বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭

মৌ দাশগুপ্ত

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ | |
শাকান্নকথা
আশ্বিনমানেই উৎসবের মাস।হিমালয়নন্দিনী উমা কন্যারূপে বৎসরান্তে পিতৃগৃহে আসেন। তাই জগজ্জননীর মাতৃ আরাধনায় মিশে যায় বাৎসল্যরসের ফল্গুপ্রবাহ। এ উৎসর তাই পেটপুজোর উৎসবও। দুর্গাপুজোয় তো অঞ্চলভেদে ভিন্নরকমের খাওয়াদাওয়ার নিয়ম থাকে, চলে কালীপজো অবধি। যেমন, আমাদের ছোটবেলায় বাড়ীতে কালীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ ভূতচতু্র্দশীতে, ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে এদিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে খেতে হত ১৪ রকম শাকভাজা। দিদা বলতেন, চৌদ্দশাক খেলে নাকি কার্তিকের টান থেকে রেহাই পাওয়া যায়, কারণ এই মাসে যমের বাড়ির ৮টি দরজা খোলা থাকে।শাক বা পাতা সবজি হল এক ধরনের উদ্ভিদ যার পাতা সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। পাতা ছাড়াও মাঝেমধ্যে পাতাবৃন্ত ও কচি কাণ্ড এর অন্তভুর্ক্ত। আয়ুর্বেদশাস্ত্র শুধু বলা আছে যে, “অতিজীৰ্ণমকালোখং রূক্ষং স্নিগ্ধমভূমিজং। শুষ্কং। শাকঞ্চ সকলং নাশ্মীয়া মূলকৈবিনা “।।

(অতিশয় জীৰ্ণ, অকালসমূৎপন্ন, রুক্ষ, স্নিগ্ধ, দূষিতভূমিজাত ও শুষ্ক, এই সকলপ্রকার শাক ভোজন করিবে না। কেবল মুলো শাক অতিজীর্ণাদি হইলেও খাইতে পারা যায়।) যাইহোক বলছিলাম চোদ্দশাকের কথা। একেক জায়গায় একেকরকম ভাবে এই চোদ্দশাক রান্না করা হয়। কোথাও কালজিরে-কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, কোথাও রসুন-শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, আবার কোথাও শুধু পাঁচফোড়ন দিয়েও চোদ্দশাক ভাজা খাওয়া হয়।অনেকক্ষেত্রে আলু বা বেগুন দিয়েও এই শাক ভেজে খাওয়ার প্রচলন আছে।প্রাচীনকাল থেকেই শাক কিন্তু মানুষের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। পৃথিবীর অন্যপ্রান্তের কথা না হয় বাদই দিলাম, প্রাকৃত ভাষায় বাংলার অন্যতম প্রাচীন রচনা ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’-এও কিন্তু শাকের উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে -

ওগগর ভত্তা রম্ভঅ পত্তা গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সংযুক্তা।
মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা খা পুণবন্তা।


অর্থাৎ কোনও স্ত্রীলোকের পরিবেশন করা কলাপাতায় গাওয়া ঘি দিয়ে গরম ভাত সাথে দুধ, মৌরলা মাছ আর নলচে শাক যিনি খান তিনি পুণ্যবান। নীহাররঞ্জন রায়ের লেখা “বাঙালীর ইতিহাস” গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে প্রাচীনকালে গ্রামের গরিব বাঙালির অন্যতম প্রধান খাবার ছিল শাক-সব্জি। ষোড়শ শতকের চৈতন্যকাব্যগুলিতেও বাঙালির খাবার হিসেবে শাকের উল্লেখ রয়েছে। শ্রীচৈতন্যদেব নিজেই নানা ধরণের শাক পছন্দ করতেন। 

মার্কণ্ডেয় পুরাণে আছে,  
ততোংহমথিলং লোকমাত্মদেহসমূদ্ভবৈ:
ভবিন্যামি স্বরা; শাকৈরাবৃষ্টৈ প্রাণধারকৈঃ।।
শানন্তরীতি বিখ্যাতিং তদা যাস্যাম্যহং ভুবি। ইত্যাদি।

অর্থাৎ, “অনন্তর বর্ষাকালে নিজদেহ সমুদ্ভুত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সারা জগতের পুষ্টি সরবরাহ করবো। তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো।“

শস্যদায়িনী দেবী শাকম্বরী অর্থাৎ দুর্গার আরাধনার পরেই আসে কালীপুজো। তাই দেবী দুর্গার সাথে যেমন নবপত্রিকার গাঁটছড়া বেঁধে দেওয়া হয়েছে তেমনই কালীমায়ের সাথে হয়ত চোদ্দো শাকের গাঁটছড়া বাঁধা হয়েছে। 

শাকনিরূপণ য। সর্বশাকেষু জীবন্তী শ্ৰেষ্ঠ নিন্দ্যন্ত সার্ষিপাম । 
শাকং চতুৰ্দ্ধ। তৎ পুষ্প-চ্ছদ-কান্দ-ফলৈঃ স্মৃতম্ ॥ 
পত্ৰং পুষ্পং ফলং নালং কন্দং ভূস্বেদজং তথা । 
শাকং ষাঁড়াধমুদ্দিষ্টং গুরু বিদ্যাদি যথোত্তর ম্। 
প্ৰায়ঃ সর্বাণি শাকানি বিষ্টন্তীন গুরূণি চ । 
রূক্ষাণি বহুবর্চাংসি সৃষ্টিবিশ্মারুতানি চ | 

