শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ |
Views:
এক মুঠো প্রলাপ
অনিন্দিতা গুপ্ত রায়, আমার কাছে কেবল কবি হিসেবে পরিচিত বললে ভুল হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রাখার পর পরই দূর থেকে দুর্দান্ত ছাত্রীটিকে ঘিরে একটি প্রশস্তি বলয়ের ওড়া উড়ি দেখেছি । তারপর মাঝে দীর্ঘ বিরতি এবং আবার তাঁকে ফিরে পাওয়া দুর্দান্ত কবি হিসেবে । সুতরাং তাঁর না বলা কথাগুলি জানার আগ্রহটা আমার বেশকিছুকালের। আর ‘শব্দের মিছিল’ এর ‘একমুঠো প্রলাপে’ তাঁর মুখোমুখি হবার সুযোগ পেয়ে তাঁকে একজন অনুরাগী হিসেবে ভালোবাসা এবং ‘শব্দের মিছিল’ কে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখি, এই প্ল্যাটফর্মটা আমায় দেবার জন্য, দূরকে নিকট করার সুযোগ করে দেবার জন্য। ব্যক্তিগত ভালোলাগার বাইরে গিয়ে আসি এবার কবির কথায়। আমায় কোন বিশেষণ খোঁজার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছেন তিনি, কারণ তাঁর তুলনা একমাত্র তিনিই । সুতরাং আমার কাজ কমে গেছে। সদ্য কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের নামাঙ্কিত পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি কথা বলেছেন খুল্লমখুল্লা। তা পাঠকদের কাছে বিস্তারিত পৌঁছে দিতে পেরে আমরা ধন্য । 

একজন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী এবং কবি যে অনুবাদ কবিতায় আগ্রহী হবে তা স্বাভাবিক । কিন্তু মায়া এঞ্জেলুই কেন ? কোন বিশেষ ইজমের প্রতিনিধি বলে নাকি নেহাত কাকতালীয় ?






দ্যাখো, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র বা কবি হিসেবেই শুধু না, পাঠক হিসেবেও আমি মনে করি অনুবাদ সাহিত্য অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি বিষয়। আমি মুলতঃ অনুবাদ করার সময় মূল টেক্সট থেকে করার চেষ্টা করি। আর বাংলা বাদ দিলে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় সেই প্রশিক্ষন বা জ্ঞান না থাকায় অন্য কোনও ভাষায় লেখার ইংরেজি অনুবাদ থেকেও ভাষান্তরে যাইনি এখনো। কোথাও যেন double shift from the text হয়ে যাওয়ার একটা আশংকা থাকে। তো, মায়া এঞ্জেল্যুই কেন? না কোনও বিশেষ ইজম এর প্রতিনিধি বা কাকতালীয় কোনটাই নয়। প্রথমতঃ আমার কাছে মায়া এঞ্জেল্যু এক আগুনের নাম, এক ফিনিক্স পাখি---যিনি তাঁর জীবনটাকে এমন জায়গা থেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ভাবে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর কবিতার থেকেও বেশি আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম ব্যক্তি মানুষটার প্রতি। দ্যাখো—একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি শৈশবে ধর্ষিত ও মানসিক আঘাতে পাঁচ বছর মূক হয়ে থেকে , নাবালিকা অবস্থায় সিংগল মাদারের জীবন বেছে নিয়ে যে লড়াই টা করেছেন, সফল হয়েছেন—তা শুধু একজন “অপর”এর লড়াই ই নয়, একজন প্রান্তিকের লড়াই। একথা ত অনস্বীকার্য যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটা যে মেয়েদের কথা লিখেছেন, তা বানানো নয়। নিজে বেঁচেছেন সেই জীবনটা। আর আসলে তো তিনি মানবতাবাদী। সাম্যবাদী। “আমি জানি খাঁচার পাখি কেন গান গায়” কবিতাটি এক মুক্তিসঙ্গীতের রূপ পেয়েছে। তাঁকে যখন পড়তে শুরু করি, তাঁর জীবনী ও লেখা, তাঁর অপেরা, বক্তব্য ইত্যাদি ইউটিউব ঘেঁটে শুনি---আমি গভীরভাবে নাড়া খেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল তাঁর এই কথাগুলো আমি পৌঁছে দিতে চাই অনেকের কাছে যাঁরা বাংলা ভাষায় পাঠে অভ্যস্ত। তাইই মায়া এঞ্জেল্যু। তিনি কোন ইজমের প্রতিনিধি সেটা আমার কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা তাঁর লড়াই ও দৃপ্ত প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। যা মানবতার পক্ষে। সাম্যের পক্ষে। আর তাঁর কবিতা সেগুলোকে উদ্‌যাপন করে।

কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত ভাল কবি তকমা ছাড়িয়ে নারীবাদী কবিও হয়ে উঠেছিলেন । তার নামাঙ্কিত পুরষ্কার পেলে মায়া এঞ্জেলুর কবিতা অনুবাদ করে । তুমিও কি কখনো এমন কোন তকমা পেতে চাইবে ?





কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার পাওয়াটা আমার কাছে অত্যন্ত বড়ো একটা স্বীকৃতি নানা দিক দিয়ে। ২৫ বছর একটানা লেখালেখি করে যাওয়ার সুবাদে যা যা সম্মান পেয়েছি সমস্তই আমার কাছে আদরণীয়। কিন্তু মল্লিকা’দিকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, মিশেছি, দীর্ঘ দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে বলেই জানি কবি মল্লিকা সেনগুপ্তকেও শুধু “নারীবাদী” তকমায় সেঁটে দেওয়াটা কতটা ভ্রান্তি। অবশ্যই মল্লিকাদি উইমেন রাইটস নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। রামায়নের নতুন পাঠ লেখার জন্য যে ভয়ানক কবিত্বশক্তি প্রয়োজন তাও তাঁর ছিল ততটাই যতটা “কবির বৌঠান” লেখার দক্ষতা। দ্যাখো, তিনি সমাজতত্ত্বের ছাত্রী। তাঁর মত করে অন্তর্ভেদী দৃষ্টির আলো ফেলেছেন তিনি সমাজের সেই কোনগুলো তে, যেগুলোতে পরিস্থিতির শিকার হয়ে মেয়েরা মুখ লুকিয়ে পালিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে বহুযুগ ধরে। কিন্তু তিনি কখনোই পুরুষের বিরুদ্ধে বলেননি, বলেছেন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। মায়া এঞ্জেল্যুও তাই। সেজন্যই এই স্বীকৃতি জরুরি আমার কাছে যে হয়ত কাজটা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে। প্রেরণা ত দেয়ই এই স্বীকৃতি। আমার কবিতা মেজাজ ও বিষয়ে মল্লিকাদির কবিতাভাবনা থেকে যোজন দূরত্বে। নারীবাদী তকমা আমি কবি হিসেবে চাইব না, কেউ নিশ্চয়ই দেবেনও না। সোচ্চারে মেয়েদের অসহায়তার বা মার খাওয়ার কথা ততটা কবিতায় বলিনা বলে। কিন্তু একজন নারীর যাপনটা আমার কবিতায় ধরা থাকে বলে আমি মনে করি। পুরুষালি কবিতা, মেয়েলি কবিতা কথাগুলো পছন্দ করিনা কারন সেগুলো পুরুষতন্ত্রের বানানো। কিন্তু ব্যবহৃত ইমেজ বা চিত্রকল্প অথবা অনুষঙ্গে মেয়েদের একান্ত যাপন তো আসবেই। তার ঋতুচক্র, তার সন্তানধারণ, তার প্রেমিককে গ্রহন, তার গর্ভজলের কল্লোল---এগুলো নানা সংকেত নিয়ে কবিতায় আসবেই একটি মেয়ের। আর এই উওম্যানহুড আমি উপভোগ করি। তার হেরে যাওয়া, প্রতারিত হওয়া বা নির্যাতিত হওয়াটা কিন্তু সমস্ত প্রান্তিক মানুষের সংগেই এক। যে পৃথিবীটা এই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বা আরো অন্যান্য লিঙ্গ নিরপেক্ষ, তার সবটাই কিন্তু প্রকাশিত হয় আসলে একজনের যাপন থেকে বেছে নেওয়া ডিকসন দিয়েই। তাই কোনও তকমায় আমি আগ্রহী নই। 

শিক্ষকতা সূত্রে ময়নাগুড়ির মত প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে আছ বহুদিন । কফিহাউস , নন্দন কালচার মিস কর ? নাকি ‘ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড’ সৃষ্টি গতি পায় ভাল ? 





