বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩১, ২০১৭

সুপ্রিয় গঙ্গোপাধ্যায়

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০১৭ | |
সুকান্তের প্রিয়তমাসু  ঃ  বাতিওয়ালার আত্মকথা
"এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি —
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।"

     ‘ছাড়পত্র’ কবিতার ত্রই দুই চরণের মধ্য দিয়ে কবি সুকান্তের সাথে প্রথম পরিচয়, প্রথম ভালোলাগা, হয়তোবা প্রথম দৃপ্ত এক যুব-মানসকে নিজের বুকের কোলাজে স্থাপন করা ৷ বিংশ শতাব্দীতে কবি নজরুলের নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদী সুর, সুভাষের মার্কসীয় বীক্ষনবাদ, কিংবা বিষ্ণু দে’র ঐতিহ্য অনুসরনে প্রগতিশীল কবিতাধারা হয়তো গান হয়ে মনের তারে টান দেয় ৷ কিন্তু সুকান্তের দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ বাচনভঙ্গি যেন গান নয় , সংকল্পরূপ মন্ত্র হয়ে হৃল্লিখিত হয়, স্পন্দিত হয় ; যা কবিতার সীমাবদ্ধ একরৈখিক বাউন্ডারি টপকে পৌঁছাতে পারে শাশ্বত গন্ডিহীনতায় ৷ ‘ঘুম নেই’ কবি সুকান্তের অন্যতম শ্রেষ্ট একটি কাব্যগ্রন্হ ( প্রকাশকাল ১৯৫০ সাল, কবির মৃত্যুর পর) ৷ উল্লেখ্য কাব্যগ্রন্হের ‘ প্রিয়তমাসু ‘ কবিতাটি এক্ষেত্রে স্মরণে আনা যেতে পারে ৷ 

দশটি স্তবকে লেখা কবিতাটিতে কবি ফুল আর কাঁটা’কে যেন পাশাপাশি রেখে সেই যুগের বিভীষিকাময় বিদ্রোহের মধ্যে আজন্মলালিত প্রেমের প্রতিচ্ছবিকে স্পষ্ট করেছেন ৷ প্রথম স্তবকে কবি জানিয়ে দেন —

     “ অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে 
     আজ এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছি —
     স্বদেশের সীমানায় ৷”

স্পষ্ট হয় পরাধীন দেশের স্বাধীনতা সন্ধানী লড়াকু চাতক আজ ধূসর তিউনিসিয়া থেকে স্নিগ্ধ ইতালি ; ফ্রান্স থেকে প্রতিবেশী বার্মাতেও নিজের জীবন বলিদান দিতে ব্যস্ত ৷ বসন্তাগত পড়ুয়া — কলমবাজ যুবক হাতে দুর্জয় রাইফেল , গায়ে সৈনিকের কড়া পোশাক চাপিয়ে অনায়াসে স্বীকার করেন — "রক্তে রক্তে তরঙ্গিত জয়ের আর শক্তির  দুর্বহ দম্ভ, / আজ এখন সীমান্তের প্রহরী আমি"।

লক্ষ করুন, সুকান্তের কবিতায় রয়েছে যুগযন্ত্রণা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে নেই ক্লান্তি, বিষন্নতা এবং অবসন্নতা ৷ নিরাশাময় পরিস্হিতিতে সুকান্ত জ্বালিয়ে রাখতে পারেন ঋজু জনকল্লোলের রশ্মিকে ৷ আর হয়তো এটাই তার চ্যালেঞ্জ ৷ 

