শুক্রবার, জুন ৩০, ২০১৭

ইন্দ্রাণী সমাদ্দার

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৭ |
Views:
ইন্দ্রাণী সমাদ্দার
প্রথম প্রথম ভাবতে ছিলাম, তা আপদ গেছে বাঁচা গেছে। সারাটা দিন গেল সোয়ামিটার তো দেখা নাই। বিয়ার পর থেকে মরদটা তো আমার জন্যি ভালো কিছু করলনি। খালি মার, মার আর মার। বছর বছর বেটি বিয়াইছি বলে সে কী মার। যেন বেটী শুধু আমার কপাল দোষে। কত মন্দিরে দন্ডী কেটেছি, মানত করেছি। চন্দ্রচূড় মন্দির থেকে মা কল্যাণেশ্বরী মন্দির, আবার মা মেলাবুড়ি মন্দির থেকে ঘাগর পুরি মন্দির। কিছুই তো বাদ রাখি নাই। আর যদি হলই বেটী তাতে কি! বেটী দুটা তো তাও আমার সাথে বাবুদের বাড়ি কামিনগিরি করে। ফিরে এসে আমার হাতে হাতে ঘরের কাজ করে, কোলের দুটোকেও সামলায়। আর বেটা হলে তো বাপের সঙ্গে তাড়ি খেয়ে সারাদিন পরে থাকত। তা ভগবান যা করেছে বেশ করেছে। সাঁঝের তো দেরী নাই কি যে করি। ঠাহর করতে পারতেছি না। ঘর থেকে পথে নামলাম। একে তাকে শুধালাম কেউ দেখেছে কিনা। রামরতনের মা শুধালো, “কেনে বউ কোথাকে গেছে মরদ তোর?” জানলে কী আর তোমারে শুধাই গো মাসি, বলে আমি হাঁটা লাগাই। পাড়ার পান-বিড়ির দোকান, চায়ের দোকান কাউকেই তো আর শুধাতে বাকি রাখলুম না। 

আঁধার হতে তো আর বেশী দেরী নাই। ঘরের দিকে চললুম। ঘরে দুটো বেটী কোলের দুটোকে নিয়ে না জানি কি করে সামলাচ্ছে। ঘরে গিয়া দুটো ভাতে ভাত ফুটাইলুম। ঘরের ভিতরখান বড় শান্ত আজ। চিৎকার নাই, অশান্তি নাই, গালাগালি নাই, অভ্যস্ত হাতের মার নাই। নিজে তো আর লেখাপড়া শিখলুম না। সুযোগ হয়নি, আর ইচ্ছেও যে খুব ছিল তা না। মায়ের কোলেরটার আগেরটা আমি। নাম পুনি। বাপের কথা মনে নাই। লোকের বাড়ি কাজে লেগেছি কবে থেকে তাও মনে নাই। তবে হ্যাঁ, মনে আছে সেই দিদিমণি বৌদি জোর করে ইশকুল নিয়ে যেত। সন্ধে বেলায় যখন নিজের মেয়েদের পড়াতো তখন আমারেও নিয়ে বসত। আমার তখন কথায় কথায় হাসি ঝরে পড়ত। বৌদি কে বললুম, আমি তোমার বাড়ি সারাদিন থাকব, কিন্তু যদি ইস্কুলে নিয়ে যাও, তাহলে আমি পালাবো। আমার মা বলে, থাক না বউ তোমার বাড়ি। যতদিন না বিয়া দিতে পারব তোমার কাছে থাকলে নিশ্চিন্তি থাকবে আমার মনে। বিয়ার আগে ভালোই ছিলাম। রোজগারের টাকায় আজ ১০ টাকার মালা পরশু ফুচকা খাওয়া। মাঝে মাঝে জোর করে বৌদির কাছে পড়তে বসা। একদিন জানলাম মা বিয়া ঠিক করল। গায়ের লোক বলে জামাই তো রাজপুত্তুর। চোখ গুলোও নাকি কোন খানেদের মত দেখতে। আমি খুশি। মাও খুশি। শুধু দিদিমনি বৌদি জানতে চেয়েছিল, ছেলে কী করে? তাতে মা আমতা আমতা করে বলে,”আরে বউ যখন যেমন কাজ পায় তখন তেমন করে। জোয়ান মরদ ঘরে বসে তো আর খাবেনি। ভগবান বিয়া দিচ্ছে সেই ব্যাবস্থা করবে” বৌদি গম্ভীর হয়ে গেছিল কিন্তু মুখে রা কাটেনি। বিয়ে হয়ে চলে যাওয়ার আগের কটা দিন হাসিতে খুশিতে কেটে গেল। কে জানত আমার জীবনের সব হাসি এখানেই গড়িয়ে গেল।