শিক্ষকতা সূত্রে ময়নাগুড়ির মত প্রত্যন্ত এলাকায়---হ্যাঁ, ষোলো বছর হলো। এই চাকরির সূত্রেই ত ডুয়ার্সে আসা আমার আর এখানকার মানুষ আর প্রকৃতির নিবিড় অন্তরঙ্গতায় বাঁধা পড়ে থেকে যাওয়া। নয়ত আমার জন্ম, পড়াশুনা, বেড়ে ওটা সবই তো মালদহ শহরে। কলকাতার অনেকটা কাছে। সকল আত্মীয় পরিজনই গঙ্গার ওপারে। কলকাতা আমার খুব প্রিয় শহর। নন্দন, কফিহাউস মিস করিনা বললে ভুল হবে। কিন্তু কি জানো তো, মফস্বলের একটা নিজস্ব ছন্দ, নিজস্ব গন্ধ, নিজস্ব মেজাজ আছে না---সেটা আমায় বড্ডো টানে। স্কুল আসা যাওয়ার পথে হাটের মধ্যে দিয়ে যে জনজীবন, তিস্তা পেরোনর পথে আবছা কাঞ্চনজঙ্ঘা,নানা লোকায়ত আঙ্গিকে সাধারন মানুষের বেঁচে থাকা, মন ভালো না লাগলেই লাটাগুড়ির জঙ্গলে নদীর চরে বা সল্টপিটের নির্জনতায় বসে সূর্যাস্ত দেখার বিলাসিতা আর অজস্র জোনাকি মেখে ঘরে ফেরা--- বর্ষার টানা সাতদিন ধরে চলা বৃষ্টি----এগুলো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এখন নেটদুনিয়ায় ইচ্ছে হলেই অনেক কিছু হাতের কাছে পাওয়া যায়, ভালো নাটক বা ফিল্ম। এমনকি আড্ডাও। ঠিকই বলেছ---ফার ফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউড আমাকে নিরাময় দেয়। সৃষ্টি গতি পায় বলব না, ব্যক্তি আমি’কে উপশম দেয়। আর কলকাতা তো বছরে অনেকবার যাওয়া হয়ই। বইমেলা বা কফিহাউস বা কলেজস্ট্রিট ছেড়ে আসতে তখন আবার মুখ ভারি করি। আসলে আমার নিজের নাগরিক স্মার্টনেস ও গতি আর মফস্বঃলি লাবন্য ও আলসেমি দুইই বড়ো পছন্দের। বৈপরীত্য থাকেনা স্বভাবে? এরকমই। আমার লেখাগুলোও বোধহয় তাই। কোনোটাতেই একটানা ভাল্লাগেনা। তবে মিলিয়ে মিশিয়ে থাকতে ভালো লাগে। তাই কলকাতা প্রপারে ফ্ল্যাট কিনব নাকি জংগলের নিবিড়ে একটা খামারবাড়ি এই দ্বিধায় তুলকালাম দোলায়িত থাকি। একজন মানুষ এখন আঞ্চলিক হয়েও আন্তর্জাতিক হতে পারে বলেই বোধহয় আফশোস নেই। 

তোমার সহকর্মী ও ছাত্রীরা তোমার সৃষ্টিকে এবং সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে । শুধুমাত্র কিশোরদের জন্য কোন কবিতাসংগ্রহ করার কথা ভেবেছ কখনো ?





