শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

মৌমিতা ঘোষ

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ |
Views:
গাছেদের ও ছায়া চাই
মেঘ আছে ,বৃষ্টি নেই, কেননা গাছ নেই । গাছেদের আজ আপনার ছায়া চাই। কিছু বক্তব্য তাই আপনাদের কাছে....

ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে পেয়ারা গাছের অল্প ছায়ায় ছিল আমাদের খেলনাবাটির সংসার। তেলাকুচো ফল নিয়ে চলত রান্নাবান্না। জবা পাতার কুটনো কেটে তরকারি। বাড়ির, পাশের বাড়ির পেয়ারা, কাঁঠাল, বাতাবি লেবু গাছের প্রতি ছিল বিশেষ আকর্ষণ। তখনও পাশের বাড়িতে কাঁঠাল ভাঙলে লোকে এমনিই হাজির হয়ে যেত গন্ধে। "দে দেহি চাইর পাচখান কোয়া " কতবার বলতে শুনেছি ঠাকুমা। তখনও আমরা প্রতিবেশী নামক এক পরম সুহৃদকে চিনতাম। তখনও আমাদের পাড়ার ছেলেগুলো ব্যাঙ্গালোর কিম্বা আমেরিকা চলে যায় নি। আমরা একটা পাড়ায় অনেক ঠাকুমা, দাদু, কাকা , কাকীমা, জ্যেঠু দের ছায়ায় , আমগাছের তলায় টেপফ্রক পরে খেলতে খেলতে বড় হয়েছি।আমাদের মায়েরা তখনও সামনের বাড়ির কাকুদের থেকে আমাদের লুকিয়ে রাখার কারণ খুঁজে পাননি।

আমাদের জীবন অনেক সহজ ছিল কেননা আমাদের জীবনে প্রকৃতির পরশ ছিল। আমরা ফুল তুলতাম ভোরবেলায়, তা দিয়ে মালা গাঁথতাম। সেই একসাথে কাকভোরে ফুল তোলার সঙ্গে সঙ্গে গাছেদের সঙ্গে, ফুলেদের সঙ্গে, প্রজাপতি, নানারকম পোকাদের সঙ্গে একটা সখ্যতা ছিল। পৃথিবী টাকে, তার স্নেহময়ী রূপটাকে চিনতাম ভ্রমরের মত এগাছ তলা ,ও গাছতলা, এ ফুল ও ফুল ঘুরে। গাছের তলায় ক্লান্ত হয়ে পথিক ঘুমিয়ে পড়েছে এমন অনুসঙ্গ নানা গল্পে এসেছে। এখন আর আসেনা। কেননা ওই গল্পটার আর কোনো relevance নেই। আমি যে পাড়াটায় থাকি, ট্যাক্সি, অটো বা রিক্সা র জন্য অপেক্ষা করতে হলে ঠা ঠা রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আপনাকে। একটুও ছায়া পাবেন না। রাস্তার ধারে একটা গাছ ও নেই। মূল রাস্তা রাসবিহারী-বাইপাস কানেক্টরে মুখ্যমন্ত্রী র ছবি দেওয়া ও ভুল বানানে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দর বাণী ওগরানো কিছু শেড দেওয়া বাসস্টপ পাবেন, পাবেন না একটু ঠান্ডা ছায়া যা গাছ ই দিতে পারে। আমরা নিজেদেরকে প্রকৃতি থেকে যত সরিয়েছি তত অসুস্থ হয়েছি,নৃশংস হয়েছি, একা হয়েছি। 

কখনো পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আপনার কারো উপরে রাগ হয়? একটা ঘন আমবাগানে দাঁড়িয়ে? আমি হলফ করে বলতে পারি এক দুজন বিকৃতমস্তিষ্কের লোক ছাড়া কারো হয়না। পুকুর ঘেরা একটা বাগান বাড়িতে পৌছলে বড় -বুড়োরাও কী সহজ ছেলেমানুষীতে মাতে! তখনও আমরা বুঝিনা আমরা আসলে গাছেদের কাছে এসে ভালো থাকি। গাছ আমাদের সহিষ্ণু হতে শেখায়। আর আমরা ছেলেমেয়েদের শুধু ফোটোসিন্থেসিস মুখস্থ করাই আর ভাবি বড় হয়ে ওর নিজের জীবন মুড়ে নিতে পারবে এসিতে। আর কুড়ি তলা , পঞ্চাশ তলা বিল্ডিং গুলোর সাচ্ছন্দ্য একটা ভূমিকম্পে কুপোকাত। মাটি আলগা হয়ে আসছে। আপনার আমার সব প্রতিষ্ঠা শিকড় পাচ্ছেনা। আপনার বায়োলোজিকাল ক্লক টা যতদিন গাছেদের সঙ্গে ,পাখিদের সঙ্গে এক ই ভাবে ঘুরত তখন আপনার বন্ধু খোঁজার জন্য ফেসবুকের দরকার পড়েনি। এই আমিই গাছেদের সঙ্গে দিব্য গল্প করতাম ছোটবেলায় । একটা ইউক্যালিপটাস গাছ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল । সেই গাছটা যখন কেটে দেওয়া হয় আমি দুদিন ধরে কেঁদেছিলাম। আপনার বাচ্চার মধ্যে কি এই মমত্ব তৈরী হয়েছে? কোনকিছুর প্রতি? আপনার প্রতি?

ছায়া হারিয়ে যাচ্ছে। দারুণ রোদে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়া ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছেনা মানুষ।সে ছায়াও ছোট হচ্ছে ক্রমাগত।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-