Thursday, August 31, 2017

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | August 31, 2017 |
ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে, সোনাঝুরির দিনরাত্রি
তীব্র গরমের শেষ চারিদিকে তখন বর্ষার আগমন বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলের স্কুলে গরমের ছুটি চলছে। ঘরে বসে চুটিয়ে লিখছি একটা উপন্যাস। পতিদেব অফিস থেকে ফোন করে বললেন, ‘যাবে নাকি শান্তিনিকেতন?’ আমি বললাম, সোনাঝুরিতে যদি থাকার ব্যবস্থা করতে পারো তবে রাজি। ঘরের কাছে সোনাঝুরি হাট আর কোপাই আছে অথচ সেটাই দেখা হয়নি। ঠিক ৯ই জুন, বর্ধমানের বাড়ি থেকে আমরা ছ’জন মানে দুটো পরিবার রওনা হলাম সোনাঝুরি পথে। বর্ধমান থেকে ঘন্টাখানেকের রাস্তা প্রান্তিক স্টেশনে যখন নামলাম, তখন দিনের আলোর গায়ে সন্ধ্যে রঙের ছোঁয়া লেগেছে। ছিমছাম নির্জন স্টেশন প্রান্তিক নিজেই একটা দর্শনীয় স্থান। একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম কয়েকটা টোটো দাঁড়িয়ে আছে। সোনাঝুরিতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ‘লা সোনাঝুরি রিসর্টে’। টোটো ছুটে চললো সরু কালো পিচের রাস্তার উপর দিয়ে। রাস্তার দু’ধারে সরে সরে যেতে লাগলো সবুজ গাছপালা আর শুকনো খোয়াই। মিনিট পনেরো পরেরই টোটো

ঝুরঝুরে মোরামের কাঁচা রাস্তার ঢাল বেয়ে নেমে গেল সোনাঝুরির বনের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চিললো রিসর্টের দিকে। গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই জুড়িয়ে গেল চোখ সাজানো রিসর্টের রূপ দেখে! গেট থেকে সোজা চলে গিয়েছে মোরাম রঙের নুড়ির রাস্তা, দু’ধারে সাজানো সবুজ বাগান। মাঝে মাঝে জ্বলছে সাদা আলো। চারিদিকে সোনাঝুরি বনের মাঝে মায়াবী দেখাচ্ছে লালরঙের রিসর্টকে। মাঝের সিঁড়ি দিয়ে উঠেই সামনে রিসেপশন। আমাদের ঘর দুটো ছিল বাঁদিকে। ঘরের সামনে সরু লোহার রেলিং দেওয়া ব্যালকনি। সন্ধ্যের রং ততক্ষণে বেশ গাঢ় হয়ে উঠেছে। বাইরের পোশাক বদলে এসে বসলাম খোলা ব্যালকনিতে। একটা নিঝুম নিঃস্তব্ধ ব্যালকনি আর আমি নিমেষেই মেতে উঠলাম নির্জনতার আরাধনায়। এই নির্জনতা পাওয়ার আশাতেই তো ছুটে আসা এখানে। মোবাইলে চলছে তখন শ্রীকান্ত আচার্য্যের গান। সবাই নিজের মন মগ্ন তখন।

নিজেকে একটু আড়াল করতে খানিক এগিয়ে আসতেই চোখে পড়লো এক নৈসর্গিক দৃশ্য! সোনাঝুরি পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে গোল হলদেটে ঝকঝকে চাঁদ। মনে পড়ে গেল এ চাঁদ পূর্ণিমার। ক্যামেরায় বন্দি করেও শান্তি এলোনা মনে। তাকিয়ে রইলাম অনন্ত সময় ধরে। একসময় দেখলাম চাঁদ মাঝ আকাশে চলে গেল। রাত গভীর হতেই চারিদিকে শুরু হলো নিঃস্তব্ধতা ভেদ করা ঝিঁঝিঁর ডাক। মন জুড়ে ছেঁয়ে রইলো এক প্রাচীন অনুভূতি। 

