বুধবার, জুন ১৪, ২০১৭

অদ্রীশ বিশ্বাস স্মরণে

শব্দের মিছিল | জুন ১৪, ২০১৭ | |
Views:
অদ্রীশ বিশ্বাস
অদ্রীশ বিশ্বাস। জন্ম ১১ই সেপ্টেম্বর ১৯৬৮ শ্রীরামপুরে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে  স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণে শিক্ষকতা করেছেন সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল ও রায়গঞ্জ সুরেন্দ্রনাথ মহাবিদ্যালয়ে। একসময় চার্লস ওয়ালেশ ফেলোশিপ পেয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্যারিস, রোম, ফ্লোরেন্স ও ভেনিসে। সিধান্তে কঠিন অথচ আবেগপ্রবণ, অভিমানী মানুষটির সাহিত্যের নানান শাখায় অবাধ বিচরণ ও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অগাধ পড়াশোনা, প্রকাশ বার বার বিষ্মিত করেছে শুভানুধ্যায়ু ও পাঠককুল কে।

তিনি একজন প্রকৃত শিক্ষক - লেখকের দায়বদ্ধতা থেকে,  জগৎ ও সমকালীন প্রেক্ষাপটে বাস্তব জীবনের নানা অনুষঙ্গ তাঁর গভীর অনুধ্যানের মধ্য দিয়ে সাহিত্যে উপস্থাপিত করেছেন। পরিশীলিত কাব্যিক বাণীভঙ্গি, শব্দচয়নে রুচিশীলতা, জীবন ও জগৎকে দেখার নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি, কাব্যের গঠন শৈলীতে ঋজুতা তাকে সত্যাদর্শ একজন প্রাজ্ঞ সাহিত্যিকের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে।

সাহিত্যিক গবেষক মানুষটির  বিশেষ দিনের পত্রিকা, ডাকটিকিট জমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিখ্যাত মনীষী, ব্যক্তিত্বের নিজের হাতের লেখা ( অটোগ্রাফ ) সংগ্রহ করে রাখা ছিল একটা শখ। অসংখ্য বই, ঐতিহাসিক ডাকটিকিট, দৈনিক পত্রিকা, পত্রিকা, ছবি তাঁর নিজ বাড়ির সংগ্রহশালায়।

জীবদ্দশায় তাঁর শেষ উপন্যাস ‘লীলাবতী’ র প্রকাশ পূর্বে, বলেছিলেন – ‘ আমার বা আমাদের যুগ্মতার বিশাল বড় অটোগ্রাফ সংগ্রহ আছে, যাদের সই নতুন প্রজন্ম দেখেইনি। এগুলো সংরক্ষণ হওয়া দরকার। আমি বিখ্যাত মানুষগুলো সম্পর্কে লিখবো, সঙ্গে অটোগ্রাফ সংগ্রহর চমৎকার সব ইতিহাস। বাঁদিকের পাতায় ফ্যাকসিমিলি তে অটোগ্রাফ আর ডানদিকের পাতায় লেখা। দ্বায়িত্ব নিয়ে বলছি, চমকে যাবেন সংগ্রহ দেখে। দ্রুত সংগৃহীত হওয়া দরকার। নাহলে হারিয়ে যাবে এইটা। কে আছেন বন্ধু, ছাপবেন যত্ন করে? বাংলা ভাষায় এমন বই প্রথম বের হবে’।

১৮৬৮ সালে বাঙালি মেয়ের প্রথম বাংলা ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘মনোত্তমা’ ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে উল্লেখযোগ্য তাঁর এমনই একটি দুর্লভ সংগ্রহ। পরবর্তীতে তাঁর সম্পাদনায় বইটি আনন্দ পাবলিশার্স থেকে পুনঃ মুদ্রণ হয়।

নিরন্তর পথ চলায় মানবিক প্রত্যয় এবং সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্য সচেতনতায় - দুই বাংলার নানা মুদ্রিত পত্র পত্রিকা সহ অনলাইন ম্যাগাজিনে তাঁর  লেখা অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আলোচনা  নিয়মিত প্রকাশিত। উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থ -  বটতলার বই (দু’খন্ড ) বাঙালি ও বটতলা ( দু’খন্ড ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প সংগ্রহ, জাল ( বাঙালির গত একশো বছরের জাল সম্পর্কিত সদর্থক আলোচনা )।  পেয়েছেন একমাত্র পুরুস্কার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি প্রদত্ত।

তাঁর সর্বশেষ উপন্যাস ‘লীলাবতী’ একটা সাধারণ মেয়ের কাহিনী। যে বিশ্বাস করতো, স্বপ্নকে অত বড় করে দেখো না যাতে বিফল হয়। সে একটা উদবাস্তু মেয়ে যে পূর্ববঙ্গ থেকে তার প্রিয় আমগাছের আঁটি নিয়ে ইন্ডিয়াতে আসে। লীলাবতীর দর্শন – কাঁদার সময় কাঁদবে, হাসার সময় হাসবে, বেশী ওভারস্মার্ট হবার দরকার নেই। একটা কলোনির গড়ে ওঠা আর তার ছোট সমাজ – ইতিহাসে জড়িয়ে থাকা যেন একটা প্রতীক হয়ে ওঠে সে। লীলাবতী কাঁথা সেলাই করে মেয়ে সন্তানের আশায়, তার মেয়েলি ডিজাইনে ভরা কাঁথায় শুয়ে স্বপ্নভঙ্গের চার ছেলে বড় হয়। কলোনিতে লীলাবতী হয়ে ওঠে শেষ কথা। এই ব্যক্তিত্বের বদল তার অর্জন। লীলাবতী এক সময় চন্দ্রাহত হয়। তারপর দীর্ঘদিন নজরুলের মত কথাহীনভাবে কাটিয়ে দেয়। লীলাবতী একটা প্রেমের কাহিনী। লীলাবতী অদ্রীশের মায়ের অশ্রসজল উপন্যাস ।

