাও। খাবার এনেছি।

-চমকে তাকায় অরিন। ধুর! মায়ামাসি! ও খাবে না। মামমাম না এলে খাবেই না।

-খাবো না।

-কেন?

-বলছি তো খাবো না।

-ম্যাডাম রাগ করবে কিন্তু...

-খাবো না! খাবো না! খাবো না!

হঠাৎ মামমামের গলা পেয়ে চমকে উঠল অরিন। ঘরের দরজা খুলেছে। মামমামের চোখ লাল কেন? কাঁদছিল?

-রিন্টু...

-দেখুন না ম্যাডাম। খাবে না বলছে।

-তুমি আমাকে দাও। রিন্টু এদিকে এসো।

-আমি খেয়ে নিচ্ছি মামমাম। তুমি কাজ করছ...



গৈরিকা বোঝে রিন্টু ভয় পাচ্ছে। ওকে কাছে পেতে ইচ্ছা করল খুব। প্রতি শনিবারই আসে ছেলেটা। গৈরিকা কাজের চাপে ওর দিকে তাকাবার সময় পায় না। লেখার মধ্যে ডুবে থাকলে অন্য কোন কিছুর দিকে খেয়াল থাকে না ওর। নিখিলেশের মা এই নিয়ে রাগ করতেন খুব, “দুধের বাচ্চা কেঁদে কঁকিয়ে গেল,তোর কি একটুও খেয়াল নেই মা?” গৈরিকা লজ্জিত হত। তবুও নিজের দোষ মানত না। নিজেকে ভুল ও মানতেই পারে না। “কি করব? কাজ করছিলাম তো।” “তা বলে নিজের ছেলেটাকে দেখবি না,কেমন মা তুই?” “থাক,তোমার কাছে আর মা হওয়া নাই বা শিখলাম। যেভাবে নিজের ছেলেকে মানুষ করেছ,দেখতেই পাচ্ছি। শোনো,অত নাতির চিন্তা থাকলে আয়া রেখো একটা। আমি আমার লেখা ফেলে ওকে দেখতে পারব না।” নিখিলেশের মা চুপ করে যেতেন। নিখিলেশের ব্যর্থতার কথা উঠলে আহত হতেন উনি। মান্নাদের নিখিলেশ প্যারিসে গিয়েছিল। সেই শুনেই বড় সাধ করে ছেলের নাম দিয়েছিলেন নিখিলেশ। ছেলে প্যারিস তো দূরের কথা পাটুলিও যেতে পারে নি। “আয়া কি দুধ দেবে মা?” একবার বিড়বিড় করে কথাটা বলে ফেলেছিলেন। গৈরিকা শুনেও উত্তর করেনি। নিজের মনে সংকোচে ডুবে গিয়েছিল। আজ হঠাৎ করে ওনার কথা মনে পড়ল, সত্যিই তো। রোজরোজ মায়ার হাতে খেতে রিন্টুর কি ভালো লাগে?

-এখন কোন কাজ নেই আর। এসো খাবে এসো।

-তুমি খাওয়াবে?

-খাওয়াবো তো। এসো।

অরিনকে খাওয়াতে খাওয়াতে মনটা অনেকটা ভালো হয়ে গিয়েছিল। প্রেস ক্লাব থেকে আসা ইস্তক মনটা বড্ড অশান্ত ছিল। অনিমেশ আঙ্কল কেন যে এভাবে জোর জুলুম করছেন ও বুঝতে পারছে না। গৈরিকার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখলে তা বেস্ট সেলার হবে। লোকে হুমড়ি খেয়ে পড়বে বইটার উপর। জানতে চাইবে নিখিলেশ আর গৈরিকার বিচ্ছেদের প্রকৃত কারণ কি। কি লিখবে গৈরিকা? সম্পর্কটা টেকার ছিল না-তাই ভেঙ্গে গেছে। দুপক্ষের কেউই টেকাতে চায়নি। অথচ আঙ্কল চান নিখিলেশকে খুব খারাপ প্রতিপন্ন করে উপন্যাসটা লিখুক গৈরিকা। উপন্যাসে লিখুক নিখিলেশ মাতাল ছিল,দুশ্চরিত্র ছিল,গৈরিকাকে ঈর্ষা করত,ওকে লিখতে দিত না-জোর করে বাড়িতে আটকে রাখত,শারীরিক,মানসিক অত্যাচার করত-অথচ এর অধিকাংশটাই তো মিথ্যা। হ্যাঁ নিখিলেশ মদ খেত-তা বলে গৈরিকার গায়ে কখনো হাত তোলেনি। নিখিলেশের অবসাদ ওর হতাশা গৈরিকাকেকেও গ্রাস করছিল একসময়-কিন্তু গৈরিকা তো সব পিছনে ফেলে বেরিয়ে এসেছে। তাহলে কেন আবার পুরনো কেচ্ছা ঘাঁটা? ইন্দ্রনীলও বা এর বিরোধিতা করছে না কেন? গৈরিকাকে তো ভালোবাসে। নিজের একান্ত ভালোবাসার নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সবাই আলোচনা করুক,তা বই হিসাবে বার হোক,সেই বই পড়তে পড়তে চায়ের কাপে তুফান উঠুক-এটা তো নীলের চাওয়ার কথা নয়। নীল তো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নীরবতা পছন্দ করে। ইনফ্যাক্ট ওর আর গৈরিকার সম্পর্ক নিয়েও কোথাও মুখ খোলে না। তাহলে এক্ষেত্রে সম্পর্ককে নিয়ে বাণিজ্য করতে চাইছে কেন? নাকি এতে নীলেরই সুবিধা। তাই তো,ঠিক তাই। নিখিলেশেকে খলনায়ক প্রণাম করতে পারলে নিজেকে মহান প্রমাণ করাতে সুবিধা হবে। নিখিলেশের দ্বারা অত্যাচারিত গৈরিকাকে উদ্ধার করেছে ইন্দ্রনীল। উপকার করেছে ওর উপর, এটাই মনে হয় অনিমেষ আঙ্কল লোককে জানাতে চান। ইন্দ্রনীলের ভাবমূর্তি ভালো হলে,উচ্ছ্বাসেরই লাভ। এই একটা উপন্যাসই সব গসিপ বন্ধ করে দিতে পারে। অথচ গৈরিকার মন সায় দিচ্ছে না। এতটা অসত্য ভাষণ করা ঠিক হবে না। না,নিখিলেশের জন্য ওর কোন খারাপ লাগা নেই। কিন্তু রিন্টু? ও বড় হয়ে যদি বইটা পড়ে তাহলে তো বাবাকে ভুল বুঝবে। না। এটা হতে দেওয়া যায় না। অনিমেষ আঙ্কলের এই বায়না,ঐ বায়না,সেই বায়না রাখতে গিয়ে মেশিনের মত লিখে চলেছে ও। লেখার মধ্যেকার আনন্দটাই হারিয়ে গেছে। নিজের পছন্দের বিষয়ে অনেক বই পত্র পড়ে অনেক গবেষণা করে লিখবে বলে যখন স্থির করল-তাকে ক্লিশে বলে উড়িয়ে দিচ্ছে ওরা। পাঠক কি নেবে না নেবে তা ওরাই কেবল জানে। তাই বারংবার “মোহকুহক” রিপিট করতে হবে ওকে। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ভালগার লেখা লিখতে হবে। অনেক হয়েছে। নীলকে ভালোবাসে বলে গৈরিকাকে দিয়ে যা খুশি তাই করিয়ে নেবেন ভাবছেন অনিমেষ আঙ্কল,তা হতে দেবে না গৈরিকা।