সর্বপ্রকার শাকের মধ্যে জীবন্তীশাকই শ্রেষ্ঠ এবং সর্ষপশাক অপকৃষ্ট । পুষ্প, পত্র, কন্দ ও ফল ভেদে শাক চারিপ্রকার । (মতান্তরে পত্র, পুষ্প, ফল, নাল বা ডাঁটি মোট চার প্ৰকার ।) তন্মধ্যে “পত্ৰ-শাকাপেক্ষা পুস্পশাক গুরু, পুস্পাপেক্ষ ফলশাক গুরু, ফলাপেক্ষা নালশাক গুরু, নালাপেক্ষা কন্দশাক গুরু, কন্দাপেক্ষা ভূম্বেদজশাক গুরুপাক ৷”৷ কিন্তু শাক কেন? শাকই হচ্ছে এমন সহকারী খাদ্য যা ঋতুভেদেও সাধারণত বিষ্টন্তজনক, গুরু পাক, রুক্ষ, বহুমলজনক, এবং মলপ্ৰবৰ্ত্তক ও বায়ুজনক ।পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়েছি ভেষজবিজ্ঞানীদের মতে ঋতু পরিবর্তনের সময়ে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসাবে এই শাকগুলি খাওয়া হত। শরীর ভালো রাখতে সবুজ তরি-তরকারি, শাক-সব্জীর এর বিকল্প যে কিছু হতে পারে না, তা তো সকলেই জানেন৷ বিশেষত আয়ুর্বেদ এবং কবিরাজি শাস্ত্রে এই শাকগুলির গুণ অসীম। শরৎ থেকে শীত ঋতুতে পদার্পণের সময় ঋতু পরিবর্তনজনিত নানা রোগ হয়।ঠান্ডার আমেজ এসে যায় এই সময়। মরসুম বদলের সময় প্রধানত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতেই ১৪টি শাক খাওয়া দরকার। বাংলার ঋতু প্রকোপ অন্য প্রদেশের থেকে বেশি হওয়ার জন্য আশ্বিন ও কার্ত্তিক মাস দুটিকে যমদংস্টা কাল বলা হত। তখনকার দিনে বাংলার নব্য-স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন (১৬ শতাব্দী) তাঁর অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” এই সময়কাল উল্লেখ করেছেন “নিৰ্ণয়া-মৃতের” (একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থ) অভিমত অনুসরণ করে-

"ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"

অর্থাৎ চোদ্দো শাক হল ওল, কেঁউ, বেথো, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তি, শালিঞ্চা, হিংচে, পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি। এই সব শাক শুভদিনে যে মানুষ খায় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির ভূত চতুর্দশীতে তার কাছে প্রেত ঘেঁষতে পারে না। এখানে প্রেত বলতে যদি রোগজীবানুদের বোঝানো হয় তবে তা যথার্থই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ভূত আর জীবানু উভয়কেই তো চোখে দেখা যায় না! 

নরেন্দ্রপুরের রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের ভেষজ বিজ্ঞানী ছন্দা মণ্ডল বলেন, “আয়ুর্বেদ অনুযায়ীই এই শাক খাওয়ার রীতি চালু হয়েছিল বলে মনে হয়। বর্ষার শেষে শাক খেতে হয়। তার উপরে ঋতু পরিবর্তনের সময়ে নানা ধরনের রোগ হয়। তা নিরাময়ের জন্যও এই শাক খাওয়ার রীতি ছিল।” তাঁর কথায়, “বেশিরভাগ শাকই প্রধানত তেতো। ফলে মুখ ও পাকস্থলীতে প্রচুর লালা ও উৎসেচক ক্ষরণ হয়। যা রোগ নিরাময়ে খুবই উপকারী।”

ছন্দাদেবী বলেন, “এই ১৪ শাকের মধ্যে পরিচিত পুঁই, নটে বা লাউ শাক নেই।” তা হলে এই শাকগুলি কী কী? ছন্দাদেবী জানান, ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সর্ষে, সালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেটু বা ভাট, হিঞ্চে, সুষনী, শুলফা। এই সব ক’টি শাকই নানা রোগ নিরাময়ে ও প্রতিরোধে কাজে লাগে। যদিও অনেকের মতে আয়ুর্বেদ মতে প্রাচীন বাংলায় চোদ্দো শাকগুলি ছিল পালং শাক, লাল শাক, সুষণি শাক, পাট শাক, ধনে শাক, পুঁই শাক, কুমড়ো শাক, গিমে শাক, মূলো শাক, কলমি শাক, সরষে শাক, নোটে শাক, মেথি শাক, লাউ শাক অথবা হিঞ্চে শাক।

১. কেও প্রচলিত নাম ও বৈজ্ঞানিক নাম Costus speciosus. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা।
( সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়,কৃমিনাশক, হজমকারক, ক্ষুধাবর্ধক)

২. বেতো শাক– বাস্তুক, শাকপত্র, শাকবীর, প্ৰসাদক, এইকয়টি বাস্তুকের ( বেতোশাকের ) সংস্কৃত নাম । * , বাসভূমির আশেপাশে জন্মায় বলে এই বেতো শাকের আরেক নাম বাস্তক। এর গাছ হয় ছোট, গাছের পাতা অনেকটা তুলসী পাতার মতো, কিন্তু পাতাগুলোর ধার বেশ ঢেউ খেলানো। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Chenopodium album. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা এবং কচি ডগা।

“বাস্তুকঃ শাকপত্ৰঃ স্যাৎ শাকবীরঃ প্ৰসাদকঃ । বাস্তুকঃ পাচিনো রুচ্যো লঘুঃ শুক্রবলপ্ৰদঃ। সরঃ প্লীহাস্ৰপিত্তার্শ:কৃমি,দোষত্ৰয়াপহঃ ।“
(গুণ -বাস্তুক রুচিকর, লঘুপাক, শুক্র ও বলবৰ্দ্ধক, সারক, প্লীহা, রক্তপিত্ত, অৰ্শ, ক্ৰিমি ও ত্রিদোষনাশক । সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, কৃমিনাশক, কোষ্ঠবদ্ধতা ও অম্বল প্রতিরোধক) 

৩. কালকাসুন্দা --কাসমর্দি ও কর্কশ এই দু’টি কালকাসিন্দার দু’টি ভিন্ন প্রজাতি।প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Senna sophera. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা, কচি শুঁটি।এর পাতা সবুজ, এক একটা লম্বা বোটায় ৫-৬ জোড়া পাতা, চটকালে কটুগন্ধ বের হয়। 
“কাসমৰ্দি-গৃঞ্জাননামগুণাঃ। ক সমর্দঃ কর্কশঃ স্যাদ গৃঞ্জনে গর্জারস্তথা । কাসমর্দে। লঘুঃ কণ্ঠ্যঃ কাসিদোষবিষাম্রজিৎ ৷ গৃঞ্জনঃ কটুকিস্ত ক্ষুস্তিক্তোষ্ণো দীপনো লঘুঃ। সংগ্ৰাহী রক্তপিত্তার্শে গ্ৰহণী কফ বাতজিৎ “

