শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

পৃথা রায় চৌধুরী

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ |
Views:
শরীরী-অ
সকাল হতে না হতেই গায়ে পড়া শুরু। সারাদিন বিরমহীন ফস্টিনস্টি চলবে। চলবেই, সূর্যের তেজের সাথে ছায়া ছায়া গাছেদের ঢলানিগিরি শুরু। বাছবিচার নেই, রাস্তা, ছেঁড়াফাটা বুড়ি, কালুয়া কুত্তা, অলকাদির পুকুরঘাটে খোলা পায়ের গোছ। এসব সবাই দেখে না।

দত্তবাড়ির খড়খড়ির ফাঁক কাকের চোখে মিশে থাকে। সামনের নতুন ফ্ল্যাটে নতুন চারা। সন্ধানী চোখ ধারে খুঁজে নেয় ধারবাকি খাতার মাসকাবারি। মাসেরা হাত ধরাধরি করে খাতায় বসে পেট চালাবার ইজারা দেয়।

সরকারী ইস্কুলে মেয়েরা শাড়ী, মেয়েরা ক্লাস এইট, মেয়েরা শাড়ির সাথে জুতো মোজা হনহন। মেয়েগুলো রোগারোগা পালক। পালক কুড়োবার নেশায় চিত্তরঞ্জন বয়েজের সেকেলে গেঁয়ো গেঁয়ো নামের মিছিল।

কলার তোলা, শার্টের গোঁজ খোলা সাইকেলদের কাছে চাইনিজ ঝলকানি রিংটোন। রবার্ট ব্রুসেরা গলি গলি, তস্য গলি।

সেতুর নাম বিকেল চারটে। টিউশান পড়ার নাম, আমি রানি তুই রাজা, আব তো আজা। ফুচকা নয় চুড়মুড়। এবার চারটে নম্বরের জন্য ফেল করেছি... তাতে কি, সময়ের নাম পরের বার।

সন্ধে নামতে ছায়াগাছেদের ঢলাঢলি শেষ। শহুরে ফ্ল্যাটে শাঁখ বাজে না। পাড়ায় পাড়ায় বাবা লক্ষ্মীদের ফেরা।

বিলিতির দোকান আশকারায় ভরা। আগামীকাল কি ড্রাই ডে? তেড়ে বৃষ্টি এলো, আর সিনেমা সিনেমা খুপরিগুলোয় পাঁকাল মাছেদের ভিড় জমে গেল। এখানের রাস্তায় হাম্বারা হাঁটে না। পয়সা খোলাম হয়ে উড়ে আসছে। পাঁকের গন্ধে মাতোয়ারা নিশিগন্ধা।

রিক্সাদেরও ছেলেমেয়েরা রাস্তায় বসে নামতা মুখস্থ করে। ওপরে আরামকেদারায় বসে জার্মান কফিতে হাল্কা হাল্কা চুমুক মেরে খিদের আর্দ্রতা লিখি, হাঘরের রাস্তাঘুম লিখি, দুএকটা সস্তা খিস্তি... দয়ার সাগর হই। কাঠি তৈরি, চলে এসো বৈরি। ডিনারে টিবেটান ডিলাইট।

জ্যোৎস্না দেখা আজকাল লুকিয়ে। ওসব ন্যাকামি কেউ দেখে ফেললেই মানইজ্জত হাওয়াই শার্টের পেঁজা কলার।

বাবার ঘেমো ছেড়ে ফেলা জামা চড়িয়ে বাবার কায়দায় মেয়ে বাবারই স্কুটারে দাঁড়িয়ে মুখে স্কুটার চালিয়ে সটান জীবনের পথে। মা হাসে, দেখো দেখো মেয়ের কাণ্ড। মেয়ে মেয়ে মেয়ে, পালা। তুই যা করবি, তাই কাণ্ড।

গাছেদের কাণ্ডে কতো প্রেম খোদাই হয়ে থাকে। প্রেমিক প্রেমিকারা একে অপরের চুপিচুপি প্রেমেদের সাথে সংসার পাতে।

পাতে পাতে পড়তে থাকে কমবেশি সুস্বাদু বকেয়াদের ফিরিস্তি। আর ইস্তিরি করা জামাকাপড়েরা সকাল সকাল ফস্টিনস্টিদের দেখেও না দেখে ছুটতে থাকে বিরতিহীন অন্ধগলি ধরে। রাস্তার আশেপাশে চোখের কোনায় হঠাৎ হঠাৎ ছিটকে এসে লাগে ছিন্নভিন্ন অনেক কিছু। বারুদ বা রক্তের আঁশটে এলাকাতেও নির্বিকার থাকার নাম হয়ে যায় ছায়া... ছায়া...।