-মামমাম,স্টোরি বলবে?

অরিনকে ঘুম পাড়াতে গিয়েছিল গৈরিকা। অরিনের ঘরে। নীল আসবে না আর। রাত এগারোটা বাজে প্রায়। গৈরিকার মনে কোথাও একটা ক্ষীণ আশা ছিল,পার্টিতে হাজিরা দিয়ে নীল ঠিক চলে আসবে। কিন্তু না। অভিমান দেখাচ্ছে তাহলে। রাগ দেখাচ্ছে,দেখাক।

-শুনবে তুমি?

-রোজ শুনি তো। বাবা বলে।

-মামমাম কি অত ভালো স্টোরি বলতে পারবে?

-কেন পারবে না? বাবাও তো স্টোরিগুলো সব তোমার কাছ থেকেই শুনেছে। তুমিই তো বাবাকে স্টোরি বলে রাতে ঘুম পাড়াতে।

অরিনের কথায় মনে মনে হেসে ফেলল গৈরিকা। নিখিলেশ ওদের বিয়ের আগে রোজ রাতে গল্প শোনার আব্দার করত। রোজ নতুন গল্প ওকে ফোনে বলতে হবে। বিশেষ করে ভূতের গল্প। গল্প শুনত আর ভয় পেত। উঠে বাথরুমে যেতে পারত না। তাও পরের দিন আবার শুনত। ওকে গল্প বলতে বলতেই গৈরিকা রোজ নতুন গল্পের প্লট মাথায় আনা শিখেছিল। নিখিলেশ মজা করে বলত, “রাতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে আর প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে একে অপরকে ফোন করে ভূত,রূপকথা,রহস্য গল্প শোনে-লোকে জানলে কি বলবে?” “কি আবার বলবে? বলবে এরা আস্ত পাগল।” নিখিলেশ হেসে ফেলত, “পাগল ভাবতে পারে,ধ্বজও ভাবতে পারে। কিন্তু সত্যি বলছি ঐ ন্যাকামি মারা প্রেমালাপের থেকে ভূতের গল্প শতগুনে ভালো।” “বিয়ের পরেও কি গল্পই শুনবে?” “বিয়েটা হোক। তারপর দেখছি।”

-বলবে না মামমাম?

-দাঁড়াও। ভেবে দেখি কোন গল্পটা বলব। রূপকথা?

-বলো।

-নাকি ভূত?

-ভূত, ভূত, ভূত! ভয়ের বলবে কিন্তু!

-শুনে ভয় করলে?

তাতে কি? তুমি তো আছো। তোমাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। আজ তো নীল আঙ্কল আসেনি।

বলে ফেলেই থমকাল অরিন। গৈরিকা কথাটা শুনেও না শোনার ভান করল। এটুকু ওর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল রিন্টু সব বোঝে। বাবাকে গিয়েও নিশ্চয় বলে এসব। মামমাম সারাদিন কি করে,নীল আঙ্কল আসে কিনা,মামমাম আর নীল আঙ্কল একসাথে শোয় কিনা...নিখিলেশ সব খবরই পায়। তাহলে এটাও নিশ্চয় জানে রিন্টু ওর মায়ের কাছ থেকে একদম সময় পায় না। তাও কোন অভিযোগ করে না। আশ্চর্য! চুপচাপ এসে মায়ার হেফাজতে রিন্টুকে দিয়ে চলে যায়। গৈরিকা বাড়িতে আছে কি নেই,জানতেও চায় না। ভেতরে আসতে বললেও আসে না। কোন অভিযোগ করে না নিখিলেশ? জানতে ইচ্ছা করল

-আচ্ছা,আমি আজ কোথাও যাবো না। রিন্টুর কাছেই থাকব।

-কি মজা!

-বাবা রিন্টুর কাছেই শোয়?

-রোজ।

-স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে?

-খুব তাড়াতাড়ি আসে। যতক্ষণ না আসে মিস্‌ থাকে।

-মিস্‌ কে?

-তুমি জানো না?

-না তো! কে সে?

-শিঞ্জিনী মিস্‌। আমাকে পড়ায় খুব ভালো। খুব ভালোবাসে আমায়। আমি তো মিসের কাছেই থাকি,মিস সব পড়ানো বাদ দিয়ে আমাকে দেখে।

অবাক হল গৈরিকা। কে এই মেয়েটা? টিউশন পড়ায়,আবার এত কেয়ার করে? এতই কেয়ার করে যে নিখিলেশের অনুপস্থিতিতে রিন্টু ওর কাছে থাকে?

