শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ | |
Views:
যা হারিয়ে যায়
‘যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে রইবো কত আর’ ।

সত্যিই তো, যা হারিয়ে যায়, সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে তাকে কে আর আগলে রাখতে চায়! চাইলেও তা আগলে রাখা যায় না । তবুও থেকে যায় । থেকে যায় আমাদের স্মৃতিতে, কাউকে বা স্মৃতিকাতর করে । ইট,কাঠ, লোহার কিছু ঐতিহ্যভবনকে আগলে রাখার চেষ্টা হয় । রক্ষণের কাম্য দেখভাল হয়তো হয় না, তবুও আগলে রাখার চেষ্টাটা তৃপ্তি দেয় বৈকি। অবশ্য কাদের জন্যই বা আগলে রাখা ! যদি আমাদের ঐতিহ্য বা ইতিহাসবোধের অবশেষ কিছু না থাকে । ভাষাচার্য সুকুমার সেনের বর্ধমানের অত বড় বাড়িটা কেমন বেমক্কা ঝলমলে অলঙ্কারের শোরুম হয়ে গেল ! সে কথা থাক । আমাদের ভাষাটাই যখন উচ্ছন্নে যাবার পথে তখন ভাষাচার্যের ভবনটা হারিয়ে গেলে কার কি ?

একটা গানের কলি মনে পড়ে ‘স্মৃতি শুধু বেদনার’ । স্মৃতি কিছু বেদনাকে ধরে রাখে ঠিকই, কিন্তু কত আনন্দ যে জড়িয়ে থাকে তার মধ্যে, আর ইতিহাস যেন পরম মমতায় জড়িয়ে থাকে সেইসব স্মৃতির মধ্যে ! কে না জানে জীব ও জড় জগতের তাবৎ সৃষ্টি মধ্যেই তার ধ্বংশের বীজও লুকিয়ে থাকে । হারিয়ে যাওয়া মানে তো ধ্বংসই, আর ফিরে আসে না । ফিরে আসেনা বলেই তো স্মৃতিতে সাজানো থাকে পরতে পরতে । 

কেউবা হারিয়ে যায় নতুনতর বন্দোবস্তকে যায়গা করে দিতে, কেউবা সরে যেতে বাধ্য হয় প্রযুক্তির অগ্রগতিকে মেনে নিয়ে । নিমন্ত্রণ বাড়িতে মাছ, মাংস, রসগোল্লার বালতি কিংবা দইয়ের হাড়ি হাতে কোমরে গামছা জড়ানো ছেলেরা আর ফিরে আসবেনা কিন্তু সেইসব দিনের স্মৃতি ফিকে হবার নয়, ফিরে ফিরে আসে বারবার । হারিয়ে গেছে বিয়ে বাড়ির নহবতখানার সানাই । সেও আর ফিরবে না । 

স্মৃতিতে সদাই পিছুটান, টেনে নিয়ে যায় পেছনে, ইতিহাসের কাছে । আর এই পিছুটানের উপাদান হল বিস্ময় । হারিয়ে যাওয়া জিনিসের প্রতি মনের পরতে পরতে জমে থাকা স্মৃতির অনেকটাই তার সঙ্গে লেগে থাকা বিস্ময় । ১৯০০/১৯০২ নাগাদ এসেছিল দম দেওয়া কলের গান বা গ্রামফোন আর গ্রামফোন রেকর্ড তারপর মাত্র একশো বছরের মধ্যে নানান বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গালার চাকতির গ্রামফোন রেকর্ড থেকে পৌছে গিয়েছি মাইক্রো চিপসে । সেই দম দেওয়া কলের গানে রেকর্ডে গান শোনার মধ্যে ছিল বিস্ময়, তাই সেই স্মৃতি একশো বছরেও মুছে যায় না । মাইক্রচিপসে গান শোনায় সে বিস্ময় নেই । আসলে বিজ্ঞানের অগ্রগতি, তার নব নব প্রবর্তন আর আমাদের বিস্মত করে না ।

কবি পূর্নেন্দু পত্রীর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি মনে পড়ে -

“স্মৃতি কি আমারও আছে ?

