Monday, July 31, 2017

জয়া চৌধুরী

sobdermichil | July 31, 2017 |
আজাইর্যা বাজার কথন /  জয়া উবাচ ২
আমি ঢের লক্ষ্য করে দেখেছি বেশ কিছু দোকানপাটের ব্যবসা আছে যেখানে জি এস টি লাগু হবার কোন সম্ভাবনাই থাকে নি, সেসবের মালিকানা মেয়েদের হাতেই থাকে। ভদ্দরলোকের মেয়েরা একশ বছর আগে বাড়ি থেকে বেরোত কম, অন্দরের কাজে স্বচ্ছন্দ ছিল বেশি। তা সে রামও নেই সে অযোধ্যাও রামমন্দিরের চক্করে বেপথু। অতএব মেয়েরা এখন বের হয়, নানান কর্মক্ষেত্রে পরিষেবা দিয়ে চলেছে। আপনি বলবেন নতুন কথা কি! নতুন তো নয়ই, আমার মাথায় অন্য কথা এল। দেখুন ধানের ক্ষেতে চারা রুইতে, ইট ভাটায় ইট বইতে, রাজমিস্ত্রীর জোগালুর কাজে যে মেয়েরা বরাবর খেটে এসেছে তার কোন ব্যত্যয় হয় নাই এখনো সে আপনিও দেখেন আমিও দেখি। তবু এখনকার সমাজে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোয় সোয়ামীদের সঙ্গে সঙ্গে বউরাও সমান তালেই বাড়ির বাইরেও কাজ করে চলেছে। বিশেষ করে রাস্তার কোনা খামচির চা- চপ- ফুলমালার দোকানে তাদের রমরমা ব্যাপার। 

সেবার ভেলোর গেছলাম একটা প্রয়োজনে। স্থানীয় বাজারে গিয়ে দেখি ডালায় ডালায় হরেক রকমের ফুল ( বেশির ভাগ গন্ধহীন ও রূপবান) সাজিয়ে কৃষ্ণকলিরা বসে আছেন কোনায় খামচিতে। পুরুষ ফুলওয়ালা নেই তা নয় তবে রসিক খদ্দের মালিনীদের কাছেই ঘুরঘুর করছে অধিক। চায়ের দোকানী সম্রাজ্ঞীরা এ ব্যাপারে মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের চাইতেও ক্যারিশ্ম্যাটিক ভঙ্গীতে চা বেচেন। আপনি তৃষ্ণার্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন রাস্তার কোনার যে কোন চায়ের দোকানে। ঠোঁট বেয়ে প্রশ্ন ছিটকোবে – বড় না ছোট? যথোপযুক্ত উত্তর দিয়ে অপেক্ষা করলে একটু পরেই দেখবেন অন্য কোন রসিকের গুরুত্বপূর্ণ কোন গপ্পো শুনতে শুনতে অবহেলে হাতে তুলে দিচ্ছেন তিনি ধোঁয়া ওঠা ভাঁড়। খদ্দের আপনি পসারিনী তিনি কিন্তু চোখের চাহনির প্রসাদ পাচ্ছে তেনার অন্য কোনও দেশোয়ালা সৌভাগ্যবান। ডালহৌসী চৌরঙ্গী পার্ক ইস্ট্রীটের বেসুরো আপিস পাড়ার বিচিত্রভাষী মুশকো চাওয়ালারা মশাই বেশির ভাগ ওসব পাড়াতেই দেখা যায়। নইলে শহরের অন্যান্য অংশগুলোয় কর্মসূত্রে প্রবাসী রিস্কাওয়ালা, টেসকিওয়ালা, মিস্তিরি, মুচি, বাদামওয়ালাদের রসহীন রোজনামচায় লেবু লঙ্কার টাকনা তো এঁরাই দেন! 

