সোমবার, জুলাই ৩১, ২০১৭

অনিন্দিতা মন্ডল

sobdermichil | জুলাই ৩১, ২০১৭ |
জলের ফোঁটা
কদিন ছিল যখন বৃষ্টি এলেই জল জমে থাকা মাঠে হুটোপুটি খেলার আকর্ষণ এড়ানো অসম্ভব ছিল । সেই বয়সে যখন জমে থাকা জল আসলে নোংরা , তাইতে কাদা পাঁক আরও কতরকমের আবর্জনা থাকে কে জানে , ইত্যাদি ইত্যাদি উপদেশ আদেশ কানের কাছের অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যেত উৎসে , সেসময় আষাঢ়ের প্রথম বর্ষা বড় প্রিয় ছিল । স্কুল থেকে ফেরার সময়ে বর্ষাতি চাপানো মহা অন্যায় কাজ ছিল । কেমন টপটপ করে প্রথমে একটু উষ্ণ আর তারপর শীতল জল নেমে আসত শরীরে সেই অনুভূতি এখনও ফিরে পাই । এখন অবশ্য বৃষ্টিতে ভেজা একদম বারণ । মায়ের কাছে ভিজে ঝুপুস হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য কক্ষনো বকুনি খাইনি । মা দরজা খুলেই আগে পিঠের ব্যাগ নিয়ে নিত । তারপর ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিত । কল খুলে সোজা চান করিয়ে দিত । তারপর শুকনো টুকনো হয়ে বিছানার ওপর আরাম করে বসে আমরা ভাইবোনেরা দেখতাম কার হাতপায়ের চামড়া কতটা কুঁচকে গেছে জল লেগে । সেইসব দিন ক্যালেন্ডারে রেড লেটার ডে ছিল । কারণ সেদিন মা আমাদের গরম চা খেতে দিত । বেশি গরম চা বাহাদুরি করে চুমুক দিতে গিয়ে ভাই অবশ্যম্ভাবী ঠোঁট বা জিভ পুড়িয়ে ফেলত । আমি তাড়াহুড়ো না করে এমন সুখটুকু বেশ মৌতাত নিয়ে চুকচুক করে উপভোগ করতাম । তবে এসবই ঘটত স্কুল ছুটির সময়ে হঠাৎ বৃষ্টি এলে । নয়ত বাইরে যাবো কি করে ? শ্রাবণ আরও মজার । লাগাতার বৃষ্টির ফলে বাড়ির বাইরে বা স্কুলে কিংবা খেলার মাঠে , সর্বত্র জলের মাঝেই আনাগোনা । জুতো ডুবিয়ে ভারী করে বাড়ি ফেরা । সর্দি জ্বর । মিছরির ক্বাথ । বাবার শাসন । একবার রথের দিনে জেদ করে রথ টানছিলুম বৃষ্টিতেই । সে ছোট ছোট ফোঁটার বৃষ্টি ছিল । কিন্তু জোরে ঝেপে আসতেই আমার সব বন্ধুরা রথ কোলে তুলে দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে গেলো । কিন্তু আমি তো বীর মেয়ে ! পালাবো কেন ? ওরই মধ্যে টানতে থাকলুম রথ । ততক্ষণে রথের গায়ে ফুল কাটা রঙীন কাগজ চুপসে গিয়েছে । চারপাশের খোলা দেওয়াল দিয়ে বেগে ঢুকেছে জল । নিট ফল , জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রার রং ও গলতে শুরু করেছে । এবার চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে গেছে । আর দুঃখ বাড়িয়ে দিয়ে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে তিন মূর্তিই গলে গলে আরও ঠুঁটো । যেসব গুজিয়া জাতীয় মিষ্টি টিস্টি দেওয়া ছিল সেসবের কথা না তোলাই ভালো । ক্লাস থ্রির সেই রথযাত্রা আমার জীবনের শেষ রথযাত্রা । বাড়ি ঢুকে আমার ক্রন্দনরোল বাকি সকলের পিলে চমকে দিলেও মা সেবার আর ক্ষমা করেনি আমাকে । নিয়ম করে চান করে নিয়ে দেখি মা তিন মূর্তিকেই খবরের কাগজে মুড়ে তাকে তুলেছে । কাল নাকি ওদের বিসর্জন হবে । আর রথের গায়ের সমস্ত সাজসজ্জা নির্মম হাতে টেনে খুলে ফেলেছে । রথটাকে দেখাচ্ছে যেন সবে কাঠামো তৈরি হওয়া নতুন বাড়ি । সেদিন দুঃখে রাতের খাবার খাইনি । 