( গুণ -কাসমর্দি লঘুপাক, কণ্ঠশোধক, কাসনাশক, ত্রিদোষ,রক্তশোধক লঘু বিষহরক। সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, অ্যান্টি-অ্যালার্জিক, কোষ্ঠবদ্ধতা, অর্শ, ফিসচুলা, হুপিং কাশি, দাদ ইত্যাদির চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়) 


৪. নিমপাতা - নিম্ব, নিয়মন, নেতা, আরিষ্ট, পারিভদ্রক, সুতিক্ত, সৰ্ব্বতোভদ্ৰ, পিচুমন্দ, প্ৰভদ্রক, ( কুণ্ঠহ, পিচুমাৰ্দ, কীবেষ্ট ও যবনেষ্টক) এইগুলি নিমের বিভিন্ন প্রজাতির সংস্কৃত নাম।প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Azadirachta indica. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ কচি লালচে পাতা ও নরম ডগা।

“নিম্বঃ শীতো লঘুগ্রহী কটুপাকোহগ্নিবাতকৃৎ । ব্ৰণপিত্তকফাচ্ছর্দিকুণ্ঠহাল্লাসমেহনুৎ ॥ নিম্বপত্ৰং স্মৃতং নেত্ৰ্যং কৃমিপিত্তবিষ প্ৰণুৎ । বাতিলং কটুপাকঞ্চ সর্বারোচককুণ্ঠনুৎ ॥“ 

( গুণ- নিম্ব শীতবীৰ্য্য, লঘুপাক, মলসংগ্রাহক, পাকে কটু, অগ্নিকারক ও বায়ুজনক । এটি পিত্ত, কফি, বমন, কুণ্ঠ, হাল্লাস ( গা বমি-বমি করা ) ও মেহ নাশ করে । নিশ্বপত্র-নেত্রের জ্যোতির্বিদ্ধক, বায়ুজনক, কটুবিপাক এবং সর্বপ্রকার অরুচি, কুষ্ঠ, কৃমি, পিত্ত ও বিষনাশক । )


৫. সর্ষেশাক প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Brassica campestris. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ নরম পাতা ও পাতাসহ কচি কান্ড।
সার্ষিপপত্র কৌসুস্তনামগুণাঃ। সার্ষিপং সর্ষপোদ্ভুতং কৌস্তম্ভঞ্চ কুসুম্ভজং । সার্ষিপং বদ্ধবিগ্নত্ৰং গুরূষণ্ডং চ ত্ৰিদোষকৃৎ । 
(গুণ -সরিষাশাক মলমূত্ৰবন্ধকারক, গুরুপাক, উষ্ণবীৰ্য্য, ত্রিদোষনাশক। সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, মানব দেহের চামড়া, যকৃত এবং চোখের পক্ষে এই শাক অত্যন্ত উপকারি। সরষেশাকে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন ,এটি রক্তে কোলস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে আনে।) 

৬. সালিঞ্চা- সিতিবার, কুবুন্টী , নাড়ীক (অর্থাৎ নালিতা শাক) ইত্যাদি সালিঞ্চা(শালিঞ্চা বা শাঞ্চে) শাকের বিভিন্ন প্রজাতির সংস্কৃত নাম। অনেকে এই শাককে সাঁচিশাকও বলে। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Alternanthera sessilis. . এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা এবং কচি ডগা।এতে আছে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোস্পেরল।

“সিতিবারঃ কুরন্টী স্যান্নাড়ীকং নালিকা মতা । সিতিবারঃ সরো বৃষ্যঃ শোথয়ো বাতপিত্তালঃ । নাড়ী সারা লঘুঃ শীতা পিত্তনুৎ কফবাতলা “
(গুণ -সিতিবার সারক, বলবৰ্দ্ধক, শৌথনাশক, বায়ুপিত্তজনক । নাড়ীক শাক সারক, লঘু, শীতৰী’ৰ্য, পিত্তনাশক, কফ ও বায়ুনাশক ।সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, সাধারণতঃ ক্ষুধাবর্ধক হিসাবে পরিচিত; এদের ব্যবহারে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ) 


৭. জয়ন্তী, জয়াং - শাকবীর, রক্তনাল জীবন্তক ও প্ৰণালীক এই কয়টা জয়ন্তীর প্রজাতিবিশষ। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Sesbania sesban. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ কচি পাতা।

“শাকবীরে রক্তনালঃ প্ৰণালকঃ । জয়াং জীবন্তক বলকৃৎ ক্ষারঃ স্বাদুপাকস্ত্রিদোষনুৎ ॥“ 
( গুণ।–জয়ন্তী বা জীবন্তক শাক বলবৰ্দ্ধক, ক্ষারগুণবিশিষ্ট, পরিপাকে স্বাদুরস । সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, উদরাময়, বহুমূত্র, শ্বেতী , জ্বর এবং কৃমি নাশকের কাজ করে; সদ্য প্রসূতিদের জন্য এই শাক উপকারী)


৮. গুলঞ্চ - গুড়চী, কুণ্ডলী, ছিন্না, বয়স্থ, অমৃতবল্লারী, ছিন্নোদ্ভবা, ছিন্নরূহ, অমৃতা, জ্বরবিনাশিনী, বৎসাদিনী, চন্দ্ৰহাসা, জীবন্তী ও চক্রলক্ষণা এই কয়টা গুড়চীর (গুলঞ্চের ) নাম । প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Tinospora cordifolia. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা ও কোরক।

“গুডু চী। কুণ্ডলী ছিন্ন বয়স্থ মৃত্যুবল্লরী। ছিদ্মোস্তুবা ছিন্নরুহামৃত জ্বরবিনাশিনী ৷ ‘ৎসাদিনী চন্দ্ৰহাস জীবন্তী চক্রলক্ষণ । গুড়াচী কটুকা লক্ষ্মী স্বাদুপাকা রসায়নী । সংগ্ৰাহিণী কষায়েষঃ| বল্য তিক্তাগ্নিদীপনী । কামলুকুণ্ঠবাতাম্রাজুরপিত্তাকৃমীন জয়েৎ ৷ স্বপ্নতেন বাতং সগুড়া বিবন্ধং পিত্তং সিতাঢ্য মধুনা কফিঞ্চ । বাতাম্রমুগ্ৰং রুবৃতৈলমিশ্র শুণ্ঠ্যামবাতং শময়েদ গুড়চী ।“