বেশ সকালেই ঘুম ভেঙে গেল, বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা সোনাঝুরি গাছে বসে থাকা পাখির বিচিত্র ডাকে। বিভিন্ন পাখির মিলিত সুর বিছানায় শুয়ে শুয়েই প্রবেশ করতে লাগলো কর্ণকূহরে। একটা নতুন সকালের আড়মোড়া ভেঙে প্রস্তুত হতে লাগলাম সকলেই। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো। প্রথমেই কঙ্কালীতলা। হোটেল থেকে যাত্রা পথের শোভা ক্যামেরা বন্দি করতে করতেই পৌঁছে গেলাম মন্দিরে। কঙ্কালী তলা পৌরাণিক মতে সতীর ৫১ পীঠের একটি পীঠ। এখানে সতীর কঙ্কাল পড়েছিল তাই এই স্থানের নাম কঙ্কালীতলা। মন্দিরের বিশেষ বাহার নেই, কিন্তু একটা ছমছমে ব্যাপার আছে প্রকৃতি জুড়ে। মন্দিরের কিছু দূর দিয়ে বয়ে গিয়েছে কোপাই নদী।বর্ষা ছাড়া এই নদীতে জল প্রায় থাকে না বললেই চলে। পায়ে পায়ে নদীর দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম, শ্মশানে একটা নিভিন্ত চিতা থেকে এঁকে বেঁকে সাদা ধোঁয়া উপরে উঠে যাচ্ছে। অদ্ভূত একটা নীরবতা একটা শান্তি! এই পর আমরা ছুটে চললাম রবি ঠাকুরের বাড়িতে।রবি ঠাকুরের স্মৃতি ছড়ানো রয়েছে চারিদিকে, শুধু অনুভব করে নেওয়া। দূরে বসে এক বৃদ্ধ বাউল ফকির। চোখের চাউনিতে নেই কোনো লালসা। কাছে গিয়ে বললাম, ‘বাবা গান শোনাবেন? আগ্রহে তিনি তুলে নিলেন একতার। আঙুলের ছোঁয়ায় তুললেন জীবনের সুর। দু’চোখ আমার ভরে উঠলো জলে। রমজানের উপবাসের মাঝেও কত ভালোবেসে সুর তুললেন তিনি।

তখন দুপুর বারোটা। ফিরে এলাম হোটেলে। দুটো বাজলেই শুরু হবে হাট। শান্তিনিকেতনের বিখ্যাত সেই শনিবারের হাট।এটাই তো আমার এখানে আসার মূল আকর্ষণ ছিল। না, শুধু জিনিস কেনা নয়। আকর্ষণতো অন্যখানে। মাটির সুরে তাল মিলিয়ে কোমর দোলানো, ধামসা,মাদলের তালে তালে। দুপুরে ক্ষণিক বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাটে। আমাদের হোটেল থেকে হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট। সত্যিই বীরভূমের মাটির রং,গন্ধ, সোনাঝুরি ফাঁকে ফাঁকে এঁকে বেঁকে পথচলা অনন্য এক অনুভূতি সে! হয়তো যা অনুভব করলাম ঠিক ব্যক্ত করা হলো না। আসলে কিছু অনুভূতির ব্যাখা হয়না। শুধু মনের অতলে সঞ্চিত হয়ে সমৃদ্ধ করে মনের ভান্ডার। সোনাঝুরি ফাঁকে ফাঁকে বসেছে বাহারি, রকমারি জিনিসের পসরা। চলছে শহুরে চোখের হামলা। আমার মন তখন হারিয়ে যাচ্ছে বাউলের সুরে। এদিক ওদিক দিয়ে ভেসে আসছে বাউলগানের সুর আর একতারার ঝংকার। ছুঁয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের মরচে পড়া তারে। চোখ খুঁজে চলেছে তাদের, সেই গানের তালে কোমর দোলাবে যারা। রোদ প্রায় পড়ে আসছে। মনটা উচাটান, কই তারা কি আসবে না! হঠাৎ শুনতে পেলাম মাদলের দ্রিম দ্রিম।পাগলের মত ছুটলাম সেই দিকে। জড়িয়ে ধরলাম সাঁওতাল মেয়েদের হাত। কেমন যেন চেনা স্পর্শ পেলাম! এই অচেনা মেয়েদের আগে তো কখনও দেখিনি,তবু এ কিসের পরিচয়ের স্পর্শ! একেই কি তবে বলে মাটির সাথে পরিচিতি? জানি না, হঠাৎ কেমন ওদের সাথে একাত্ম হয়ে কোমর দোলালাম আমিও। ঘুরে ঘুরে মাদলের তালে তালে নেচে চললাম এক আদিম আনন্দের অনুভূতি নিয়ে। মিনিট পনেরো প্রায় একটা অন্য দুনিয়ায় কাটিয়ে ফিরে এলাম বাস্তবে। ঠিক সন্ধ্যের মুখে ঘামে ভিজে ফিরে এলাম হোটেলে। আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গিয়েছে গ্রামের ভিতর ঐ গ্রামটার নাম বল্লভপুর। হোটেল থেকেই জানতে পেলাম প্রতি শনিবার সেখানে একটা গাছতলায় নাটক হয় সন্ধ্যে সাতটা থেকে।