বিয়ার পর উঠতে বসতে খালি গালি আর মার। লোকের বাড়ি কাজে লাগলাম। লোকের বাড়ি হতে মাইনে দেরীতে পেলে মার, কাজ শেষ করে দেরীতে বাসায় ফিরলেও চড়, লাথি আবার বাড়ির কাজে একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই মার। মা একদিন এসেছিল। তারে শুধালাম, “আমি টাকা আনব, ঘরের কাজ করব তো বিয়া দিয়েছিলিস কিস্কে রে?” মা বলে,”পোড়া কপাল আমার। মনে বড় সাধ হল বেটিগুলোকে পড়াব। বাপ মরার পর মা কামিনগিরি করেছে। আমি বিয়ার আগে ও পরে বাবুদের বাড়ি কামিনগিরি করছি, কিন্তু আমার মিয়াগুলো করবেনি। কিন্তু এই পোড়া মুখোটার কি ঝগড়া কেন বড় মিয়া গুলো কে ইশকুলে পাঠাচ্ছি। গেরামে গেরামে এসে ঘরে ঘরে দিদিমণিরা বলে গেছেন ছিলা-মিয়াগুলোকে ইস্কুল পাঠাইতে। শুধু পড়াবেকই না, সঙ্গে আবার কী একখান, মিড ডে না কি একখান নাম। মোদ্দা কথা বাসন মাজতে হবেনি, ঘর মুছতে হবেনি, কাজের বাড়ির বৌদিদের কাছে কাজ ভুল হলে বা দেরী করে গেলে গাল খেতে হবেনি। শুধু পড়াশুনা করলেই খাওয়া, ভাবা যায়? আমি ও শুধাব ভাবছিলুম আমারে আর কোলের দুটোরে পড়তে লিবে কিনা তাহলে একবেলা খাওয়াও হয়ে যেত। কিন্তু তা নাকি হয় না। তাও কিছুদিন হল মেয়ে দুটোকে কাজে লাগিয়েছি। ক্লাস ফোর অব্দি দুটো বেটি পড়াশুনা করল, কিন্তু ওদের বাপ কিছুতেই আর পড়তে দিবেক নাই। বেশী পড়লে নাকি বিয়া হবেক নাই। না হয় না হবেক। আর বছর ইচ্ছা আছে ইসুকুলের দিদিমণিকে বলে ভর্তি করব ইশকুলে।”

ইশ কি যে আকাশ পাতাল … এদিকে রাত মনে হয় ভালোই হয়েছে ঠাহর হচ্ছে। একদম কোলেরটা ঘুমে কাদা আর বাকিগুলো খেলছে আর প্রাণ খুলে হিহি করছে। ঘরের মানুষ আজ ঘরে নাই সে দিক পানে কারোর হুশ নাই। আসলে ঘরের মানুষ ঘরের ছিলনি কোন দিন। বেটা হয়ে আসে নাই, তাই বেটিরাও কেউ বাপের প্রাপ্য আদর পায় নাই। আমারও মানুষটার থেকে পাওয়া মার, রাগ আর ভয়। এই সব আগডুম-বাগডুম ভাবতে ভাবতে খাওয়া মিটিয়ে সব শুয়ে পড়ি। গত কাল রাতেও মরদটা শুদ্ধু সবাই খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়েছিলাম। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙ্গে দেখি দরজা খোলা, মানুষটা নাই। ভাবছিলাম রোজের মত আজ ও গেছে প্রাতঃকৃত সারতে। কিন্তু সারা দিন কেটে রাত এসে নাড়া দিল দরজায়, কিন্তু মানুষটার দেখা নাই। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি।

ঘুম ভাঙ্গে দরজার আওয়াজে। ধড়পর করে উঠে বসি। বাইরের আকাশটা কালো চাদরে ঢাকা। কিন্তু কে যে দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। মনে বড় ডর হয়। দিনকাল শুনি খারাপ। দূর থেকে আওয়াজটা চেনা চেনাই ঠাহর হচ্ছে। বড় বেটিটা দেখি আমারে বলে, “ওমা দরজায় কড়া নাড়াচ্ছে খুলবিনি। এবার না খুললে দরজাটা ভেঙ্গেই যাবে মনে হয়। আর তুই এত ভয় পাচ্ছিস কিস্কে? আমরা সবাই আছি তো ভয় কেনে… খোল দিখিনি দরজাটা।” দরজাটা খুলেই দেখি সামনে গাঁয়ের সব মানুষ দাঁড়িয়ে। সব্বার মুখগুলো থম থম করতেছে। শুধাব কী হয়েছে কিন্তু মুখ দিয়ে বাক্যি বেরচ্ছে না। আমাকে অবাক করে বড় বিটিটা বলে ওঠে, “কী হয়েছে গো মানিক জ্যাঠা, তোমরা সব্বাই এখানে কেনে? কী হয়েছে?” পিছন থেকে মেজ কাকি বলে ওঠে, “তোরা মা আর বিটিরা মনকে শক্ত করে উঠোনে আয় দিখিনি।”

পেছন পেছন দেখি একটা চাদরে মুড়িয়ে গাঁয়ের ছিলেগুলা কাকে যেন উঠানে শুয়াইল। যে শুয়ে আছে তাকেই যে দেখছি – সেটা কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। শুনা গেল ভোর বেলা পুরানো খাদানের পিছনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় পিছন থেকে লরি এসে ধাক্কা। লরিটা পালিয়ে না গিয়ে সঙ্গে করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়ত বেঁচেও যেত, কিন্তু আপনি বাঁচলে বাপের নাম। তাই ফিরেও নাকি তাকায়নি ড্রাইভার। যেভাবে কোনও দিন মারার পর ফিরেও তাকায়নি পুনির দিকে তাঁর মরদ। পুনির মনের কোনে ভিড় করছে কত কত অনুভুতিরা। চোখ আবছা হয়ে আসছে। আজ অব্ধি ভাবতুম, একদিন মানুষটা শুধরে যাবে কিন্তু আজ থেকে সে ভাবনার অবসান হল.. 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-