আমার স্কুল মানে আমার কর্মস্থল খুব প্রিয় জায়গা আমার। একদম প্রথম জেনারেসন লার্নাররা আসে নিস্পাপ মুখগুলো নিয়ে। ডুয়ার্সে সেই অর্থে কোনো আত্মীয় পরিজন ছিলনা আমার। সহকর্মীরা আমার পরিবারের মানুষ এখন। যদিও লেখার জগত একেবারেই আলাদা রাখি আমি। কিন্তু রসদ অনেক পাই এখানে লেখার মত। আমার বিপদে দুঃখে সুখে অসুখে সহকর্মী আর ছাত্রীরাই আমার সর্বস্ব। অনেক নামকরা কোনো কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুলে না পড়ানোর ইচ্ছে বা স্বপ্ন না পুরণের একদা আফশোস আর নেই তাই। ওরা নিজেরাই প্ল্যান করে যেভাবে আমাকে আদর ভালোবাসা স্বীকৃতি দিয়ে শুধু আমার জন্য একটি অনুষ্ঠান করেছে মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার পাওয়ায়, তা আমার বিরাট প্রাপ্তি। পুরস্কারের অর্থমূল্যটুকু আমি স্কুলের সেই মেয়েদের জন্যই দিয়েছি যারা অর্থের অভাবে ফর্ম ভরতে পারেনা বা অন্য সমস্যায় পড়ে। কিন্তু ওদের ভালোবাসার বিনিময়ে এ কিছুই নয়। কিশোরদের জন্য কবিতাসংগ্রহ করার কথা কখনো ভাবিনি। তবে ছড়া বা ছোটগল্প আছে কিছু, সেগুলো নিয়ে হয়ত কখনো সংগ্রহ হতে পারে। যদি আমি আলসেমিকে জয় করতে পারি । কিন্তু মেয়েদের কবিতা পাঠের অভ্যেস করাই আমি, তা শুধু নিজের লেখা নয়। যেকোনো পছন্দের কবিতাই পড়াই। 



তোমার প্রকাশিত গ্রন্থ যতদূর জানি নয়টি । সেগুলি কোন কোন বিষয়ে যদি বিশদে বল ...





আমার প্রকাশিত কবিতার বই এখনো অবধি আট’টি। অনুবাদ গ্রন্থটি ধরলে ন’টি।

প্রথম প্রকাশিত বই “হাওয়াদের গানগল্প” ২০০১ সালে প্রকাশিত। এটি ৯০ থেকে, মানে নিতান্ত স্কুলজীবন থেকে শুরু হওয়া লেখা থেকে পরের দশ বছর---অর্থাৎ ২০০০ পর্যন্ত অনেক ধরনের কবিতার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া কবিতা। তাতে কৈশোরের যেমনটি হয়---প্রেম, বিদ্রোহ, বিচলন, অস্থিরতা, নানা বিষয়ভিত্তিক কিছু লেখাও আছে। নব্বইএর কবিদের যে অস্থিরতাগুলো ছিল, সেগুলোই। পরের বই “চৌকাঠে দাঁড়ানো মেঘ”---সবে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, সংসার ও মা হওয়া, নিজের জায়গা ছেড়ে অন্য শহরে আস্তানা—এসব বিষয়ে আছে। পরপর প্রকাশিত---“আমিও ব্যলেরিণা”, “শ্রাবণজল আমাকে নাও”, টাইটল সং, তিনটি বইয়েই মানুষ, প্রকৃতি, সম্পর্ক, সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক যাবতীয় কিছু যেমন আছে, তেমন ভাষাও ক্রমাগত পাল্টেছে। কখনো সাংকেতিক কখনো বিমূর্ত কখনো সরাসরি আমি ছুঁতে চেয়েছি নৈর্বক্তিকতাকেই। খুব বেশি বিষয়কেন্দ্রিক যেমন আমার লেখা নয়, তেমন নয় উচ্চকিত পাঠেরও। বহুমাত্রিক সম্ভাবনার কবিতা হয়ত বেশিই পছন্দ আমার। পাঠের ক্ষেত্রেও। তা চলনে সহজ বা আপাত জটিল যাই হোক না কেন। “ডাকনাম জলের নিবিড়ে” আমার ডাকনামের শহরের স্মৃতি আর জলশহরে মানে জলপাইগুড়িতে দিনযাপনের বাস্তবতার দুই অধ্যায় একসঙ্গে ধরে রাখা। এই বইটির সাংকেতিকতা ও ভাষাপ্রয়োগ আগেরগুলি থেকে আলাদা। পরের বই “তেমন জরুরি কিছু নয়”। ২০১৩ সালে পায়ের তলায় একটি কালো বিন্দুর হঠাত জন্ম ও বৃদ্ধি আমাকে আচমকা টেনে নিয়ে গেল টাটা ক্যানসার হাসপাতালে। সেখানে ২১ দিন ভর্তি, অপারেশন, উদ্বেগ, যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা, রোগমুক্তি, লড়াই---জীবন-মৃত্যুর ঘনিষ্টতা আবিষ্কার। তারপর দীর্ঘ দিন বিছানাবন্দী ও চলাচলহীন জীবন আমাকে এক ধাক্কায় অন্য মানুষ করে দিল। সেই আইসিইউ তে বন্দী আমি যে লেখাগুলি লিখতে শুরু করেছিলাম---একবছর ধরে নতুন করে হাঁটা শেখা অবধি চলেছে সেই কাজ। বহু লেখা শুধু নিজের জন্য রেখে দিয়েছি। বহু লেখা আর দ্বিতীয়বার পরার সাহস নেই বলে ছিঁড়ে ফেলেছি আর নিজেকে নিংড়ে লেখা ৫০/৬০ টি কবিতা বেছে কবিতার বই “তেমন জরুরি কিছু নয়” তৈরী হয়েছে। আমার সবচেয়ে জরুরি উপলদ্ধির সময়টুকু এতে রাখা। পরের বছর বাবাকে হারালাম। এই আছি আর এই নেই হয়ে যাওয়ার দ্বন্দে পরের বই “আছি”। তারপরও চলছে লেখা। এইই আর কি---! 