-বাবা না থাকলে পিসিমণির বাড়ি যাস না?

-ধূর! ওখানে ভালো লাগে না। খেলায় কেউ নেই। মিস্‌ খেলে,গল্পও বলে।

-কেমন দেখতে রে তোর মিস্‌?

গৈরিকা বুঝতে পারছিল ব্যাপারটা আপাতভাবে সহজ হলেও প্রকৃত সহজ নয়। মেয়েটি কেন এত কাছে টানছে রিন্টুকে? নেহাৎ স্নেহের বশে, নাকি নিখিলেশের সাথে কোনরকমের সম্পর্ক আছে? যদি থাকে ভালো তো। বিয়ে করে নিক। কতদিন আর একা থাকবে? রিন্টুর চোখে ভালো থাকার জন্য যদি নিখিলেশ ভাবে সারাজীবন বিয়ে করবে না,ভুল করবে।

-দেখতে খুব ভালো।

-খুব? মামমামের থেকেও ভালো?

-না,না। মামমাম সবচেয়ে ভালো। মিসও ভালো। কিন্তু মামমাম আর বাবা সবচেয়ে ভালো।

খুশি হয় গৈরিকা। মামমামের চেয়ে ভালো রিন্টুর কাছে কেউ হতে পারেনি।

-জানো মামমাম,বাবার মুখে পচা গন্ধ এখন আর পাওয়া যায় না। গৈরিকা বোঝে রিন্টু বাবার ড্রিঙ্ক না করার কথা বোঝাতে চাইছে।

-তাই? তাহলে তো বাবা ভালো হয়ে গেছে।

-খুব ভালো। বাবার না এবার একটা বই বেরোবে,বুক ফেয়ারে। বলেই জিভ কাটে।

-কি হল?

-এটা তো সিক্রেট ছিল। আমি তোমাকে বলে দিলাম।

নিখিলেশ চায়না গৈরিকা ওর ব্যাপারে কিছু জানুক। বিশেষত ওর বইয়ের ব্যাপারে কোন খবর পাক-এটা চায়না। অথচ গৈরিকা সব জানে। ওর গল্পের নটে গাছ মুড়ানোর সমস্ত প্রস্তুতি করে ফেলেছে। নিখিলেশ সফল হলে ওকে সাফল্যে মানাবে না। সাফল্য ওর জন্য নয়,বিষাদমগ্ন হিসাবেই ওকে ভালো লাগে।

-মামমামকে সব বলতে হয়। কোন সিক্রেট রাখতে নেই।

-তুমি তো শোনই না। বলব কখন? হয় লেখো, না হয় নীল আঙ্কলের সাথে গল্প কর...

গৈরিকা হেসে ফেলে। একদিন সুযোগ পেয়েই রিন্টু নিজের সব অভিযোগ উগড়ে দিচ্ছে,দিক। ওকে থামাবে না গৈরিকা। ওর সাথে একটুক্ষণ কথা বলেই সব স্ট্রেস উধাও হয়ে গেছে যেন। ওর মনটাকে আরো কাছ থেকে জানতে ইচ্ছা করছে। ছেলের সাথে কাটানো সময়টা বেশ এনজয় করছে গৈরিকা।

-এবার থেকে সব শুনব।

অরিনের মুখে অনাবিল হাসি ফুটে উঠতে দেখে গৈরিকা। এত সুন্দর হাসি ও আগে কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ মনটাই দ্রব হয়ে যায় ওর। খুশি হয় গৈরিকা,বহুদিন পড় এতটা খুশি হয়। নিজের ইচ্ছামত,নিজের খেয়ালখুশির জন্য কিছু করতে ইচ্ছা করে ওর। রিন্টুর কপালে একটা চুমু খায়। রিন্টু মামমামকে জড়িয়ে ধরে। ওকে আদর করে ঘুম পাড়ায় গৈরিকা। নিজেও ঘুমিয়ে পরেছিল। হঠাৎ ফেসবুকের নোটিফিকেশনে ঘুম ভেঙ্গে যায়। চিরন্তনী আবার কি আপডেট দিল? চেক করতে উদ্যত হয় গৈরিকা। ছবিটা দেখেই চমকে ওঠে ও, একি! অনিমেষ আঙ্কলের বাড়ির পার্টিতে আঙ্কল,নীল,মিমির সাথে চিরন্তনী? কি করে হয় এটা? যেখানে গৈরিকাকে নিয়ে যাওয়া যায় না বলে এড়িয়ে গেল নীল সেখানে এই মেয়েটা এল কি করে? কে ডেকেছে ওকে? জানতে হবে। এক্ষুনি জানতে হবে। নীলের ফোনে কল করল গৈরিকা। ফোনটা পরিষেবা সীমার বাইরে ।


(পর্ব-৫)

বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে অবাক হল নিখিলেশ। দরজা খোলা,ভেতরে আলো জ্বলছে-তাহলে শিঞ্জিনী এসেছে নাকি? বাড়ির একটা চাবি ওর কাছে থাকে। নিখিলেশ না থাকলে যাতে আর্চির কাছে যেতে আসতে পারে। আর্চিকে তালা দিয়ে বেরোয় নিখিলেশ। শিঞ্জিনী ওর চাবি দিয়ে তালা খুলে ঢোকে। ওর কোন কাজ পড়লে আবার তালা দিয়ে ঘুরে আসে। আর্চিকে পাড়ায় খেলতে ছাড়ে না নিখিলেশ। পাড়াটা ভালো নয়। শহরের প্রান্তিক পাড়া। তাই শিক্ষিত লোকজন তেমন থাকে না। যারা থাকে তারা পরনিন্দা পরচর্চার সিদ্ধহস্ত। কোথা থেকে কি শুনে ফেলবে আর্চি-তার থেকে বাড়িতে থাকাই ভালো। তাও পাশের বাড়ির দাদা বৌদিদের অশান্তি রোজ শোনে ও। বস্তি টাইপের বাড়ি ওটা। চার ভাই-চার বৌ ছেলেপুলে নিয়ে থাকে। তার মধ্যে একজন ভ্যান চালায়। দুপুরবেলায় ভরপেট্টা বাংলা গিলে এসে বৌয়ের কাছে কাঁওতালি করে। অশ্রাব্য গালিগালাজ,নোংরা কথাবার্তা,মারধোর...নিখিলেশ ওদের দিকের জানলাটা বন্ধ করে রাখে। তবুও সব কথা কি আটকানো যায়? আর্চিটা কবে যে কোন কথাটা শুনে শিখে ফেলবে কে জানে? তবে যা কিছু নতুন শেখে,সব আগে বাবাকে বলে,এটাই নিশ্চিন্তি। বাইরের টিনের দরজাটা খুলে বাইকটা ঢোকাল নিখিলেশ। সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। আগে বাগান ছিল। বাবা ফুলগাছ লাগাতেন,গাছে জল দিতেন-এখন ওসব কিছু করা হয় না। ফাঁকা জমি হয়ে পড়ে আছে। বাইরের পাঁচিলের ধার ঘেঁষা শিউলি গাছটা শুধু রয়ে গেছে,মরে নি। এখনো পূজোর আগে থেকে গাছ ভরে ফুল হয়। শিউলিফুল ছড়িয়ে থাকে সারা উঠোন জুড়ে। আর্চি মহানন্দে কুড়ায় ফুলগুলো। বাবাকে এসে দেখায়। নিখিলেশ অবাক হয়। এই স্বভাবটা মায়ের মত পেয়েছে আর্চি। গৈরিকারও বড় প্রিয় ফুল শিউলি। স্কুল থেকে ফিরে নিখিলেশ দেখত ঘর ভর্তি হয়ে রয়েছে ফুলে। “এত ফুল তুলেছ আজ?” “তুলিনি তো,কুড়িয়েছি।” মিষ্টি হাসত গৈরিকা। “কুড়িয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে রেখেছ,গুছিয়ে তো রাখা যায়।” “কিছু কিছু জিনিস অগোছালোই ভালো লাগে।” “যেমন?” “যেমন তুমি, তুমি যদি আর পাঁচজনের মতো স্যুট,টাই পরা,ধোপদুরস্ত গোছালো মানুষ হতে তোমাকে থোড়ি ভালোবাসতাম আমি?” “তাই? তা বেশ। স্কুল থেকে ফিরে হাত পা ধুইনি এখনো। অগোছালো হয়ে যাই এখনি?” “তা কেন? এক্ষুনি তোমার মা ডাকবে, বাবু-খেতে আয়” “জবাব দেব না।” নিখিলেশ হাসিতে দুষ্টুমিভাব নিয়ে আসত। “না,না-এখন না,আমি লিখছি।লেখাটা শেষ করি?” নিখিলেশ হেসে ফেলত এবার, “এই যে বলছিলে অগোছালোই পছন্দ?” “পছন্দ,কিন্তু লেখার মধ্যে আছি তো...” নিখিলেশ গৈরিকার কপালে চুমু খেত, “লেখ,লেখা হলে টিফিন করে নিও।” “তুমি?” “আমি একটু বেরোব। সৌগতদা ডেকেছে।” “রাগ করলে?” “ধুর! রাগ কিসের? তোমার লেখাটা তোমার প্রায়োরিটি,তোমার কাজে আমি ব্যাঘাত করি কখনো?” “সত্যি বলছ তো?” “সত্যি,আমি একটু মজা করছিলাম মাত্র। না হলে স্কুল থেকে ফিরেই হাত পা না ধুয়ে বৌকে নিয়ে বিছানায় চলে যাওয়ার মতো অগোছালো আমি নই। তুমি চেন না আমায়? মা খেতে ডাকার আগে তোমার সাথে বন্ধ ঘরে বড়জোর দশমিনিট গল্প করতাম। দুটো নতুন কবতে লিখেছি,শোনাতাম। কিন্তু তুমি যখন কাজ করছ,করে নাও-পরে শোনাবো।” “এখন শুনিয়ে যাও। তোমার কবিতা শোনার তর সয় না আমার।” “এখন না। লেখার খেই হারিয়ে যাবে,কবিতা মাথায় ঘুরবে,লিখে নাও। রাতে শোনাব। সারা রাত তো পড়ে আছে।” গৈরিকা লেখায় মন দিত আবার। নিখিলেশ ধীর পায়ে ঘর থেকে চলে যেত। গৈরিকার প্রতিভাকে নিজের সবটুকু দিয়ে সংরক্ষণ করত নিখিলেশ। মা’কে বলা ছিল ওকে যেন ঘরের কাজে না ডাকে। রান্নাবান্না,বাসন মাজা,কাপড় কাচা,ঘর মোছার জন্য ও নয়। মা কখনোই ডাকত না। ওকে অফুরন্ত সময় দিত নিখিলেশ। লিখুক ও। সারাদিন ধরে লিখুক। নিখিলেশ নিজে যখন উঠতে পারছিল না,সব জায়গা থেকে ল্যাং খাচ্ছিল,কাছের বন্ধুরা,ভাইরা,দাদারা ছকবাজি চ্যানেলবাজি করে উপরে উঠে যাচ্ছিল আর ও কলকাতায় থাকতে পারে না বলে হাত কামড়াচ্ছিল,যখন গোপাল সরকার গৈরিকাকে না পেয়ে ওর ঝালটা নিখিলেশ কে কর্নার করে মেটাচ্ছিলেন-তখন নিখিলেশ নিজে হতাশ হয়েছিল। সবার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। এই সাহিত্য জগৎ-এ কেউ কারোর নিজের নয় এই সার সত্যিটা বুঝতে পেরেছিল,স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাঁটার ইচ্ছা বা রুচি ওর ছিল না,তাই এসবের থেকে দূরে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিল,নিজে লিখতে পারে,জানত। অথচ লেখার জোরের থেকেও যখন মোসায়েবি,তোষামোদি,টাকা,রংরূপের জোর বেশি প্রমাণিত হচ্ছিল তখন লেখার উপর থেকেও বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল যেন। নিজের হতাশা,নিজের অবসাদ কাকে বলবে আর? গৈরিকাকেই বলত। ও যে তাতে বিরক্ত হত,কখনো বোঝেনি নিখিলেশ। সামান্যতম ইঙ্গিতও পায়নি। পরে শুনেছে গৈরিকাকে নাকি নিখিলেশের হতাশা,ওর অবসাদ গ্রাস করছিল-ওর লেখাকে ব্যাহত করছিল-তাই ও এ বাড়ি থেকে পালিয়ে বেঁচেছে। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেছে নিখিলেশ। প্রশ্ন করেছে,ও কি কোনওদিন গৈরিকার উপর নিজের ব্যর্থতার ভার চাপিয়ে দিয়েছিল? কখনো কি নিখিলেশ গৈরিকাকে নিরুৎসাহিত করেছিল? উত্তরটা না,না এবং না। তবুও চলে গেল ও। সংসার,সন্তান এমনকি ভালোবাসাটা ফেলে চলে গেল। নিখিলেশেরই বুঝতে ভুল হয়েছিল। ভালো হয়তো কোনদিনই বাসেনি গৈরিকা। আদতে ও নিজেকে ছাড়া কাউকেই ভালোবাসে না। সম্পর্কের মূল্য ওর জীবনে খুব কম। সাফল্যের বিনিময়ে যে কোন সম্পর্ককেই বলি দিতে পারে ও। চোখে ঠুলি বেঁধে শীর্ষের দিকে ছুট লাগিয়েছিল মেয়েটা। শীর্ষ আজ ওর পায়ের তলায়। এবার কি করবে? কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? সম্পর্কে কি বাঁধবে আবার? বাঁধুক। ইন্দ্রনীল বসু তো যোগ্য পাত্র। মোষের দুধ তো সোনার পাত্রেই রাখতে হয়। নিখিলেশের মতো তামার পাত্র কখনোই গৈরিকার যোগ্য ছিল না। সোনার পাত্রেই থাকুক গৈরিকা। তবুও থাকুক। হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো অনেক হয়েছে,এবার জমিতে পা দিক। না হলে একা হয়ে যাবে মেয়েটা। নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। শীর্ষে ওঠার অনুভূতিটা ভীষণ সুন্দর। অথচ শীর্ষে মানুষকে একাই উঠতে হয়। ওখান থেকে নীচের সব কিছুতে খুব ছোট মনে হয়। খুব তুচ্ছ মনে হয়। যে শীর্ষে থাকে সবাই তাকে হিংসা করলেও তার মত একা কেউ হয় না।