কবিতার অগ্রসরে স্পষ্ট হয় কবি যেন জন-নির্জনহীন পরদেশ — দ্বান্দিক মরুভূমিতে একা বিচরন করছেন ৷ তখনই  স্বদেশের হাওয়ায় নিল আকাশ ভেসে এসে "চোখের সামনে খুলে ধরেছে সবুজ চিঠি" ৷ একদিকে পরদেশের কর্তব্য এবং অন্যদিকে স্বদেশী প্রেমময়তা দুইএর দোলাচলতায় পড়েন পত্রপ্রাপক কবি ৷ তবু সবকিছু শেষ করে তিনি চলে যেতে চান নিজ দেশে প্রিয়তমার সন্নিকটে , যার জন্য যুদ্ধের ফাঁকে অবাধ্য মন ধরা দেয় ৷ হৃদয় জ্বলে ওঠে "অনুশোচনার অঙ্গারে" ৷ যৌবনের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা কবি যেমন পারেননি নিরবিচ্ছিন্ন কর্তব্য থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে, তেমনই পারেননি যুগযন্ত্রনার অগ্নিকোণে বিদ্ধ হৃদয় থেকে প্রেমের সলতেকে বিসর্জন দিতে ৷ দুর্ভিক্ষ-মড়কের মধ্যে রেখে আসা এই ‘প্রিয়তমা’ যেন হয়ে উঠেছে বহুরৈখিক কাব্যনায়িকাঃ 

সপ্তম স্তবকে এসে কবি জানান হয়তো তার প্রতীক্ষায় আজ আর কেউ নেই ৷ তবু প্রতীক্ষায় আছে একজনই , যার ‘হৃদয় নেচে উঠবে’ কবির আবির্ভাবে ৷ তাই কবি এবার ফিরতে চান ; যেন গোলাপ ফোটাতে চান নিজ রক্তে, নিজ দেশে ৷ শুভকর্ম প্রেরণাময় কবির কবিতায় এই পর্যন্ত ফুটে ওঠে সমকালীন সমাজচেতনা এবং নিজ জীবনকে নিঙড়ে কাব্য করে তোলা ৷ কিন্তু শেষ (১০ ম) স্তবকটিতে কবি নিজেকে করে তোলেন শ্বাশ্বত দৃষ্টির রূপকার ৷ কবি মিলিয়ে দেন অতীতের গতানুগতিকতার সাথে বর্তমানের বাস্তবকে , বর্তমানের বাস্তবের সাথে ভবিষ্যতের কল্পনাময় সত্যকে ৷ কবি বলে ওঠেন — 

    “ আমি যেন সেই বাতিওয়ালা,
 যে সন্ধায় রাজপথে-পথে বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
অথচ নিজের ঘরে নেই যার বাতি জ্বালার সামর্থ “


যাঁরা আলো দিয়ে ‘আলোকপৃথিবী’ গড়ে তোলে তারাই যেন আলোকপৃথিবী পৌঁছানোর টিকিট পাননা , থেকে যান অন্ধকূপে ৷ এই আবেদন সেদিনের নয় , যেন পূর্ব নির্ধারিত এবং অবশ্যভবিতব্য ৷ 

কবি সুকান্তের এই স্বগতঘোষনা কবিতার আবেদনকে ইউনিভার্সাল পর্যায়ে উন্নিত করে ৷ লিখন-কার্য রূপান্তরিত হয় সৃষ্টি-কার্যে ৷ ত্রক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে বুঝে নেওয়া যাক  ঃ—



০ সমকালিন — তৎকালীন যুদ্ধময় পরিস্থিতির ছবি এবং আত্মদ্রোহিত মন ও প্রেমিক হৃদয়ের ছবি
০ চিরকালীন— অন্তহীন কালপ্রবাহের অন্ধকারাচ্ছন্ন আলোকযাত্রীর ছবি 

আসলে সমকালিন থেকে চীরকালীন পথের অন্তহীন স্রোতেই যেন কবিতার সার্থক যাত্রা ৷ কবি সুকান্ত হয়তো তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন , কিংবা বাস্তবে আত্মমগ্ন থেকেও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গীকে জারি রাখতে পেরেছিলেন ৷ অল্প বয়সে যুগযন্ত্রনার কুঁজ ধারণ করে বুঝে ছিলেন - “ নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার ৷” তাই আজও হাজার হাজার অতনুরা শিক্ষার আলোকে সঙ্গী করেও শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়ে থেকে যান মৃত্যুর অন্ধকারে ৷ 
             



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-