তোমার কবিতাকে তুমি পুনরাধুনিক , উত্তরাধুনিক এই জাতীয় কোন তকমা দাও কি ? কবিতা লিখতে গিয়ে কোনটা ভাব , সচেতন নির্মাণ না অটোম্যাটিক রাইটিং ? 





না, কবিতাকে কোনও তকমায় বাঁধায় আমি বিশ্বাসী না, আগেই বলেছি। আগ্রহী ছাত্রী হিসেবে আমি তত্ত্বের বই পড়তে ভালোবাসি যথেষ্টই। কিন্তু মনে করিনা নিজের কবিতা কে কোনও তত্ত্বের ছকে লিখতে। এমনও অনেক উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে আছে, বাংলা সাহিত্যে তো বটেই যে লেখকেরা লিখেছেন---তত্বে ফেলে লিখবেন-- না ভেবেই, না জেনেই। পরে আমরা তাদের লেখাগুলো সেইসব তকমার নিচে বসিয়ে বিচার করেছি। কিছু কিছু লক্ষন দেখে। তা সময়ের চিহ্ন লেখায় থাকবেই। তার জন্য নিজেকে তকমা দিতে আগ্রহী নই। তবে কেউ নিজেকে দিলেও আপত্তি নেই,যার যার ব্যক্তিগত প্রকরণ। সচেতন রাইটিং এ অবশ্যই বিশ্বাসী। কিন্তু হঠাত পাওয়া কবিতার লাইন ঘুমের ভেতর থেকে কখনো ধাক্কা মারেনা এমন কবি নেই কোথাও। কিন্তু সেই পংক্তি কখনই কবিতা নয়। তাকে সচেতনভাবে শরীর দিতে হয় বৈকি ! লালন দিতে হয়। 



এখন একটা ছায়াযুদ্ধ বাজারে খুব চলছে । সহজ কবিতা আন্দোলন বনাম ভালো কবিতা। এই লড়াই কতটা জরুরী ?