( গুণ। গুডুচী-কটুতিক্ত, কষায় রস, লঘুপাক, পাকে স্বাদু, রসায়নগুণযুক্ত, ধারক, উষ্ণবীৰ্য্য, বলকর ও অগ্নিদীপক। গুলঞ্চপাতার রস সেবনে কামল, কুষ্ঠ, বাতিরক্ত, জ্বর, পিত্তদোষজনিত বিকৃতি ও কৃমিরোগ নষ্ট হয় । ।)

৯. পটুক পত্র বা পলতা - আয়ুর্বেদিক মতে পটলের লতাকে পলতাপাতা বলে ।একপ্রকার পটোল আছে, যা তিক্ত । তিক্তা, উত্তম, বীজগর্ভা, রাজপাটালিকা, জোৎস্না, পটোলিকা, জালী, নাদেয়া, ভূমিজম্বুকা এইকয়টি তিক্ত পটোলের পর্য্যায়। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Trichosanthes dioica. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতাও আকর্ষরহিত ডগা।

“তিত্তেজ্ঞাত্তম বীজগর্ভগৃহ পর রাজপটোলিকা । জ্যোৎস্না পটোলিকা জালী নাদেয়া ভূমিজম্বুক ॥ পটোলং পাচনং হৃদ্যং বৃষ্যং লঘগ্নিদীপনং। সুবিগ্ধে ষষ্ণং হন্তি কাসাস্ৰজ্বরদোষত্ৰয়কৃর্মীন। পত্ৰং পিত্তহরং শীতং বল্লী তস্য কফপহা ।“

(গুণ। এর পাতা পিত্তনাশক, কফনাশক… শীতবীৰ্য্য।সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, এই শাক যে কোন শ্বাসের রোগে কার্যকরী। এরা রক্তবর্ধক এবং লিভার ও চামড়ার রোগ সরাতে এদের প্রভূতভাবে ব্যবহার করা হয়।)


১০. ঘেটু বা ভাঁট – প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum infortunatum. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা। প্রায় শাখাহীন গাছ। বড়ো বড়োডিম্বাকার পাতা। 

“ভণ্টাকীং বৃহদলা রক্ত চিল্লিকা গৌরবাস্তুকঃ । ] ভণ্টাকীং সারা লঘুঃ শীত রুচ্য মেধ্যাগ্নিদীপনী । বল্য রূক্ষ হরেৎ প্লীহরক্তদোষত্ৰয়কৃমীন ৷”
(গুণ। ঘেটু বা ভাটুশাক সারক, লঘুপাক, শীতবীৰ্য্য, রুচিকর, মেধাবৰ্দ্ধক, অগ্নিদীপক,বলকর, রুক্ষ । এটি প্লীহা, রক্তবিকৃতি, ক্রিমি ও ত্ৰিদোষ নাশক । সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, ফ্ল্যাভোনয়েড থাকার জন্য এটি ক্যানসার দমনে সহায়ক।  )

১১. হিঞ্চে – হিলমোচিকা, মৎস্যাক্ষী, বালিকা, মৎস্যগন্ধা ও মৎস্তাদিনী; এইগুলি মৎস্তাক্ষীর ( হেলঞ্চ শাকের ) সংস্কৃত নাম প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Enhydra fluctuans. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা এবং কচি ডগা।কান্ড ফাঁপা। পাতা লম্বা,জলজপত্র ও কিনারা খাঁজবিশিষ্ট। 

“মৎস্যাক্ষী বালিকা মৎস্যগন্ধা মৎস্যাদিনী তথা । মৎস্যাক্ষী গ্ৰাহিণী শীতা কুণ্ঠপিত্তকফাস্ৰজিৎ । লঘুস্তিক্ত কষায় চ স্বান্ধী কটুবিপাকিনী ৷”
(-মৎস্যাক্ষী মলগ্রাহক, শীতল। ইহা কুষ্ঠ, পিত্ত, কফি ও রক্তদোষনাশক। সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়,এই শাকে ফাইটোস্টেরল সহ বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থ থাকে। হিঞ্চে খেলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে। শুধুমাত্র পিত্তনাশক হিসাবেই নয়, রক্তশোধক হিসাবে, ক্ষুধাবর্ধক এবং জ্বর নির্মূলকারী হিসাবে এর ব্যবহার অপরিসীম)


১২. সুষনী- সুনিষন্ন, স্বস্তিক এইকয়টা সুনিষশ্নের অর্থাৎ সুষণীশাকের পৰ্য্যায়। আর এক প্রকার সুনিষন্ন আছে, যার পাতা দেখতে অনেকটা তিলপত্রের মত বলে তাকে তিলপণীও বলে। তিলপণী ও বলদ, এর দুটি ভিন্ন প্রজাতি।প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Marsilea quadrifolia. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা।শুষনি হল জলজ ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ। পাতা যৌগিক প্রকৃতির। পত্রবৃন্তের আগায় একটা বিন্দু থেকে চারদিকে চারটি সম আকৃতির পত্রক জন্মায়। এ জন্যই বিজ্ঞানসম্মত নামে ‘quadrifolia’ শব্দটি রয়েছে। 

“ সুনিষঃ স্বস্তিকঃ স্তাদ বলদা তিলপাণিক । সুনিষন্নো হিমো গ্ৰাহী মেহদোষত্ৰয়াপহা৷ ৷ তিলপণী হিমা রুচ্য গ্ৰাহিণী কফপিত্তজিৎ ৷”
(গুণ। সুনিষগ্ন অর্থাৎ সুষুণীশাক শীতবীৰ্য্য, মলসংগ্ৰাহক, মেহ ও ত্ৰিদোষনাশক । তিলপণী শীতবীৰ্য্য, রুচিকর, মলগ্ৰাহী, কফপিত্তনাশক ।  এটি নিদ্রাকারক, মেধা এবং স্মৃতিবর্ধক। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক অস্থিরতা কমানোর জন্য এই শাক ব্যবহৃত হয়। )

