সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

পৃথা ব্যানার্জী

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
এক বর্ষার রাত
র্ষা ঋতুকে সবাই খুব ভালোবাসে। আমিও ভালোবাসতাম, না এখনো বাসি । ভীষন কবিতা লিখতে মন চাইতো রিমঝিম বর্ষাতে। কিন্তু এক ভয়াবহ ডাকাতি আমার মনে বর্ষার রাতের যে ছবি এঁকে দিয়েছে তাকে মুছতে আজও পারিনি। সেই গল্পই আজ সবাইকে বলব।


গ্রাম বাংলার বর্ষার রূপ ভীষন সুন্দর, যে গ্রামে থাকেনি সে বুঝতে পারবেনা। আমি বেশিরভাগ সময় ছাদের ঘরে থাকতাম আর দুচোখ ভরে দেখতাম মাঠ জুড়ে কচি ধানের গাছ আর আকাশ জুড়ে কালো মেঘের দল। রাতের বর্ষার আকাশেরও এক অন্য রূপ, তবে সেই রাত যদি চাঁদের আলোর পরশ পায় তবে তা স্বর্গেরই দ্বিতীয় রূপ। সেইদিন সন্ধে থেকে বৃষ্টি ছিলনা কিন্তু কেমন যেন থমথমে ভাব ছিল। আকাশ বাতাস বৃষ্টি সবাই যেন থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল অজানা এক ভয়ে। গ্রামের ভলেন্টিয়ারের দল পালা করে তিনবার ঘুরে ঘুরে পাহারা দেয়। বর্ষার রাতে আর শীতের রাতে খুব ডাকাতি হয় কারন ঐ সময় মানুষের ঘুম একটু গভীর হয় আর গ্রামের লোক সরাদিন মাঠে চাষ করে ক্লান্ত থাকে। ডাকাতের ভয়ে প্রথম রাতটা মানুষের ঘুমটা পাতলা হলেও শেষ রাতের দিকে গভীর ঘুম ঘিরে ধরে। 

ডাকাতিটা হয় খানিকটা আক্রোশ আর অভাবের তাড়ায়। আমাদের বাড়ি হয়েছিল অভাবের তাড়ায়। তখনকার দিনেতো এটিএম ছিলনা। ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে হয়েছিল বাড়ির খরচা আর চাষের লোকের আগাম টাকা দেবার জন্য। সেটাই কোনোভাবে খবর হয়ে গিয়েছিল। 

রাত দশটার পর তুমুল বর্ষা নামল। তার সাথে প্রচন্ড মেঘের গর্জন আর ঝড়। আমরাও শুয়ে পড়েছিলাম। আর সেই রাতে ভলেন্টিয়ার ছেলেরা ক্লাব ঘরেই শুয়েছিল কারন তারাও মনে করেছিল এ অবস্থায় ডাকাত আসতে পারেনা, ডাকাত হলেও তো মানুষ তারা। ধীরে ধীরে ঝড়ও বাড়তে থাকলো। 

এক সময় চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। খুব আস্তে পায়ে এগিয়ে দরজা খুলেই দেখি বারান্দা ভর্তি লোক। আমাকে দেখেই একজন এসে আমার হাতদুটো বেঁধে বলল ‘চুপ করে বসে থাকতে আওয়াজ করলেই মুখও বেঁধে দেবে’। আমার দাদা এক ফাঁকে ওদের চোখ এড়িয়ে ছাদ থেকে চিৎকার করেছিল সাহায্যের জন্য কিন্তু উন্মত্ত বর্ষা সে আওয়াজের গলা টিপে ধরেছিল, দুরে যেতে দেয়নি। দাদাকেও মার খেতে হয়েছিল তার জন্য। বাবাকেও চাবি না দেবার জন্য মার খেতে হয়েছিল। টাকা পয়সা বাসন ভালো কাপড়জামা সব নিয়ে চলে যাবার সময় ওরা সামনের দরজায় তালা দিয়ে চাবি নিয়ে যায়। 

পরদিন ঝিরঝির বৃষ্টিতে আকাশ কালো মেঘে ঘিরে থাকায় সকাল হয়েছিল অনেক দেরিতে। দাদা ছাদ থেকে অনেক চিৎকার করে তবে পাশের বাড়িকে জাগাতে পেড়েছে। তারপর একে অন্যকে খবর দিয়ে তালা ভেঙ্গে মুক্তি পেলাম অনেক বেলায়। বৃষ্টির জল কাদায় বাড়ি ঘরের অবস্থা তখন শোচনীয়। হঠাৎ এইরকম আক্রমনে বাবাও অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছে আর মা কেমন এক জবুথবু অবস্থায় বিছানার একপাশে বসে আছে। পাশের বাড়ির শোভা জেঠিমা এসে হাল ধরলেন। ডাক্তারকে ডাকতে হারু কাকুকে পাঠালেন। 

যদি ওই ভাবে বৃষ্টি না হতো তাহলে এমন ভয়ানক ডাকাতিও হতো না। সেই ডাকাতিতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। আমাদের ঘরে সামান্য যা সোনা ছিল, কাঁসার বাসন ছিল সব নিয়ে গিয়েছিল। বাবার আলমারির বইগুলোকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলেছিল টাকা খুঁজতে গিয়ে। যে পরিমান টাকার খবর পেয়ে ওরা এসেছিল তা না পেয়ে ভীষন হিংস্র হয়ে উঠেছিল ওরা। যে জিনিষ নেবার নয় তা ভেঙে নষ্ট করে দিয়েছিল। অহেতুক বাবাকে দাদাকে মেরেছিল। ওই ডাকাতির বিভৎস ভয় আমার মাকে একরকম চলমান পদার্থে তৈরী করেছিল তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মা যাতে সুস্থ হয়ে ওঠে তার জন্য বাবা নিজের অসুস্থ মনটাকে চেপে রাখত। আমি আর দাদাও চেষ্টা করতাম ওই ভয়াবহ রাতটাকে ভুলতে কিন্তু পারতামনা। আমাদের লেখাপড়ার ও ক্ষতি হচ্ছিল কারন আমরা সন্ধের পর পড়তে পারতাম না খালি মনে হত কেউ হয়তো পেছনে দঁড়িয়ে আছে। বছর খানেকের ভেতর বাবা ঢাকুরিয়াতে ছোটো একটা বাড়ি কিনে চলে এলো গ্রাম ছেড়ে। আর আমরা গ্রামে ফিরিনি কোনোদিন। আমি কিন্তু পারিনি ভুলতে ফেলে আসা সেই গ্রাম, আমার সেই ছাদের ঘর আর চারপাশের সবুজ মাঠ। যে বৃষ্টিকে আমি এতো ভালোবাসি সেই বৃষ্টিই আমার জীবন থেকে এইগুলো কেড়ে নিয়েছে। 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-