বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৩১, ২০১৭

বর্ণালী বিশী

sobdermichil | আগস্ট ৩১, ২০১৭ |
শেষ ইচ্ছা
‘হ্যলো…বৌ্দি, আমি চন্দনা বলছি,..আমার কাজে যেতে আরো চার-পাঁচ দিন দেরী হবে। কষ্ট করে ক’টা দিন পার করো। তুলির মাকে, মিঠুবৌ্দিকে খবরটা দিবে গো.., ক্যানিংএর অনেকটা ভিতরে তো, লাইনটা ঢুকে না, ফোনটাতে পয়সাও শেষ। আমি যেয়ে বলব,বড্ড অসুবিধায় পড়ে গেলাম ।কাল রাতে লাইনটা লাগল নাই, তাই আজ সকাল সকাল…।’ 

নীতার ভেতরটা তেলে বেগুন জ্বললেও নরম গলায় ‘ঠিক আছে’ বলে মোবাইলটা ধপাস করে বিছানায় নামিয়ে হনহনিয়ে ব্যালকনি থেকে একহাত দূরত্বে পাশের ফ্ল্যাটে চিৎকারে ডাকল, মিঠু…, মিঠু্……,’

‘আসছি…, আসছি…, দিদি…’, বলতে বলতে মিঠু তার ডাইনিংএর সোফার পাশে সরু ফা্লি জায়গাতে জানলার গ্রিলটা ধরে অভ্যাস মতো দাঁড়াতেই নীতা বিষ উগরা্নোর মতো চন্দনার ফোন টার কথা উগরে কিছুটা ধাতস্থ হল।

‘আরো চার-পাঁচ দিন…!! দু’মাসের আটটা ছুটিই নিয়ে গেলো ওর বাবার শ্রাদ্ধতে, আবার কিসের…? ’মিঠুও গেল রেগে।

‘এসে জানাবে বলল’-তিরিক্ষি গলায় নীতার জবাব।

নীতার ভাল বন্ধু মিঠু। অনেক মনের কথা উভয়েই শেয়ার করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এভাবে দাঁড়িয়েই গল্প, একটা লাঠিতে টিফিনবক্স সমেত ব্যাগ ঢুকিয়ে জানলায় তরকারি লেন-দেন, নতু্ন কিছু কিনলে দেখানো সব কাজ ওরা এখান থেকেই সারে। চন্দনার চর্চা করতে করতে কলিং বেলের শব্দে নীতা পড়িমরি করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে মিতালির কোল থেকে সুমিকে নিতে নিতে বলল,‘আরোও চার-পাঁচ দিন পরে আসবে চন্দনা!!’সুমির কাচারগুলো রাত্রে ফিরে ওয়াশিংমেশিন চালিয়ে নিবি।‘

‘আমাকে দুপুরের দিকে ফোন করো সব জানিও। আজ নীলের জন্য বড্ড দেরী হল, কাল অনেক রাত্রে পার্টি থেকে ফিরেছে। মা আসছি…’-বলে মিতালির অফিস দৌড় মেট্রো ধরবার। 

দরজা ভেজিয়ে নাতনিকে, ‘দুধ-কর্নফ্লেক্স খেয়েছো? আজ আমরা কি খেলব?’ বলতে বলতে দু’চারটে সিঁড়ি উঠতেই সুরেন রোজকার অল্প বাজার নিয়ে ঢুকতেই নাতনীও হাত-পা ছুঁড়ে দাদুর কাছে যাবার জন্য কান্না জুড়ল। নাতনীকে সামালে উপরে উঠতে উঠতে চন্দনার খবরটা দিতে গিয়ে হঠাৎ ঝাঁঝ গলায়,‘আমি অন্য মেয়ে দেখে নেবো আজ। দীপা কাল থেকে চারদিন ছুটি নিয়ে বাড়ি যাবে ওর বাবাকে আনতে, বন্যায় নাকি ঘর ভেসে গেছে!’