১৩. শুলফা। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Cordia dichotoma. এই সুগন্ধি শাকের ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ পাতা ।বীরুৎজাতীয় এই উদ্ভিদের পাতা বহু খন্ডে খন্ডিত, মৌরি পাতার মতো। 

“শুলফাস্ত তদন্যবাস্তু সারা রূক্ষাঃ কষায়াঃ কটুপাকিনঃ। বাতপিত্তকরা উষ্ণ বদ্ধমূত্ৰাঃ কফপহাঃ ।“

(গুণ। গুরুপাক, ভেদক, শ্লেষ্মল, বাতপিত্তন্ত্র । কষায়, পাক-কটু, বায়ুপিত্তজনক, উষ্ণবীৰ্য্য, মূত্রবদ্ধকারক ও কফনাশক । সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, এদের ব্যবহারে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে। টাবপিনয়েড নামক রাসায়নিক উপাদান আছে বলে মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়াতে এবং ছোটদের পেটের রোগ সারাতে এই শাক অত্যন্ত উপকারি।)


১৪. ওল- শূৱণ, কন্দল, কন্দ, গুদাময়হর এইকয়টি ওলের সংস্কৃত নাম। এটি অর্শ্বরোগ সারায় বলে সংস্কৃত ভাষায় ওলকে অর্শ্বঘ্নও বলা হয়। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Amorphophallus campanulatus. এর ভোজ্য অংশটুকু হল মুখ্যতঃ কচিপাতা এবং ডগা।প্রতিটি ওলকন্দে পাতা হয় একটাই। পাতার বৃন্ত বেশ মোটা হয় ও মাটি ভেদ করে ওঠে বলে কান্ড বলে ভ্রম হয়। একটাই মাত্র পত্রফলক হয় বৃন্তের আগায়। 
“শূরণপত্র অৰ্শসাং তু বিশেষেণ হিতং কামাগ্নিদীপনাম। তদ্বদ্বন্যে বজকন্দঃ কফক্সঃ পিত্তরক্তকৃৎ ॥“ 

(গুণ: শূরণপত্র অগ্নিদীপক, রুক্ষ, কষায়, কণ্ডুকারি, কটু, মলস্তম্ভকারক, বিশদ অর্থাৎ কোষ্ঠ পরিষ্কারক, রুচিকর, লঘু কফ ও অর্শ: রোগ নাশক । সাধারণভাবে চলতিভাষায় বলা যায়, অর্শ, রক্ত আমাশা, বাত, চর্মরোগ, গ্যাস-অম্বল নাশক। ওলে রয়েছে বেটুমিলিক অ্যাসিড এবং স্টেরলিক যৌগ) ।


১৫. পালং শাক- পালমশাক । পালক্যা, বাস্তুকাকারা, ক্ষুরিকা ও চারিতচ্ছদা এইগুলি পালক্যা অর্থাৎ পালমশাকের নাম।
“পালক্যা বাস্তুকাকার ক্ষুরিকা চীরিতচ্ছদ । পালক্যা বাতাল্যা শিতা ভেদিী শ্লেষ্মালী গুরু। বিষ্টম্ভিনী মাদশ্বাস রক্তপিত্তবিষাপহা।।“ 

- পালমশাক বায়ুজনক, শীতবীৰ্য, ভেদকারক, কফপ্রদ, গুরুপাক, মলস্তম্ভকারক, মত্ততা, শ্বাস, রক্তপিত্ত ও বিষদোষ নাশক।  জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য এই শাক বিশেষ উপকারী। পোড়াঘায়ে, ক্ষতস্থানে, ব্রণে বা কোথাও ব্যথায় কালচে হয়ে গেলে টাটকা পালং পাতার রসের প্রলেপ লাগালে উপকার পাওয়া যায়। পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি, ই এবং আয়রন। এজন্য পালং শাক খেলে রক্তে আয়রনের মাত্রা বেড়ে যায়।


১৬. লাল শাক, লোহিতশাক-লোহিতশাক, কালিকা, এইকয়টা লালশাকের পর্য্যায়। আর এক প্ৰকার লালশাক আছে, চুম্বুকা ও চঞ্চুক এই দুইটী তাহার পর্য্যায়। “লোহিতশাকং কালিকা স্যাৎ চুধুক চন্ধু কাইপারঃ । লোহিতশাকং সরং রুচিং বাতিলং কফশোথজিৎ ॥ চঞ্চুঃ শীতা সারা রূক্ষা স্বাদ্বী দোষত্ৰয়াপহা৷”

গুণ -লোহিতশাক সারক, রুচিকর, বায়ুবৰ্দ্ধক, কফি ও শোখনাশক ।) চলতি ভাষায় বললে লালশাক ভিটামিন ‘এ’-তে ভরপুর। লালশাক নিয়মিত খেলে দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকে এবং অন্ধত্ব ও রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করা যায়। এটি শরীরের ওজন হ্রাস করে।কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

১৭. কুলেখাড়া শাক - ইক্ষুর, কোকিলাক্ষ, কাণ্ডেক্ষু, ক্ষুরাক, ক্ষুর, বীজকণ্টক, ভিক্ষু, ঈক্ষুগন্ধা ও ইক্ষুবালিকা এইগুলি কুলেখাড়ার সংস্কৃত নাম। ইক্ষুরনামগুণাঃ। ইক্ষুরঃ কোকিলাক্ষস্তু কাণ্ডেক্ষুঃ ক্ষুরকঃ ক্ষুরঃ । বীজকণ্টস্তথা ভিক্ষুশ্চেক্ষুগন্ধেক্ষুবালিকা ৷ ইক্ষুরঃ শীতলে বৃষ্যে গুরু বাতকফাস্ৰজিৎ ৷ স্বাদ্বয়পিত্তলস্তিক্তঃ শোেথতৃষ্ণাশ্মদৃষ্টিজিৎ । কোলিকাক্ষ ।

(গুণ। কুলেখাড়া শীতবীৰ্য্য, ধাতু পুষ্টিকারক, গুরু, ঈষদ তিক্ত-অম্লরসাক্ত, বায়ু কফ রক্তদোষ শ্লোথ পাথুরিনাশক। 