স্মৃতি কি গুছিয়ে রাখা আছে

বইয়ের তাকের মত,

লং প্লেইং রেকর্ড-ক্যাসেটে

যে-রকম সুসংবদ্ধ নথীভুক্ত

থাকে গান, আলাপচারীতা” ? ( স্মৃতি বড় উচ্ছৃঙ্খল –পুর্ণেন্দু পত্রী )

অনেক স্মৃতি নিশ্চন্তে থরে থরে আলমারির তাকের মত সাজিয়ে রাখা যায় যার মধ্যে তার নাম ‘চিঠি’ । সেই চিঠিও প্রায় হারিয়ে গেছে । চিঠি হারিয়ে গেছে কথাটা বলা হয়তো একটু ভুল । সে আছে অন্য চেহারায়, নানান চেহারায় । আসলে চিঠি লেখার মানুষই আর নেই, হারিয়ে গেছে চিঠি লেখার মানুষ । ‘চিঠি’ শব্দটাকেই যেন খেয়ে ফেলেছে প্রযুক্তি, শুধু রয়ে গেছে আমাদের রঙ্গীণ স্মৃতি । চিঠি নেই তাই এমন কবিতা –গানই রচিত হবে কি করে ! মনে পড়ে কৈশোরে শোনা তুলসীদাস ছায়াছবির গান -

‘লিখিনু যে লিপিখানি প্রিয়তমারে

সঞ্চিত কত ব্যথা কত মধু ভালোবাসা

নারিনু পাঠাতে হায় স্মরণপারে...’

কিংবা জগন্ময় মিত্র গীত গান ‘চিঠি’ ।

চিঠি লেখা মানুষের প্রাচীনতম প্রবৃত্তি । সেই প্রবৃত্তি যে শেষ হয়ে গেছে তেমন নয় । হাতে লেখা চিঠি দেওয়া বা পাওয়ার মধ্যে যে তৃপ্তি, যে রোমাঞ্চ হারিয়ে গেছে সেটা । ভাবতে ইচ্ছে করে তখন যদি বৈদ্যুতিন প্রযুক্তি ইমেইলের প্রচলন থাকতো, তাহলে কি রবীন্দ্রনাথের পত্রসাহিত্য কিংবা জওহরলাল নেহেরুর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ আমরা পেতাম ? 

হাতেলেখা চিঠি নেই, হারিয়ে গেছে লাল ডাকবাক্স । ডাকঘরগুলো হয়ে যাচ্ছে টাকা লেনদেনের ব্যাঙ্ক । নির্জন পথে ঝুমঝুম ঘন্টা বাজিয়ে ছুটে চলা ‘রানার’ এখনও বেঁচে আছে সুকান্তর কবিতায়, হেমন্তের গানে । চিঠি বিলি করা মানুষটিকে ঘিরে আমাদের কতই না স্মৃতি, সাহিত্য-সঙ্গীত-সিনেমায় কতই না উজ্বল হয়ে আছেন তারা ! সেই কিশোরবেলায় কে না চোখে বিস্ময় নিয়ে ছুটে গেছি সাইকেলে ঘন্টা বাজিয়ে আসা ডাক বিলিকরা মানুষটির কাছে । সদ্যবিবাহিতা তরুণী জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা, ডাক বিলি করা সেই লোকটির জন্য ! চিঠি হারিয়ে গেলেও তারা হারিয়ে যান নি, বেঁচে আছেন, থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে, রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্করদের গল্পে, সত্যজিতের সিনেমায় ।

আসলে বিজ্ঞান ও নব নব প্রবর্তন ব্যক্তি বা সামাজিক জীবনকে করে দিয়েছে যান্ত্রিক । আত্মীয়তা, আন্তরিকতা, মেলামেশার আনন্দটার দখল নিয়েছে অর্থ। তবুও জীবনের যান্ত্রিকতায় এইসব ‘হারানিধি’র জন্য অন্তরের বেদনা বোধ ততটা করি না, ক্ষণিকের বিষন্নতা হয়তো থাকে। কিন্তু ভালোবাসা হারিয়ে গেলে বাকি থাকে কি ? জীবনের যান্ত্রিকতায় আজ যে অমূল্য বোধটিকে হারিয়ে ফেলছি তা হল ভালোবাসা । ভালোবাসা হারিয়ে গেলে আলগা হয় পারিবারিক বাঁধন, সমাজের বন্ধন । ভালোবাসা – তাকে আগলে রাখতে হয়, কিন্তু পারছি না। । একুশ শতকের প্রায় এক চচুর্থাংশ পার করে যদি হাহাকার করি ‘ভালোবাসা’ আবার ফিরে এসো । আসবে কি ? কি উত্তর পাবো জানি না ।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-