-আপনি খেয়ে নিন।

শিঞ্জিনীর কথা শুনে তাকাল নিখিলেশ। বাড়ি এসে দেখে মেয়েটা ওর জন্য রান্নাবান্না করে বসে আছে। একবার ভেবেছিল বলে, “কেন এসব করতে গেলে?” বলেনি। থাক ওর যা ভালো লাগে ও তাই করেছে। হাত পা মুখ ধুয়ে চেঞ্জ করে নিজের ঘরে রামের বোতলটা নিয়ে বসেছিল নিখিলেশ। প্রুফ দেখছিল,আর গ্লাসে রাম ঢেলে অল্প অল্প করে খাচ্ছিল

-রেখে যাও। আমি খেয়ে নেব।

-না খেয়ে নিন,না হলে আপনার খেয়াল থাকবে না।

-আমি কি ছোট্ট ছেলে নাকি,যে আমাকে ধরে বেঁধে খাওয়াবে? বাড়ি চলে যাও। না হলে তোমার মা খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এলে আমাকে যা তা কথা শোনাবে।

-কেউ কিছু বলবে না। আমি মাকে বলেই এসেছি।

গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখল নিখিলেশ। চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। শিঞ্জিনীর দিকে তাকাল এবার।

-তাই? কি বললে? আর্চি বাড়ি নেই,আর্চির বাবা একা রয়েছেন-আমি ওনার সেবা করতে যাচ্ছি?

-একদম না। যা সত্যি তাই বললাম।

-সত্যিটা কি শুনি?

-বললাম,আমি নিখিলেশবাবুর কাছে যাচ্ছি। মা বলল কেন? বললাম ওনার জন্য রান্না করব।

-আর তোমার মা খুশি মনে ছেড়ে দিল?

-দিত না। তবে আটকাতেও পারত না। আমার যা মনে হয়,আমি তাই করি।

-সে তো দেখতেই পাচ্ছি। তবে বলি কি,এভাবে একা একা এখানে এসো না। তোমার বদনাম হবে। আমার ভয় আমি করি না। কিন্তু তোমার সামনে তো পুরো জীবনটাই পড়ে আছে।

-আমিও বদনামের ভয় করি না। আর আপনার সাথে জড়িয়ে যদি বদনাম হয় তাতে আমারই ভালো।

-সে কি? কেন?

-বোঝেন না?

শিঞ্জিনীর চোখের দিকে তাকায় নিখিলেশ। ওর চোখে মুখে স্পষ্ট অক্ষরে সত্যিটা লেখা আছে। মেয়েটা ভালোবাসে। নিখিলেশকে। নিখিলেশ চোখ নামায়

-না বুঝতেও চাই না। খাবার রেখে চলে যাও।

-আপনি এত নিষ্ঠুর? কবিরা তো নরম মনের হয় জানতাম।

-আমি নই। আসলে আমার মনটাই মরে গেছে।

-আমি যে ভালোবাসি আপনাকে...

শিঞ্জিনী কথাটা বলে ফেলে। নিখিলেশ তাকায়। মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছে,চোখ দুটো দিয়ে অনবরত জল ঝরছে। ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে রয়েছে। ঐটুকু মেয়ে কতই বা বয়স ওর-বাইশ কি তেইশ,রোগাটে গড়ন,বেঁটে খাটো-দিব্যি সাহস করে ওর থেকে পনেরো বছরের বড় একজন মানুষকে বলে দিল যে ভালোবাসে। ভালোবাসলে কি মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে যায়? যুক্তি দিয়ে ভাবতে ভুলে যায়? শুধু মনের কথা শোনে?