সহজ কবিতা বনাম ভালো কবিতা আন্দোলন ব্যাপারটা আমার ঠিক বোধগম্য নয় গো! কারন আমি শুধু ভালোলাগা কবিতায় বিশ্বাস করি। খুব সহজ করে বলাই হোক বা গভীর বহুমাত্রিক সাংকেতিকতায়---আমাকে স্পর্শ করাটা জরুরি। একইসঙ্গে সহজ আর ভালো কবিতা হওয়ায় সমস্যা নেই তো! সহজ কথার ভেতর যে গভীরতা থাকে অনেক সময় ইচ্ছাকৃত দুর্বোধ্যতায় তাকে তো হারিয়ে যেতেই দেখি। সাংকেতিকতা মানেই দুর্বোধ্যতা নয় কিন্তু। তাই লড়াইটা দরকারী নয় আমার কাছে। আমি ইদানীং অপেক্ষাকৃত সহজ করেই লিখছি আবার। তাতে যেন যা পড়ছি আসলে খুঁজে পাচ্ছি আরো বেশি---এইটা থাকে, এরকমই ভাবি। ওই যে বল্লাম—একঘেয়ে কিছুই ভালো লাগেনা। কাব্যভাষা যতই পাল্টাক, একজন কবির সিগনেচারটা যেন থাকে সবেতেই।

একজন প্রতিষ্ঠিত কবি হিসেবে পাঠকের মূল্যায়ন কিভাবে হয় ? পাঠক চাহিদা কি লেখাকে কোনভাবে প্রভাবিত করে ?





আমি পাঠকের মূল্যায়ন না করলেও নিজেকে পাঠক হিসেবে দেখি আমি ঠিক কি চাই কবিতার কাছে, কবির কাছে। যা আমি লিখতে চাই, তা হয়ত অন্য কেউ বড়ো সুন্দরভাবে লিখছে---তখনই আমি নির্ভেজাল পাঠকের জায়গাটা দেখতে পাই। বুঁদ করে রাখে যে কবিতা, মেধা আর হৃদয় দুইই কাঁপায় বা যেকোনও একটিকেই তুমুল আন্দোলিত করে ---সে কবিতার পাঠককেও কিন্তু যথেষ্ট সংবেদনশীল ও কবিতাভাষায় শিক্ষিত হতে হবে। সকলের জন্য সব কবিতা নয়---আমি মনে করি। কোনও কবির সব কবিতাই সব পাঠকের প্রিয় হতে পারেনা। আমার লেখাকে পাঠক প্রভাবিত করতেই পারেন যদি তিনি নিরপেক্ষ, গঠনমূলক ও আমার কবিতাশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হোন। অন্য কবিদের কথা জানিনা ভাই তাঁরা পাঠক দ্বারা প্রভাবিত হবেন কিনা। তবে পাঠকের জন্যই তো কবিতা। কিন্তু আমি কাকে পাঠক পেয়ে খুশি সেটাও জরুরি। 

বাণিজ্যিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশ হলেই লিটিলম্যাগের সম্পাদকরা বাজারী লেখক বলে ব্যঙ্গ করেন । বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রকাশিত সব লেখাই কি ফেলে দেবার মত ?





আমি নিজেও বানিজ্যিক পত্রিকায় লিখে থাকি, লিখেছি। এই ব্যঙ্গ আজকের নয়। ঐ যে বললাম কবিতা ভালোলাগার কিনা সেটাই বিচার্য। সব লিটল ম্যাগাজিনের সব কবিতাও কি মনে রাখার মত? কবিতার মানটা আমার মত করে তো আমি করেই নিই। সেটা যেখানে পাবো, সেটাই পড়ব। নিজের মত করেই লিখব, পত্রিকা বিচার করে না। “বাজারী” বলে গালি দেওয়ার দলে আমি নেই। 





কবির কি কোণ ঘরানা হওয়া উচিত ? বিশুদ্ধ কবি বলে কিছু হয় ? 





এই এই—এটা বলার আমি কে গো? প্রত্যেক কবি তার নিজস্ব ঘরানা তৈরী করে নেন। বিশুদ্ধ কবি ব্যাপারটাও খুব গোলমেলে। অবিমিশ্র বিশুদ্ধতা বিজ্ঞাপন ছাড়া আর কোথায়ই বা, বল? “প্রকৃত”, “বিশুদ্ধ”, “সত্যিকারের” এই শব্দগুলোই জাজমেন্টাল আর আপেক্ষিক। না গো---তেমন কিছু জানিনা আমি। কোন কবিতা আমার কাছে জরুরি, আমার প্রিয়, আমাকে স্পর্শ করার---তার কোনো সার্বজনীন বিশুদ্ধতা নেই।





Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-