বারান্দায় অন্ধকারে কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ওই পথে। একটা বড় অশ্বত্থ গাছের নিচটা গোল করে বাঁধানো,তাতে একটি লোক কালো পোশাক পড়ে হাত মুখ নেড়ে অভনয় করে চলেছে। সামনে দর্শক আসনে বসে গ্রামের সরল মানুষের দল। আমরাও গিয়ে বসলাম ওদের মাঝে। ক্ষণিক সময় কেটে গেল এক আদিম অনুভুতির মাঝে। এক ঝলক কল্পনার স্মৃতি উঁকি মারতে লগলো মনে। সেই টিভি, মোবাইল,টেলিফোনের যুগের আগের এক ফসিল হয়ে যাওয়া যুগের কল্পনার ছবি। নাটক শেষে ফিরে এলাম দুদিনের অস্থায়ী ঠিকানায়। সারাদিন শুধু ছুটেছি। ক্লান্ত শরীরে বিছানার হাতছানি উপেক্ষা করা দায়। পরেরদিন বেশ সকালেই বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম পায়ে হেঁটে আদিবাসী গ্রাম দেখতে। মাটির বাড়ি,খড়ের ছাঁউনি, মেঠোধুলি পথ। গ্রাম বাংলার ছবি যেন সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে এসেছে চোখের সামনে। একটা কাঠের আগুনে উনুন পোড়ার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে বাতাসে। কোথাও দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক লোহার চাকার গরুর গাড়ি। গরু গুলো পাশে বাঁধা খড় খাচ্ছে। কালো ছাগল মাটির রোয়াকে মাথা গুঁজে শুয়ে আছে। বাঁশ গাছের পাতা গুলো হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়লো শুনেছিলাম এই গ্রামের ভিতর দিয়েই নাকি পথ আছে কোপাই নদীর কাছে যাওয়ার। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলেন কোন দিকে যেতে হবে। আমরা হেঁটে চললাম সেই পথে মনে অজানাকে জয় করবার অদম্য কৌতূহল। গ্রামের রাস্তা ছেড়ে পথ নেমে গিয়েছে মাঠের দিকে আলপথে এগিয়ে যেতে যেতে দেখলাম দূরে ফাঁকা সবুজ মাঠের মাঝে একটাই ঘর। চারিদিকে থমথমে নীরবতা। পথ খুঁজে না পেয়ে সেই দিকে এগিয়ে যেতে ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এলো চারটে কুকুর। হঠাৎ শুনলাম কুকুরের মালিকের বৃদ্ধ গলায় ধমকের শব্দ। শান্ত হয়ে গেল কুকুর গুলো। ওই ব্যক্তিই দেখিয়ে দিলেন কোপাইয়ের পথ। আরো কিছুটা ঘেসো জঙ্গল ভেদ করে নিচের দিকে নামতেই দেখা মিললো আমদের সেই ছোটো নদীর। পায়ের পাতা ডোবা জল তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে পাথরের ফাঁক দিয়ে। কিছুটা সময় কোপাইয়ের সাথে জলে পা ভিজিয়ে। চারিপাশে চেয়ে দেখলাম চেনা এক ছবি। ছোটো বেলার আঁকার খাতার কিছু চেনা পাতা যেন আজ চোখের সামনে জীবন্ত। দুই দিকে সবুজ পাড় মাঝে বয়ে চলেছে নদী। নদীর পাড়ে রাখাল ছেলে মোষের পাল নিয়ে হেঁটে চলেছে। না, সব কিছু এখনো হারিয়ে যায়নি! আজো আছে এক টুকরো প্রকৃতি, ঠিক যেমন ছিল ছোট্ট বেলার দিন গুলিতে।

এবার ফেরার পালা। মনটা ঠিক কেমন ব্যাখ্যা করা যায় না। কিছু পাওয়া ক্ষণিকের তরে,আবার কিছু হারিয়ে ফিরে যাওয়া ব্যস্ততার অলিতে গলিতে। তবু পরিযায়ী এজীবনের সুখ বুঝি উড়ে চলাতেই। মনে মনে বললাম, ‘ আবার আসিব ফিরে ,কোপাই তোমার তীরে”।


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.