-কাঁদছ কেন? কেঁদো না। আমি ওভাবে বলতে চাইনি।

--তাহলে? আপনি বুঝেও বুঝবেন না পণ করে রেখেছেন?

-আমি অযোগ্য শিঞ্জিনী। পচে গেছি। আমার কাছে এলে তুমিও ধ্বংস হয়ে যাবে। ছাই হয়ে যাবে।

-হই হব।

-এত জেদ তোমার?

-ধরে নিন তাই।

-এই মেয়ে পাগলামি করো না। কি আছে আমার যে আমায় ভালোবাসো? ব্যর্থ তো আমি। অবসাদগ্রস্ত,হতাশ। আজ ভালোবাসছো কাল তোমার দমবন্ধ হয়ে যাবে।

-কোনদিন হবে না। আপনি যেমন হোন না কেন,আপনাকে আমি ভালোবাসি আর সারাজীবন ভালোবাসব।

দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করল শিঞ্জিনী। সারাজীবন ভালোবাসবে? কে বলেছিল যেন কথাটা? গৈরিকা,গৈরিকাই তো...ওদের বিয়ের দিন মন্দিরে দাঁড়িয়ে ওর হাতে হাত রেখে বলেছিল সারাজীবন ভালোবাসবে। তাহলে এ কে? শিঞ্জিনী না কি গৈরিকা? গৈরিকাই ফিরে এসেছে? চোখে ঘোর লাগল নিখিলেশের। শরীর বিস্মৃতকাল পর জেগে উঠল। ঢকঢক করে রামের পুরো বোতলটাই গিলে নিল ও।

-সারাজীবন বাসবে,সারাজীবন বাসবে না, না? তাহলে ভয় কিসের? দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? কাছে এস।

নিখিলেশের গলা জড়িয়ে যাচ্ছিল। শিঞ্জিনী কাছে আসতেই ওকে আঁকড়ে ধরল নিখিলেশ। বিহ্বলতার ঘোরে ওর সমস্ত আবরণ সরিয়ে দিল। শিঞ্জিনী একটুও বাঁধা দিল না। যেন কামনার সাথে ও পরিচিত,চির অভ্যস্ত। নিখিলেশ বিভ্রান্ত হল। যে নারী শরীরটাকে হাতের মুঠোয় পেয়েছে ও তাকে এত চেনা মনে হচ্ছে কেন? নিজের মস্তিস্ককে ছুটি দিল ও। শরীরের হাতে সব ছেড়ে দিল। শিঞ্জিনীকে ভোগ করতে করতে যখন জ্ঞান হারাল নিখিলেশ ওর মুখ থেকে অস্ফুটে শোনা গেল, “তুমি যাবে না তো,আর ছেড়ে যাবে না তো?” শিঞ্জিনী বুঝতে পারল না কথাটা কার উদ্দেশ্যে বলা,খুশি হল ও। আশ্লেষে ঘোরে বলল, “কক্ষনো যাবো না,কোনদিন যাবো না।

(পর্ব-৬)

সকাল থেকে নিজের ঘরে নিজেকে বন্দী করে রেখেছে গৈরিকা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে এল,ঘর থেকে বেরোয়নি, খায়নি। মায়া ডেকেছে,রিন্টু ডেকেছে-শুনেও শোনেনি ও। বরাবরই ও এইরকম। নিজের মনমতো কিছু না হলে খাওয়াদাওয়া শিকেয় তুলে নিজেকে নিজের ঘরে বন্দী করে দেয়। ছোটবেলায় মা-বাবা অনেক সাধ্যসাধনা করে ঘর থেকে বার করত। নিখিলেশের বাড়িতে থাকতেও নিখিলেশের মা অনেক করে দরজা ধাক্কাতেন। নিখিলেশ ডাকাডাকি করত না। গৈরিকাকে ওর মত ভালো করে কেউ চেনে না। ও জানত,রাগ পড়লে নিজে থেকেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে গৈরিকা। ওকে ওর মত থাকতে দিত তাই। গৈরিকা সব চাওয়া পাওয়া না বলতেই বুঝে যেত নিখিলেশ। চাকরি ছেড়ে বছর দুয়েক ঘরে বসে লিখতে চেয়েছিল গৈরিকা। বাবা-মা মানেনি। লেখার জন্য স্কুলের চাকরি ছাড়া পাগলামির নামান্তর বলেছিল সবাই। শুধু নিখিলেশ বুঝেছিল। গৈরিকার সব কথা শুনে একটু ভেবে বলেছিল, “বিয়ে করে নাও। চাকরি করতে হবে না। আমি খাওয়াবো তোমায়। তোমার মা বাবাকেও দেখব। দরকার হলে টিউশন করব। তুমি লেখো।” “ভেবে বলছ?” “একদম।” “তোমার লেখা?” “আমার আবার কবিতা লিখতে সময় লাগে নাকি। প্রলিফিক লিখি আমি। স্কিল এত বেড়ে গেছে যে দিনে আধঘণ্টা পেলেই পাঁচটা কবিতা নেমে যাবে। ওসব নিয়ে তুমি ভেবো না। গদ্য লিখবে বলছ যখন,সময় দরকার। আমি তোমাকে সময় দেব।” “কবে বিয়ে করবে?” “কালই করে নিই, মন্দিরে করে নিই না হয়? অত অনুষ্ঠান লোক খাওয়ানোতে পয়সা নষ্ট করে কি হবে?” নিখিলেশের কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল গৈরিকা। পরের দিনই বিয়ে করেছিল ওরা, মা বাবার অমতে। সেই থেকে মা-বাবার সাথে যোগাযোগ রাখেনি গৈরিকা,নিখিলেশ রাখতে চেয়েছিল, ওনারা রাখেনি। কথা রেখেছিল নিখিলেশ। দুই বছর ওর সংসারে শান্তিতে লেখার সময় পেয়েছিল গৈরিকা। কুটোটিও নাড়তে হত না ওকে। অথচ নিখলেশ ঝাঁপাতে জানত না। স্বপ্ন দেখত। সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখত,তার পিছনে ছুটতে জানত না। কিংবা ছুটলেও সোজা হয়ে পথে ছুটে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকত। বাঁকা পথগুলো চিনতে চাইত না। কিন্তু সাফল্য তো সাফল্যই। তা সোজা পথেই আসুক। কিংবা বাঁকা পথে।