১৮. ধনে শাক -  ধন্যাক, ধান্যক, ধান্য, ধানেয়, বিতুল্লক, কুনাটী, ধোনিকা এইগুলি ধনিয়ার সংস্কৃত নাম। “ধন্যাকং ধান্যকং ধান্যং ধানেয়ঞ্চ বিতুন্নকম। কুনটী ধোনিক চাদ্ৰা কুস্তুঙ্গুরু ধনীয়কম্। ধন্যাকং তুব্বরং স্নিগ্ধমবৃষ্যং মূত্ৰলং লঘু। হৃদ্যং রুক্ষ্যং বদ্ধবিটকং স্বাদুপাৰুং ত্ৰিদোষনুৎ । পাচনং শ্বাসকাসাস্ৰাতৃষ্ণাদ্দাহকৃমীিন হরেৎ ৷ আর্দিন্ত তদগুণং স্বাদু বিশেষাৎপিত্তনাশনম্।“

গুণ-ধনিয়া কষায় রস, স্নিগ্ধ, অবৃষ্য, মূত্ৰকারক, লঘুপাক, হৃদয়গ্ৰাহি, মলবদ্ধকারক, পাকে স্বাদুরস, পাচক, ইহা ত্রিদোষ, শ্বাস, কাস, রক্তদোষ, তৃষ্ণা, দাহ ও কৃমিনাশক । এছাড়া ধনেপাতার ভিটামিন এ চোখের পুষ্টি জোগায়, রাতকানা রোগ দূর করতে ভূমিকা রাখে। কোলেস্টেরলমুক্ত ধনেপাতা এলডিএল কমিয়ে এইচডিএল এর মাত্রা বৃদ্ধি করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকায় ধনেপাতা শীতকালীন ঠোঁটফাটা, ঠান্ডা লেগে যাওয়া, দূর করে।

১৯. পুঁই শাক - পোতকী, উপোদিক, মৎস্তকালী, সুরঙ্গিক এই কয়টা পুতিকারী পৰ্যায়। “পোতকু্যাপোদিকা সাতু মৎস্যকালী সুরঙ্গিক। পোতকী শীতলা স্নিগ্ধ শ্লেষ্মলা বাতপিত্তজিৎ । অকণ্ঠ্যা পিচ্ছিলা নিদ্রা শুক্রাদা রক্তপিত্তনুৎ । বলদা রুচিকৃৎ পথ্যা বৃংহণী তৃপ্তিকারিণী ॥ " 

গুণ -পুতিক শীতবীৰ্য্য, স্নিগ্ধগুণযুক্ত, শ্লেষ্মজনক, বায়ু ও পিত্তনাশক, কণ্ঠস্বরের বিকৃতিকারক, পিচ্ছিল, নিদ্রা ও শুক্ৰবৰ্দ্ধক, রক্তপিত্তরোগনাশক, বলপ্ৰদ, রুচিকর, পথ্য, বল-বীৰ্য্যবৰ্দ্ধক ও তৃপ্তিকর ।  পুঁইপাতা থেঁতো করে ব্রণের ওপর প্রলেপ দিলে ব্রণ নিরাময়ের ক্ষেত্রে চমৎকার ফল পাওয়া যায়।

২০. কুমড়ো শাক, কুষ্মাণ্ডকী, পুষ্পফলী, পীতপুষ্পা ও বৃহৎফলা এই কয়টা কুষ্মাণ্ডের নাম।

“কুষ্মাণ্ডং বৃংহণং শীতং গুরু পিত্তাত্ৰবাতজিৎ । বালিং পিত্তাপহং শীতং মধ্যমং কাফকার কম। পকং নাতিহিমং স্বাদু সক্ষরং দীপনং লঘু। বস্তি শুদ্ধিকরং চোতোরোগদোষত্ৰয়াপহম্ ।। কুষ্মাণ্ডী নীতিমধুরা বাতাশ্মরিকফাপহা।। তন্মজ্জা পিত্তনুদ বৃষ্যে।“
(গুণ - কুষ্মাণ্ড বৃংহণ, শীতবীৰ্য্য, গুরুপাক, রক্তপিত্ত ও বায়ুনাশক )।)

২১. গিমে শাক, “”পৌষ্করাহ্নবংপুঙ্করাহ্নবয়ম্। হান্তি শোফারুচিশ্বাসান বিশেষাৎ পার্শ্বশুলজিৎ ॥“ 

-পৌষ্করাহ্নব, গিমেশাকের নাম। * গুণ -পুস্কারমূল কটু, তিক্ত ও উষ্ণবীৰ্য্য। ইহা বায়ু, কফ, জার, শোথ, অরুচি, শ্বাস ও বিশেষতঃ পার্শ্বশূল নাশ করে। এছাড়াও চোখ উঠলে বা চোখ ব্যথা করলে গিমে পাতার সেক ও খাবারের রুচি বাড়াতে সকালে গিমে পাতার রস খুব কার্য্যকর।।

২২. মূলো শাক- মূলক ও হস্তিদন্ত এই দুইটী বড়মূলার এবং কালমূল ও কপৌ তিকা এই দুইটী চাণক্যমুলা বা কচিমূলার প্রকারভেদ। । “মূলকং হস্তিদন্তঞ্চ বালমুলং কপোতিকা । মুলকপত্রাং বাতিলং রুচ্যং স্বৰ্য্যোঞ্চং পাচনং লঘু। হান্তি ত্ৰিদোষজং শ্বাসগদাক্ষিগলপীনসম্।“ 

(গুণ –মূলোশাক রুচিকর, স্বরশোধক, উষ্ণবীৰ্য্য, পাচক, লঘু, ত্রিদোষজ শ্বাসরোগ, অক্ষিপীড়া, গলরোগ ও পীনসরোগনাশক ।)

২৩, কলমি শাক -  এটি এক ধরনের অর্ধ জলজ লতা। কলমি শাকের ডাঁটা সাধারনত ২-৩ মিটার দীর্ঘ হয়ে থাকে। এর পাতা লম্বাটে আকৃতির, রঙ সবুজ আর ফুল ট্রাম্পেট আকৃতির হয়ে থাকে। কলমি শাকের বৈজ্ঞানিক নাম Iposia aquatic. 