‘চন্দনা আসার পর কথা বলে না হয় ডিসিসনটা নিতে’-বর্ষার সোঁদা গলায় বললেন সুরেশবাবু 

‘হ্যাঁ, তুমি তো এক্ষুনি অফিসে এসিতে বশে থাকবে,সারাদিন নাতনীর ঝামেলাও বুড়ো বয়েসে আমার ঘাড়ে,বাবা-মা হয়ে দায়িত্ব রাতের ঘন্টা দেড়েক, তারপর তো সুমি ঘুমিয়ে পড়ে। আমি পারব না অত কাজ করতে। দু-জন একসাথেই ছুটি নিলে আমার কি…???’

‘আমি কি এজন্য ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে থাকব?’আমার চাপ তুমি বোসে বোসে বুঝতে পারবে’??

দু’জনের তুমুল ঝড় থামল গেট খোলার শব্দে, নীতা অন্যরুমে আস্তে আস্তে গজগজাল।

‘বৌ্দি আগে তরকারী কেটে নেব না টিফিন বানাব’? –রাজধানী এক্সপ্রেসের গতিতে ঢোকে দীপা, আজ আরেকটু তাড়াতাড়ি সব ঘরেই বেশী কাজ,তা প্রায় দশ-বারোখানা ঘর এধার-ওধার।

‘আজ বাসনটা মেজে দেবে? চন্দনা আরো ক’দিন আসবে না।’

‘না বৌ্দি আমার আজ সময় হবে নি কো।’টিফিন বানাতে বানাতে দীপার জবাব।

‘দুদিনের রান্না করবে, বেশী করে মশলা বেটে রেখো ফ্রিজে’ বলে নীতা মোবাইলের কলটা রিসিভ করল।

সামনের ফ্ল্যাটে তুলির মা ফোনে জানাল ওর চেনা পরিচিত একজন আছে ওরা তিন বাড়ি মিলে কাল থেকে কাজের ঠিক করে নিয়েছে, চাইলে ‘নীতাদি আপনি রাখতে পারেন।  চন্দনার মতোই পেমেন্ট।’

নীতা লম্বা শ্বাস নিতে নিতে ‘ঠিকআছে, কাল সকালে পাঠিয়ে দেবেন।’মিঠুকে খবর দিতে গিয়ে জানতে পারে সেও একজনকে ঠিক করছে।

চন্দনা বাড়ি থেকে ফিরে জানতে পারে, বারো-তেরো বাবু বাড়ির দু-তিন বাড়ি ছাড়া সবাই লোক রেখে নিয়েছে। বাবার বাড়াবাড়ি শুনে মাথার ঠিক রাখতে না পেরে বাবার কাছে ছুটে গেছিল,  তার কোলে মাথা রেখেই বাবার শেষ কালের শেষ ইচ্ছাপূরন।

তারপর কদিন বাবুদের বাড়ি কাজ করে জমানো ছুটি নিয়ে বাবার পারলৌ্কিক কাজ সারে কিন্তু কাল বর্ষা তখনি মা’এর ঘরটা ভেঙ্গে দিয়ে তাকে করল সর্বস্বান্ত। সে ওই অবস্থায় মাকে ছেড়ে আসতে পারে নাই। ধার-দেনা করে মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে গিয়ে তার এই হাল। গাছের তলায় বসে বসে চন্দনা ভাবতে গিয়ে চোখের জল আটকাতে পারচ্ছিল না। কিন্তু যখন মনে পড়ছিল তার কোলে মাথা রেখে বাবার সুস্নিগ্ধ মুখটা, ‘শেষ ইচ্ছাটা চন্দনা তুই রাখলি,প্রাণটা তোর লেগেই ছিল’- পাড়ার লোকের কথাগুলো, তখন মনটা চিকচিক করছিল রাতে দীঘির জলে পূর্ণিমার আলোয়। সর্পিল আকাশে বাবার গমগম হাসির শব্দই তার কানে ভাসছিল। 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-