সারা ঘর ধোঁয়ায় ভরে আছে। একটার পর একটা সিগারেট খেয়েছে গৈরিকা। টেনশন হলে,রাগ হলে ও স্মোক করে। গত পাঁচবছরে চেইন স্মোকার হয়ে গেছে। নীল মানা করে। বোঝায় অত বেশি স্মোক করলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হবে। নীল সকাল থেকে একবারও ফোন করেনি। চিরন্তনীর পোষ্টটা যে গৈরিকা দেখেছে,বেশ বুঝেছে নীল। গৈরিকা লাইক দিয়েছে একটা ইচ্ছা করেই। নীলকে জানাতে চেয়েছে ও সব জানে। ফ্যামিলি পার্টিতে চিরন্তনী কি করছিল এই উত্তরটা হয়ত নীল। গুছিয়ে উত্তর সাজিয়ে তারপর আসবে। আসুক। আসতে ওকে হবেই। কোন প্রশ্ন করবে না গৈরিকা। এড়িয়ে যাবে। ইগনোর করবে। নীলকে ইগনোর করলে ও রেগে যায়,কষ্ট পায়,ভেঙ্গে পড়ে। রাগ দেখায় প্রথমে,তারপর অনুরোধ করে,তারপর জোর ফলায়। লেখার মধ্যে ডুবে থাকার ভান করে গৈরিকা ওর প্রত্যেকটা অভিব্যক্তিকেই লক্ষ্য করে। ধৈর্য্যের সীমা পেরিয়ে গেলে নীল গৈরিকার লেখার চেয়ার থেকে পাঁজাকোলা করে ওকে বিছানায় নিয়ে যায়। “ছাড়ো...” “ছাড়বো কেন?” “আমি লিখছি।” “আমার কথা না শোনার সাহস হয় কি করে?” “সাহস লাগে নাকি?” ইন্দ্রনীল গৈরিকার ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। “আলবাৎ লাগে। বড্ড বেশি সাহস হয়ে গেছে তোমার।” “কি করবে তাহলে?” ইন্দ্রনীল গৈরিকার ঘাড়ে গলায় চুমু খেতে খেতে, “দেখতেই পাবে।” ভালো লাগে গৈরিকার। শরীর জেগে ওঠে। “শাস্তি দেবে?” “দিতেই পারি। কতটা শাস্তি দেবো,তা তোমার উপর নির্ভর করবে। যদি তুমি আর এমন দুষ্টুমি না করবে না বলো,তাহলে শাস্তির পরিমাণ কমতে পারে।” গৈরিকার কানে কামড় বসায় ইন্দ্রনীল। “যদি বলি শাস্তি পেতেই ভালো লাগে আমার?” “তাহলে তো শাস্তি দিতেই হয়।” গৈরিকার আবরণ সরাতে থাকে ইন্দ্রনীল। ওর চুলের মুঠি ধরে ওর মুখটাকে টেনে তোলে গৈরিকা, “এখন কেন? গত দু’দিন যেখানে ছিলে সেখানে যাও।” “গত দু’দিন আমি তোমাকে কতটা মিস করেছি জানো?” “জানব কি করে? ফোনও তো করোনি তেমন।” “গত দু’দিন না এসে তোমায় খুব কষ্ট দিয়েছি,না?” “জানি না।” “ডোন্ট ওরি। আই উইল কমপেনসেট ফর দ্যাট। সারারাত তোমায় ভালোবাসব আজ।” “লেখাটা শুনবে না?” “না আজ আর লেখা শোনা,কমেন্ট ধরা,সমালোচনা করার মুড নেই। লেখা টেকা শিকেয় তুলে রাখো।। লেখিকা গৈরিকা সান্যালকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। নারী হও। একটু নারী হও। সাধারণ নারী। রক্তমাংসের নারী।” সাধারণ না হলে বুঝি ভালোবাসা যায় না?” “একদম যায় না। গৈরিকা সান্যাল মানেই সরস্বতীর প্রতিমূর্তি। গম্ভীর গম্ভীর,চুপচাপ তাকে ধূপধুনো জ্বেলে পুজো করতে ইচ্ছা করে।” প্রথম প্রথম সেই কারণেই বুঝি ভালোবেসেও কাছে আসতে না?” ইন্দ্রনীল হাসে, “ভয় করত,যদি ভুল বোঝো। পরে জানলাম তোমার মধ্যেও ভালোবাসা আছে,চাওয়া পাওয়া আছে। সাহস তো তুমিই দিলে আমায়। আর একবার যখন তোমার মাঝে আমার সোনাকে খুঁজে পেয়ে গেছি-কোথাও যেতে দেব না-কোথাও যেতে দেব না।” “আঁকড়ে রাখবে?” “সারাজীবন আঁকড়ে রাখব। চলো না, ক’দিন ঘুরে আসি।” “এখন দুটো উপন্যাস চলছে...” “ধ্যাৎ! লেখার কথা বাদ দাও না।” “তাই? ডেড লাইন দিয়ে দেন আঙ্কল। না দিতে পারলে বকুনিটা কে খাবে?” “বাবাও না!” পারেও। বড্ড টাস্ক মাস্টার। তুমি বড্ড বেশি লিখছ সোনা! ক’দিন ছুটি নাও। স্ট্রেসটা অতিরিক্ত পরে যাচ্ছে। আমি তোমাকে আমার পাবলিকেশনের লেখিকা বলে ভালোবাসি না। তোমার মধ্যেকার নারীকে ভালোবাসি। হ্যাঁ,তুমি যত বেশি লিখবে,ততই আমার লাভ-কিন্তু তা বলে যন্ত্রের মত ব্যবহার করতে পারব না। কখনো তোমার শরীর,মনের উপর চাপ পড়ুক চাইব না।” “আচ্ছা বাবা! হয়েছে। এই দুটো উপন্যাস শেষ করেই ব্রেক নেব আমি। তুমি যেখানে নিয়ে যাবে,তোমার সাথে চলে যাব।” “কাগজ,পেন বাড়িতে ফেলে যাবে কিন্তু।” “তাই যাবো।” নীলের আদরে ডুবে গিয়েছিল গৈরিকা।