“কলমিস্তং তিক্তা কটুপাকা হিমা লঘুঃ । বাতিলা গ্ৰাহিণী শ্লেষ্মরক্তপিত্তবিনাশিনী ৷’

(গুণ -এই শাক তিক্ত, কটুপাক, শীতলীৰ্য্য, লঘু, বা তবদ্ধক, গ্ৰাহি, শ্লেষ্ম ও রক্তপিত্ত নাশক । কলমি শাকে ক্যালসিয়াম থেকে বলে এই শাক হাড় মজবুত করতে সাহায্য করে। এছাড়াও কলমি শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি,পর্যাপ্ত পরিমানে লৌহ, থাকায় এই শাক রক্ত শূন্যতার রোগীদের জন্য দারুন উপকারি।)

২৪. পিড়িংশাক - স্মৃক্কা, স্পর্ক, ব্ৰাহ্মণী, দেবী, নিৰ্ম্মাল্যা, কুটিকা ও বধুঃ এইগুলি পিড়িৎশাকের সংস্কৃত নাম । ” ।— “স্পক্কা নামগুণাঃ। স্পকা স্পর্ক ব্ৰাহ্মণী দেবী নিৰ্মাল্য। কুটিকা বধূঃ।স্বাদুহিম, বৃষ্যা কুষ্ঠালক্ষীত্রিদোষনুৎ ॥“
(গুণ: পিড়িংশাক স্বাদু, শীতবীৰ্য্য, বৃষ্য, কুষ্ঠ,অশ্মরী ও ত্রিদোষনাশক)। 

২৫. নোটে শাক -তণ্ডুলীয়, মেঘনাদ, কাণ্ডীর, তণ্ডুলীধক, এই কয়ী তণ্ডুলীয় অর্থাৎ নটে শাকের পর্য্যায়। আর এক প্রকার তণ্ডুলীয় নটেশাক আছে, বিষন্ন, কন্ধর, মারীষ ও মার্ষিক এই কয়নী তার প্রকারভেদ।“তণ্ডুলীয়ে মেঘনাদঃ কাণ্ডারস্তণ্ডুলীয়কঃ । বিষ্যত্নঃ কািন্ধরোহন্যঃ স্যাৎ মারীষো মাষিকস্তথা ৷ তণ্ডুলীয়ে লঘুঃ শীতো রূক্ষঃ পিত্তকফাস্ৰজিৎ । স্বাদেষ্টমূত্ৰমলে। রুচ্যে। দীপনো রক্তপিত্তাহা । মারীষে রেচনঃ শীতো গুরুৰ্মেদান্ত্রিদোষজিৎ ॥“

(গুণ।-তণ্ডুলীয়শাক লঘুপাক, শীতবীৰ্য, রূক্ষ, মলমূত্ৰজনক, রুচিকর, অগ্নিদীপক, কফ, পিত্ত, রক্তদোষ ও রক্তপিত্তনাশক । মারীষশাক রেচক, শীতবীৰ্য্য, গুরুপাক, মেদোরোগ ও ত্ৰিদোষনাশক ।)

২৬. মেথি শাক - মেথিকা, মেথিনী, মেখী, দীপনী, বহুপত্রিকা, বোধনী, গন্ধবীজ, জ্যোতি, গন্ধফলা, বল্লারী, চন্দ্ৰিকা, মস্থা, মিশ্রীপুষ্প, কৈরবী, কুঞ্চিক, বহুপর্ণা, পীতবীজী, মুনীন্দ্ৰকা, এইগুলি মেখীর সংস্কৃত নাম। Trigonella foenum-graecum. “মেথিকা মেথিনী মেথী দীপনী বহুপত্রিকা ।তিনটি করে পাতা একসাথে জন্মায় ।মেথির স্বাদ তিতা ধরনের। 

“বোধনী গন্ধবীজা চ জ্যোতিগন্ধফলা তথা । বল্লৱী চন্দ্ৰিকা মন্থা মিশ্রীপুষ্প চ কৈবরী। কুঞ্চিকা বহুপণীচ পীতবীজা মুনীন্দ্ৰক ৷ মেথিকা বাতশমনী শ্লেষ্মন্ত্রী জুরিনাশিনী । রুচিপ্ৰদা দীপনী চ রক্তপিত্তপ্রকোপনী ৷ বনমের্থী ভবেৎ শেলুরহিখো বনমেথিকা । ততঃ স্বল্পগুণ বন্যা বাজিনাং স তু পুজিতঃ ।“ 

(গুণ - এতে রয়েছে রক্তের চিনির মাত্রা কমানোর বিস্ময়কর শক্তি।রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা চর্বির মাত্রা কমে যায়।  বার্ধক্যকে দূরে ঠেলে দিয়ে তারুণ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে মেথি।মেথি সীমিত মাত্রায় ডায়াবেটিস (টাইপ ১ ও টাইপ ২) নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। দ্রুত মাতৃদুগ্ধ বৃদ্ধিতেও মেথি কার্যকরী। অ্যান্টি অক্সিডেন্টেরও একটি উর্বর ক্ষেত্র এ শাক)।


২৭. লাউ শাক - মিষ্টতুম্বী, মহাতুৰী, রাজালাবু ও অলাবুনী এই কয়ট লাউয়ের পর্যায় । “ মিষ্টতুম্বীনামগুণাঃ। তুম্বী মিষ্টা মহাতুম্বী রাজালাবুরলাবুনী। মিষ্টং তুম্বীফ লং বৃষ্যং কফপিত্তহরং গুরু।।“
(গুণ -লাউফল বীৰ্য্যবৰ্দ্ধক, কফিপিত্তনাশক ও গুরুপাক )। 

২৮.ব্ৰাহ্মী শাক – (Leucas Cephalotus) ব্ৰাহ্মী, সরস্বতী, সোমা, সত্যাহবা, ব্ৰহ্মচারিণী, এই কয়টা ব্ৰাহ্মীশাকের সংস্কৃত নাম । “ব্ৰাহ্মী মণ্ডুকপণী নামগুণাঃ। ব্ৰাহ্মী সরস্বতী সোমা সত্যাহবা ব্ৰহ্মচারিণী । মণ্ডুকারূপণী মাণ্ডুকী ত্বাঞ্ছী দিব্য মহৌষধী ৷ কপোতবঙ্কা মুনিকা লাবণ্যা সোমবল্লারী । ব্ৰাহ্মী হিমা সারা স্বাদুল ঘুমে ধ্যা রসায়নী ॥ স্বৰ্য্যা স্মৃতিপ্ৰদা কুণ্ঠপাণ্ডু মেহাস্ৰ কাসিজিৎ ॥ বিষশোথজুরহরা তদ্বন্মাণ্ডুকপর্ণ্যপি।“

