শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

রুমকি রায় দত্ত

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ |
Views:
ভ্রমণ ডায়েরির পাতা থেকে

ধনৌলটিঃ মুসৌরি চাম্বা রোডে প্রায় ২৪ – ৩০ কিলোমিটার দূরে একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের পথে ছুটতে লাগলো আমাদের বাস। মুসৌরির মাল রোডে আমাদের হোটেলের খুব কাছ থেকে এপথে প্রতিদিন টুরিস্ট বাস যায়। তথ্যটা আমরা হোটেল থেকেই পেয়েছিলাম। তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই স্নান টিফিন সেরে কেটে নিয়েছিলাম বাসের টিকিট। এইপথ মুসৌরি থেকে আরও বেশ উঁচুতে উঠে গেছে। সকাল ন’টায় যাত্রা শুরু হলো আমাদের। সরু পাহাড়ি রাস্তা। বাসের চাকার একহাত দূর থেকেই শুরু হয়েছে গভীর খাদ। পাহাড়ি পথে বাসে এই প্রথম। প্রতিটি বাঁকেই চুপচাপ দম বন্ধ করে থাকা। যত এগোতে লাগলাম উচ্চতা তত বাড়তে লাগলো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ধনৌলটির উচ্চতা প্রায় ৭,৫০০ ফুট। কিছুটা যাওয়ার পর ধনৌলটি থেকে প্রায় আধঘন্টা আগে থেকে শুরু হলো ভাঙাচোরা রাস্তা। একেই সরু এপথ তাতে ভাঙা ধীর গতিতে চলতে চলতে বাস ধনৌলটি ইকো পার্কের সামনে দিয়ে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এক নির্জন পাহাড়ের কোলে গিয়ে যখন দাঁড়ালো তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে বারোটা। 

আমাদের দেঢ় ঘন্টা সময় বেঁধে দেওয়া হলো। এখান থেকে ট্রেক করে প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তা পার করে পৌঁছাতে হবে সুরকান্ডা দেবীর মন্দিরে। রাফ সিমেন্টের ঢালাই রাস্তা এঁকে বেঁকে উপরে উঠে গিয়েছে। পথের শেষে পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে মাতা সুরকান্ডার মন্দির। কথিত যে, এখানে নাকি দেবী সতীর মাথার অংশ পড়ে। তাই এই স্থানকে দেবীপিঠের মত পবিত্র মানা হয়। বসে আমাদের সাথে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা মহিলাদের একটি ছোট্ট গ্রুপ এসেছিল। ওদের দলে তিনজন মাঝ বয়সের আর বাকি দুজন বিধবা মা-মেয়ে। বয়স ৮০ ও ৬০। অজানাকে দেখার আগ্রহে আমরা দুজন ওই পথে হেঁটেই উঠবো বলে ঠিক করলাম। দেখলাম অনেকেই খচ্চর ভাড়া নিয়েছে। বেশ খানিকটা পথ খুব তেজের সাথে উঠতে লাগলাম। ৫০০ কিমি হবে হয়তো তখন। কতটা পথ যেতে হবে না জেনেই চলা শুরু করেছি। ক্রমশ উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁফ ধরতে শুরু করলো। পায়ের বিভিন্ন পেশিতে টান। ঠিক তখন অনুভবটা মরুভূমিতে মরিচিকা দেখার মত। কিছুটা উঠেই ভাবছি আর কতটা। তখন ঠিক কতটা পথ উঠে এসেছি জানিনা। পথের বাঁকে একটা বসার জায়গা দেখে খানিক বসলাম। আর তখনই নিচের দিকে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে গেলাম। 

আমরা যে উচ্চতায় সেখান থেকে আমাদের বাসটা ঠিক দেশলাই বাক্সের মত দেখাচ্ছে। উপর থেকে নিচের পাহাড়ের প্রাকৃতিক শোভা সত্যিই অনন্য লাগে। আর কতটা পথ বাকি জানি না। তবে অনুভব করলাম এতটা আসার পর আর কিছুতেই পিছনে ফেরা চলে না। ঠিক তখনি পিছনের পথের দিকে তাকাতেই দেখলাম সেই ৬০- ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা – মেয়েও অসম্ভব ক্লেশ সহ্য করে উঠে এসেছে উপরে। মনে তীব্র জেদ নিয়ে এগিয়ে চললাম সামনের পথে। পথের ক্লান্তির শেষে দেখা মিললো মন্দিরের। মন্দির চাতালের চারপাশে তখনও পড়ে আছে বাসি বরফ। কিছুটা সময় দেবী মুর্তির দিকে তাকিয়ে থাকা। 

কথিত আছে দেবী সতীর খন্ডিত দেহের মুন্ডের অংশ এখানে পড়েছিল। সেই থেকেই এখানে সতী পূজিত হন ‘মা অম্বা’ নামে। ভারি হয়ে আসা নিঃশ্বাস অনেকটা হাল্কা হতেই আবার একই পথে নিচে নামা। ঢালের পথে পায়ে হেঁটে নামাটাও কিন্তু খুব একটা সহজ নয়। ঘড়িতে দুটো বেজে গেছে তখন। দীর্ঘ পথযাত্রায় পেটে ছুঁচোর ডন। সামনে ছোটো ছোটো দু- তিনটি খাবার দোকান। ম্যাগি, চাউ ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া যায় না। সামান্য চাউ ভক্ষণ করে এসে বসলাম গাড়িতে। এবার ফেরার পথে যাবো ইকোপার্কে। বাসে ফেরার পথে দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছালাম ইকোপার্কে। তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। সামনেই রয়েছে পাইন, ওক, বার্চ গাছে ঘেরা এক স্বর্গীয় উদ্যান। টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। যেদিকে তাকায় শুধু গাছ। এক মায়াবী আকর্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে যেন গাছের জগত থেকে। একটা পজেটিভ এনার্জি, কিছুক্ষণ আগেই দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি যেন শুষে নিচ্ছে প্রকৃতি। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া দেহ প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। দেখলাম, একটা বড় দোলনা টাঙানো, গিয়ে বসলাম দুজনে। গাছের ফাঁকদিয়ে ঠিকরে আসছে ম্লান সূর্যের আভা। জানান দিচ্ছে ফেরার সময় হলো। সামনেই দেখলাম ছোটো ছোটো কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি একটা সিঁড়ি বেশ কিছুটা উপরে উঠে গেছে, যার দু’পাশে গোল গোল কাঠের তৈরি রেলিং। দেখলাম বাসের যাত্রীরা একে একে গেট দিইয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরাও হাঁটতে লাগলাম ফেরার পথে। 

একরাশ সুন্দর মুহূর্ত বুকে নিয়ে ঠিক সন্ধ্যের মুখেই ফিরে এলাম মুসৌরি শহরে। আবার সন্ধ্যেটা ভরে উঠলো আলোর সমুদ্রে। সেই সমুদ্রে দৃষ্টি ভিজিয়ে, সন্ধ্যেটা মাল রোডে ঘুরতে লাগলাম দোকানে দোকানে। হরেক পসরা কিন্তু সবাইকে তো সঙ্গে নেওয়া সম্ভব নয়! কিছু কাঠের তৈরি জিনিস সংগ্রহে নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। ব্যাগ গোছাতে হবে।পরের দিন খুব সকালে যাত্রা করবো ঋষিকেশ- হরিদ্বার।

ক্রমশ ঃ 




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-