ছায়া তোর বাড়ি কোথায়? ছায়া তুই সাবান মাখিস? ছায়া তোর কবিতা লেখার খাতায় হিসেব লিখিস? ছায়া তুই হিসেবের সাথে নিকেশও লিখিস? সব শেষে যোগফলে পাকাস গণ্ডগোল। আর তার প্রহর গুনেগুনে রাত চলাচল করে র্যাখম্পে, বিল্লিচলন! তাতে কি একটুও ভয় পায় ওই পুঁচকে টুইটটুইট সবুজ গ্রিলে? তার বেখাপ্পা তরোয়াল লেজ নাচিয়ে এপাশ ওপাশ। দেওয়ালে শুরু হয় সূর্যের মাতব্বরি। মাতব্বরি বৈকি, ওপারের সুপুরি গাছের পাতাগুলো এপারের দেওয়ালে এসে ম্যালেরিয়ায় ভোগে, পুকুরের ছায়ায় ডুব দিয়ে স্নান সেরে নিতে বলে একা চড়ুই।

চড়ুইগুলো ইদানিং মোমবাতি মিছিলে যাবার হুমকি দিতে শিখেছে। বলেছে মোবাইল থেকে শেকড়ে ফিরতে। নাহলে, নাহক পালকের ছড়াছড়ি দেখে হেসে কুপোকাত হয় ব্যালকনির কালচে মর্চে গ্রিলেরা। আর ওখান থেকে কার অঙ্কের মাস্টারমশাই চিল্লিয়ে ওঠে, “মাথা ভর্তি গোবর, তোর...”। এই গালিচা, ওই গালিচা ঘুরতে ঘুরতে মোবাইলের টাওয়ারগুলো একসাথে গলাগলি কাঠগড়ায়। চল চল আদালত, চল চল শামলা... আচ্ছা, ঘাম হচ্ছে কি প্রচণ্ড? ওদের বাড়ির ছাদে তোয়ালে শুকোচ্ছে মেয়েলি। পুরুষেরা ভেসে তার কামড়ে বাতাস আটকে বলে দিচ্ছে, এখানেই মৌরসিপাট্টা। ওই বাগানে নাকি গঙ্গাফড়িঙের চাষ হয় আজকাল?

পরিচয়পত্রের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে তুলসিপাতাদের সাথে ষড়যন্ত্রে নিম ফুলেদের দৌরাত্ম্য। ইন্দ্রের সভায় কে নেচেছিলো, তা নিয়ে জোরদার শোরগোল। তাতে কিরে সখি? তুই তো ছিলি না। অমন প্যাঁচামার্কা মুখে ওখানে ঢুকতে দেবে কে রে? তবে তোর ওড়নার কোনো একদিন নিরুদ্দেশ হওয়া সাজে। খোঁজ খোঁজ খোঁজ... গ্রাম ওলটপালট। হেই দেখ, হেই দেখ, নিলাজ মেয়েছেলে, স্বভাবচরিত্তির ভালো ছিলো নাকো। ঠিক হইচে, বেশ হইচে। পড়ার ভুত ঘুচে গেচে। হুই দেখ, হুই দেখ, বাপ মা কাঁদে। বিহানবেলায় মোমের বড়ো তেজ। ছুঁচ সুতো ছাড়া সেলাই শিকেচিলি না? কাল করবি, কাল...।

রঙিন জলে সাদাকালো ভিড়। সেপিয়া গুলো আজকাল চলে না। অকারণ কোনো থুৎনির ভাঁজে কাঁপও ভাসে না। দুয়োরে দুয়োরে অপেক্ষারত ভাতের থালা হাতে মায়েরা। ইজরায়েল লিখি, গাজা লিখি, কিন্তু বিশ্বকাপটা জার্মানি নিয়ে গেলো, হায় হায় উথলাই। পোষাচ্ছে কি পোষাচ্ছে না, জানা নেই, তবু বিভিন্ন হ্যাঙ্গারে ভালো থাকা আর তস্য ভালো থাকারা ঝোলে। বাঁচতে বাঁচতে বাছতে থাকে অষ্টম আশ্চর্য। শেকড়ের টানে যত রস উঠে এসেছিলো উঠোন জুড়ে, সবাই এখন পরদেশি। তাদেরও নানান তাঁবেদার। তাঁবেদারি হাতে হেমলক। আআআআহ! বাচ্চাদের সামনে থালায় পরিবেশন করে না, চোরপকেটে রাখা থাক ঘাম জবজব।

ঘেমে নেয়ে একসা। কালোয়াতির টিকিট চাই। বিদ্গধ প্রমাণ, কি গাইছে ছাই বুঝি না। নাকে নাকে মুখের চরম বিকৃতির সাথে সাথে মাথা দোলানো চলছে বকনা বাছুরের মতো। কিকালচার, আহা! সামনের দোকানটায় স্টিমড মোমো দারুণ, কালোয়াতির সাথে পেটের কালোয়াতি চলেছে, শেষ হলে বাঁচি। বউটা বড়ো বেশি বোঝে, মালদার শ্বশুর দেখতে গিয়ে এখন গিটকিরিবাণ গিলে গিলে হজমিগুলির প্রয়োজন দিন দিন বেড়ে চলেছে। ঝিমঝিম লাগার মাঝে মনে হয়,দশ মাসের লাফালাফি সব বৃথা।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-