নাগের বাজারের এক পসারিণী দেখি কলাপাতা, নারকেল, কলার ছড়া বেচেন। আসেন যান তিনি তিন তিন ছ’ঘন্টা ডেলি প্যাসেঞ্জারী করে সে বাজারে রোজ রোজ ঝড় জল। তার পরনে প্যান্ট আর ময়লা টি শার্ট। সবার চাইতে ব্যতিক্রমী পোশাক দেখে জিজ্ঞেস করে জেনেছি তিনি স্পোর্টস উওম্যান ছিলেন। অ্যাথলিট। ছিলেন কেননা এখন আর খেলেন না। সংসারের বোঝা মাথায় এসে পড়ায় রাজ্য পর্যায়ে ভাল ফল করেও পরের পর্যায়ে যাবার খরচ জুটিয়ে উঠতে পারেন নি তিনি। এখন তাই এ বিক্রি করেই জীবন কাটান। ভাবি জিনিষ বিক্রি করে দেন না কি স্বপ্নের ডালিটি! বাংলার ঘরে ঘরে এমন কত খেলোয়াড়ের জীবনই না এইসব দোকানদারীর সঙ্গে জড়িয়ে শুরু কিংবা সাঙ্গ হয়! সেই যে এভারেস্ট অভিযাত্রী ছন্দা গায়েন! মনে পড়ে গেল তাঁর কথাও। এইসব স্বপ্নভঙ্গের পাশাপাশি আরও কত রকম পসারিনীদের আলো করে থাকতে দেখি বাজারময়। বাপের হাত ধরে যেমন পুতের হাতে চলে যায় বিজনেস। ঠিক তেমনই সবজীওয়ালী মাসীর জায়গায় হঠাত চোখে পড়ে তার কচি ছেলের বউটিকে কাঁচা হাতে টাটকা সব্জী নাড়াচাড়া করতে। জিজ্ঞেস করে জানি শাউড়ি তাকে শহরে দোকান করবার শিক্কে দিতেই সাত তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বাইরের জগতে নিয়ে এসেছেন। চোখের সামনে সে হয়ে ওঠে পাকা দোকানী। নজর এড়িয়ে এক পয়সা কম দেবার যো থাকে না আর। শাউড়িকে যদিও বা কেউ ভুজুং দিয়ে৩২ টাকার সব্জী ২২ টাকার হিসেব মিটিয়ে পার পেত এখন আর সে সুবিধে নেই। ইদানীং কচি মেয়েগুলো গোণা গাঁথায় বেশ পাকা হয়েই দোকানদারীতে পা রাখে।

অতএব কদিন পর থেকেই শাউড়ি অ্যাবসেন্ট হতে থাকেন, তেনার বিছ্রামের সময় এসে যায় এবার। সোমসারের হাল ধরে কচি বউটি। এমনি করেই তখত বদল হয় অবলীলায় সৌহার্দ্যে প্রজন্ম থেকে নতুন প্রজন্মে। নিদেন বিড়ি সিগ্রেটের দোকানী বউটিও পাঁচটা ফ্লেক কিংবা জনতা বিড়ির প্যাকেট গুছিয়ে দিয়ে ফেরত পয়সা তুলে দেয় ক্রেতার হাতে। পাশেই টাটে বসে মদ খেয়ে ঝিমোয় আদরের সোয়ামীটি, তবে বিরোধ নাই কোন। পুরুষ মানুষ ওরম নেশা ভাঙ করেই থাকে। সুগৃহিণীরাই পারে এক হাতে আন্না চাপিয়ে অন্য হাতে মেয়ে সাজিয়ে ইশকুলে পাটাতে। আবার ফিরতি পথে দোকান সামলে দুকুরে খাবার সোমায় সোয়ামীকে নিয়ে ঘরে ফিরতে। 

জীবন খাতার প্রতি পাতায় অমন কত দোকানদারী করেই না বেঁচে বর্তে থাকে মানুষ, ঘুরতে থাকে দুনিয়ার চাকা। 



Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.