ব্রেকটা নেওয়া হয়ে ওঠেনি। একটার পর একটা কাজে ফুরসৎ-ই পায়নি। তবে এবার ব্রেকটা না নিলেই নয়। শ্রিরতা ভালো যাচ্ছে না। প্রায়শই মাথা ধরে,মাইগ্রেন। মায়ের ছিল। ওরও হয়েছে। অসহ্য মাথা ধরে যখন এক লাইনও লেখা যায় না। চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়তে থাকে। বমি হয়। রাতে উঠে উঠে বমি করতে হয়। মায়াকে ডাকে না। ও ঘুমায়। সারাদিন খেটেখুটে একটু শুতে পারে বেচারি,ওকে ডাকতে ইচ্ছা করে না। নীল থাকলে ওঠে। মাথা টিপে দেয়। তবে গত দু মাসে হাতে গুনে সাত-আটদিন ছিল নীল। যে ক’দিন ছিল ওদের মধ্যে শরীর দেওয়া নেওয়াটাই হয়েছিল। ক্লান্ত ছিল নীল। কথা বলার মুডে থাকত না। পরপর কয়েকদিন আসতে না পারার জন্য নিজেও সংকোচে থাকত। গৈরিকাকে ভালোবাসলে,আদর করলেই ওর সব মান অভিমান মুছে যাবে ভেবে ওর শরীরকে তৃপ্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। অন্যদিনগুলো গৈরিকাকে উপোসী রাখার খেসারত সুদে আসলে মিটিয়ে দিতে গিয়ে আজকাল নীল ভুলে যাচ্ছে গৈরিকা শুধু নীলের শরীরকেই নয়,ওর মনকেও চায়। ওর মতো মনোযোগী পাঠক কেউ নেই। গৈরিকা প্রত্যেকটা লেখা আগে নীলকে শোনায়-তারপর জমা দেয়। অথচ আজকাল নীলকে লেখা শোনানোর সময়ই হচ্ছে না। লিখেও তাই তৃপ্তি পাচ্ছে না। একটা অতৃপ্তি খচখচ করছে। নীল কেন আগের মত রোজ আসছে না? তাহলে কি এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে? না,না টা কি করে হয়,নীল তো ওকে ভালোবাসে,আর সারাজীবন ভালোবাসবে বলেছে।

চিরন্তনী মেয়েটা খুব ঠাণ্ডা মাথার খেলোয়াড়। অনিমেষ আঙ্কলের উপর জাদু করেছে ও। ‘জাতি’তে এখন ওরই ধারাবাহিক উপন্যাস বেরোচ্ছে। তা বেরোক। তাতে বিন্দু মাত্র চিন্তা নেই। কোন হাতুড়ে ডাক্তারকে যদি মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে এসে রোগী দেখতে ছেড়ে দেওয়া হয়-তবে তার যেমন তথৈবচ অবস্থা হবে,চিরন্তনীর মতো অদক্ষ লেখিকা যত বেশি করে ‘জাতি’তে লিখবে,অন্যদের লেখার পাশে ওর লেখার খামতিগুলো ততই ধরা পড়ছে। একেবারে পর্ণো বই লেখে মেয়েটা। লজ্জাশরমের বালাই নেই। এই উপন্যাসটাতেই তো নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে বেআব্রু করে দিচ্ছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রের মূল কাজই হল যার তার শুয়ে বেড়ানো। এবং এই শোয়ার পিছনে কোন লজিকও নেই। অদ্ভুত লাগে এসব পড়লে। টিনএজাররা বটতলার বই এর উপাদান যদি নামী ম্যাগাজিনেই পেয়ে যায়,তবে ছাড়বে কেন? হামলে পড়ছে। ‘জাতি’র কাটতি বাড়ছে হুড়মুড় করে। আর সেই দেখেই আঙ্কল চান ওর সাথে প্রতিযোগিতা করে গৈরিকা নিজের জীবনকাহিনী লিখুক। কোনদিন লিখবে না গৈরিকা। কক্ষনো লিখবে না। ইন্দ্রনীলকে যুক্তি দিয়ে বোঝাবে। ও নিশ্চয় মানবে। মানবে তো...নাকি...আঙ্কল কি চান আসলে? নীল আর গৈরিকার এই ইস্যুতে একটা বড়সড় ঝগড়া হোক আর ওরা আলাদা হয়ে যাক-আর সেই ফাঁকা জায়গায় চিরন্তনী বসুক? উচ্ছ্বাসের একনম্বর লেখিকা চিরন্তনী হোক এটাই কি আঙ্কলের সুপ্ত ইচ্ছা? হতেও পারে,মানুষটা যেমন যাকে তাকে আকাশে তুলতে পারেন, তেমনি ধপ করে ফেলে দিতেও একমুহূর্ত ভাবেন না। ওনার কথার অমান্য করলে যে কাউকে জাস্ট সরিয়ে দেন। গৈরিকাকেও কি অবাধ্যতার শাস্তি হিসাবে সরিয়ে দেবেন? চিন্তাটা মাথায় ঢুকতেই যেন ভয় করল গৈরিকার। শীর্ষে ওঠা কঠিন,তার থেকে বেশি সেখানে টিকে থাকা। টিকে তো থাকতেই হবে। সে যে করেই হোক। তা বলে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে বিক্রি করা যায়? গৈরিকা জানে,সেটা কখনোই যায় না। অন্য কোন উপায় বার করতে হবে ওকে। অন্য যে কোন উপায়।




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.