যতই বৃষ্টি মজার হোক না কেন আমি বড্ড ভয় পেতাম বাজ কে । বেশির ভাগ সময়ে শ্রাবণের কালো মেঘ স্তরের পর স্তর জমে এমন হত । বিদ্যুত চমকাত । আলোর ঝলকানির সঙ্গে কড়কড় করে বাজের আওয়াজ । বাবা তখন কাছে টেনে আমাকে বুকের মধ্যে চেপে রাখত । তখন মনে মনে জপ করতাম 'লেবুর পাতা করম চা , যা বৃষ্টি ধরে যা ' । শ্রাবণদিনে আমরা যেহেতু বেরোতে পারতাম না , তখন বাড়ির মধ্যেই ছোটাছুটি করে খেলতাম । না খেলতে পারলে পড়ায় মনই বসবেনা ! স্কুলবেলা যখন গড়িয়ে এসে কৈশোরের প্রায় শেষ , তখন এক শ্রাবণশেষে লাগাতার বৃষ্টি শুরু হলো । চলল বেশ কয়েকদিন । তখন বোধ হয় ভাদ্রও এসে গেছে । আস্তে আস্তে আমাদের একতলা বাড়ির উঠোন ডুবতে শুরু করল । রেডিওতে জরুরি ঘোষণা হতে থাকল যে চারিদিকে সব নদীর জল বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে । অতএব বাঁধের জল ছাড়া হবে । ফলে শহরে আরও জল ঢুকবে । প্রত্যেকে যেন দোতলায় শিফট করেন । ঘন ঘন বুলেটিন আসছে । এবার ক ইঞ্চি হলো । এবার ক ইঞ্চি । সত্যি বলতে ভয় তো দূরস্থান , বেশ একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার লাগছিল । একরাত্রে জল উঠে এলো দালানের দু ইঞ্চি নীচ পর্যন্ত । প্রথমে কষ্ট হলোনা । বাজার থেকে যথেষ্ট খাদ্য মজুত করা হয়েছে । কিন্তু ক্রমে মনে হতে লাগল এইযে দিনের পর দিন জলবন্দী , এ বড় বিরক্তিকর । জল স্বাধীনতা হরণ করেছে। ওদিকে সকলেই বাড়িতে। ছুটির মেজাজ । আমরা খবরে শুনছি বন্যা পরিস্থিতি । আবার একটা এমন ভয়ংকর নিম্নচাপ যদি আসে ? খবরে বলছে কোথায় কোথায় নাকি মানুষের ঘরবাড়ি সব ডুবে গেছে । উঁচু গাছের ডালে চেপে বসেছে কেউ কেউ । নৌকো নিয়ে সেনারা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে এনেছে । তারপর একদিন জল নামল । সেই প্রথম টের পেলাম জমা জলের তলায় কি ভীষণ ক্লেদ ! নাকে কাপড় দিতে হয় ! সেদিন বন্যাশেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি আমরা । পোষ্য কেটুও আর রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে অসুবিধে বোধ করছেনা । বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা , বৃষ্টি তো ভালো ! বর্ষা নাহলে ধান চাল হয়না । কিন্তু এমন বন্যা হলে কি হবে ? অনেক মানুষ নাকি ভেসে গিয়েছে মরে গিয়েছে ? বৃষ্টিকে কন্ট্রোল করা যায়না ? বাবা বেশ হতভম্ব । এ প্রশ্নের কি উত্তর হয় ? কিন্তু বাবা জানে মেয়েটা একটু কেমন যেন । তাই উত্তর দিল - জল খেপে গিয়েছিল রে । মানুষ জলকে বড় হতচ্ছেদ্দা করে । দেখিসনা কেমন কলের জল পড়েই যায় ? আর নদীর পাড়ে পাড়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি হয়েছে , গাছ কেটে দিয়েছে মানুষ । ব্যস , আর কি । নদীও রেগে গেছে । আগে যতটা জল সে ধরতে পারত এখন আর পারেনা । তারপর আমার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে কাটতে বাবা খুব স্নেহ নিয়ে বলে চলল - দোহাই বাবা । কাউক্কে নিয়ন্ত্রণ করার কথা কক্ষনো ভেবনা । জল তুমি মনে করছ নরম । কিন্তু দেখো সেই নরম জিনিসও খেপে গেলে কেমন হয় ! 

এখন বাবা আর নেই । কিন্তু আমি ভাবি । সত্যিই তো আমরা বাঁধ দিই , খাল কাটি , নদীকে নিয়ন্ত্রণ করি । আর পরিবেশের ওপর নানা অত্যাচারে সেও তিতিবিরক্ত হয়ে তার খামখেয়ালি বর্ষাকাল শুরু করে দিয়েছে । আমরা যত আষ্টেপৃষ্ঠে তাকে বাঁধতে যাই সে তত নরম থেকে ভীষণ হয়ে উঠছে । আষাঢ় শ্রাবণের সেই চিরাচরিত ভেজা দিন হারিয়ে যাচ্ছে জীবন থেকে ।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-