(গুণ ——ব্রাহ্মী শীতল, সারক, স্বাদু, লালুপাক, মোবৰ্দ্ধক, রসায়ন, স্বরূশুদ্ধিকর, স্মৃতিশক্তিবৰ্দ্ধক । ইeা কুণ্ঠ, পাণ্ডু, মেহ, রক্তদোষ ও কাস, বিষ, শোথ ও জীবনাশক।) 

২৯. গাঁদাল পাতা - প্রসারণী, রাজবলা, চারুপণী, প্রতানিক, সারণী, সারণী, ভদ্রুপর্ণী, সুপ্ৰসরা, সারা এই গুলি গাঁদাল অর্থাৎ গন্ধ ভান্দালের সংস্কৃত নাম । “প্রসারণী রাজবলা চারুপণী প্রতানিকা । সারণী সারণী ভদ্রপণী সুপ্ৰসরা সারা ৷ প্রসারণী গুরুবৃষ্যা সন্ধানবলকৃৎ। সারা । বীৰ্য্যোঞ্চা বাতনুৎ তিক্ত বাতিরক্তকফপহা৷ ৷ ”  

(* "গুণ-গন্ধভাদাল গুরু, বৃষ্য, ভগ্নসন্ধায়ক, বলবৰ্দ্ধক, সারক, উষ্ণবীৰ্য্য, তিক্তরাস । ইহা বায়ুনাশক, বাতরিক্ত ও কফনাশক ।)  


এরপরেও বাকি রয়ে গেল অনেকেই। যেমন পাটশাক, ঢেঁকিশাক,সজিনাশাক,পেঁয়াজশাক, রসুনশাক, পুদিনাপাতা, ইত্যাদি।জীবক কুমারভচ্চকে মনে পড়ে? জীবক কুমারভচ্চ মগধ নরেশ বিম্বিসার ও অজাতশত্রুর সমসাময়িক ছিলেন।তক্ষশিলাতে বিশ্ব বিখ্যাত আয়ুর্বেদ আচার্য সুশ্রুতের কাছে জীবক আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তার শিক্ষা প্রায় সমাপ্ত হলে আচার্য তাকে তক্ষশিলাকে কেন্দ্র করে এক যোজন দূরত্ব থেকে এমন একটি উদ্ভিদ সংগ্রহ করে আনতে বলেন যার মধ্যে কোন ঔষধী গুণ নেই। জীবক সারাদিন বাদে ফিরে এসে আচার্য্যকে জানালেন যে তিনি এমন কোন উদ্ভিদ দেখেননি যার কোন প্রকার ঔষধী গুণ নেই। সাধারণ দূর্বঘাসেও ওষধিগুণ বর্তমান। দুৰ্ব্বা, শম্প, শীতবীৰ্য্যা, গোলোমী, শতপর্বিকা, এইগুলি দুৰ্ব্বার সংস্কৃত নাম। শ্বেত ও নীলভেদে আরও দুইপ্ৰকার দুর্ব আছে। শ্বেতা, শ্বেতকাণ্ডা, ভাগৰী, দুমরা, রুহা, চণ্ডা, ভদ্রা, সিতাখ্যা, সুপৰ্ব্বা, সূরাবল্লভা এইগুলি শুক্লদুৰ্ব্বার এবং অনন্তা, ভার্গবী ও শতপাৰ্ব্বিকা এইগুলি নীলদুৰ্ব্বার সংস্কৃত নাম । 

দূৰ্ব শম্পং শীতবীৰ্য্যা গোলোমী শতপর্বিকা । অন্যা শ্বেতা শ্বেতকাণ্ড ভাগবী দুৰ্ম্মরা রুহ । চণ্ড ভদ্ৰা সিতাখ্যা চ সুপর্ব সুরবল্লভা । নীলান্য চ রুহানন্ত ভাগবী শতপর্বিকা । দূর্ব হিমা বিসর্পভ্রাতৃদ্টপিত্তকফদাহজিৎ ৷ সিতাত্তি শীতলা রুচ্য মধুরা বান্তিপিত্তজিৎ । কাসাতিসারদাহাস্ৰাতৃষ্ণা প্ৰশমনী শুভা । নীলদূর্ব হিমা তিক্তা মধুরা তুব্বর হরেৎ । কফপিত্তাম্রবিসৰ্পতৃষ্ণাদাহত্বগাময়ান 

-দুৰ্ব্বা শীতবীৰ্য্য, বিসৰ্প, রক্তদোষ, তৃষ্ণ,পিত্ত, কফি ও দাহনাশক । শ্বেতদুর্ব অতিশীতল, রুচিকর, মধুর, বমন পিত্ত কাস অতিসার দাহ রক্তদোষ ও তৃষ্ণানাশক । নীলদূর্বা, শীতবীৰ্য, তিক্তমধুরীরস, কষায়, কফপিত্ত, রক্তদোষ, তৃষ্ণা, দাহ ও ত্বগদোষ নাশক ।

শাকের ক্ষেত্রেও এই এক কথাই খাটে।কোন শাকই ফেলনা নয়।


তথ্যসূত্র

1. বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস (৯ নভেম্বর, ২০১৫)। "রোগের দাওয়াই ছিল চোদ্দো শাক"। সংগৃহীত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
2. চক্রবর্তী, ডঃ বরুণকুমার। বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ। কলকাতা: অপর্ণা বুক ডিস্ট্রবিউটার্স (প্রকাশন বিভাগ)। পৃ: ১৬৮। আইএসবিএন 81-86036-13-X।
3. ভট্ট্রাচার্য, আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালি। চিরঞ্জীব বনৌষধি। আনন্দ পাবলিশারস প্রাইভেট। পৃ: ১।
4. R. P. Chanda IAR ch, iv.
5. মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৯২, ৪৩-৪ ।
6. মদনপাল-নিঘন্টু 

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-