সাহিত্যিক, গবেষক এই দীপ্ত মানুষটি ছিলেন যুগ ও শিল্পসচেতনমুখী মানুষ। ভাব ভাষা বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্বে তাঁর প্রবন্ধ, উপন্যাস, চিঠি একদিকে যেমন মানবিকতাবোধে উজ্জ্বল অন্যদিকে তেমনি অস্থির সমাজ ব্যবস্থায় নানা অসংগতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ট প্রতিবাদ স্বরূপ নিঃসন্দেহে। দুঃসাহসী, অকপট, আনপ্রেডিক্টেবল। যা মনে করেছেন তাই লিখেছেন। শুধু বিতর্কিত নয়, একই সঙ্গে গভীর, মননশীল, বুদ্ধিদীপ্ত। একটি আনসেনসেরড ও আনএডিটেড অদ্রীশ বিশ্বাস-এর প্রকাশিত চিঠি  -

August 22, 2013 at 10:15am
প্রিয় সমীরদা,
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি ( ১৫ জুন ১৯৬৪ তারিখে আইওয়া থেকে ) যা সম্প্রতি 'শহর' পত্রিকার অক্টোবর-নভেম্বর ২০১২ সংখ্যায়  প্রকাশিত হয়েছে, তার একটি প্রতিলিপি আপনাকে পাঠালাম । চিঠি ছাপা হওয়ার পর মলয়দা একদিন মুম্বাই থেকে ফোন করেছিলেন । আমাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হয় । আমি সেই চিঠির মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু হাংরি আন্দোলন ও মলয় রায়চৌধুরী বিষয়ে ব্যক্তিগত মতামত, যা হাংরি এবং মলয়-বিরোধী দেখতে পাই । অনেকেই দেখেছেন, মলয়দাও দেখেছেন । আমার মনে হয় এগুলো যেহেতু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির সূত্রে একতরফা ভাবে প্রকাশিত, তাই আপনাদের মতামত ও পিছনের কারণগুলো সামনে আসা দরকার । বিশেষভাবে মলয়দার । যদিও এই ধরনের মতামত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আমরা আগেও পড়েছি হাংরি নিয়ে, মলয়দাকে নিয়ে । অনেক সময় গোটা হাংরি আন্দোলনের একমাত্র ধারক হিসাবে সুনীলবাবু বারবার তাই মলয়দাকে টার্গেট করেন । এটা বোঝা যায় যে হাংরির মূল থিংক ট্যাঙ্ক কে, কাকে আক্রমণ করলে কী হবে, অতএব মলয় রায়চৌধুরীকে আক্রমণ করো । হয়তো সুনীলবাবু মলয় রায়চৌধুরীকেই শুধু শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বলে মনে করতেন আর তাই বারবার তাঁকে আক্রমণের একটা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যাতে মলয়--হাংরি আন্দোলনের চিন্তার ধারক, তাকে ধ্বসিয়ে দিলে, নস্যাৎ করলে, অন্যরা বাঁচবে না, থাকবে না । এটা হাংরি বিষয়ে আমার অবজারভেশন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আক্রমণ  প্রসঙ্গে । কিন্তু আমরা জানি, উনি হাংরি মামলায় হাংরির পক্ষে মতামত জানিয়েছিলেন । সেটা তাঁর আদর্শবোধ নাকি সাহিত্যিক রাজনীতি, সেটাও আজ নতুন জেনারেশনের জানা দরকার । নতুন জেনারেশনের জানা দরকার, মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এত আপত্তি কেন ; শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছাড়া আর কী কী কারণে মলয়দাকে এই খেলায় বাদ দিতে চাইতেন তিনি, বা দ্বিচারিতা করতেন, অপছন্দ করতেন, নাম কাটতেন, সে-সব এখন পরিষ্কার হওয়া দরকার । তাই যদি সেই চিঠির একটা আলোচনা আপনারা করেন, তা সাহিত্যিক মূল্যায়নের প্রকৃত ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করবে । এটা হওয়া জরুরি । আমরা জানি মেইনস্ট্রিম তার মতো করে ইতিহাস রচনা করে এবং সেটাকেই একমাত্র ইতিহাস বলে । সেটা একমাত্র সত্য নয়, সেটা এবার সামনে আসা দরকার । ইতিহাস মুখ তুলে তাকাক ।

অদ্রীশ বিশ্বাস
৩/১ ডি, নস্করপাড়া লেন
কলকাতা - ৩১


পরিপূর্ণ শৈল্পিক সত্তার অধিকারী নির্লোভ ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষটির অন্তরে লালিত ছিল একটি স্বপ্নময় পৃথিবী যেখানে থাকবে না কোনো হানাহানি, হিংসা-দ্বেষ, থাকবে শুধু অনাবিল ভালোবাসার বন্ধনে অফুরন্ত শান্তির সুখের প্রস্রবণ ধারা। নীতি নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অটল ছিলেন। আপস করেননি কোন অন্যায়ে।

জীবদ্দশায়  উপেক্ষা, অবহেলা, অত্যাচারে ব্যথিত, মর্মাহত, আহত যে মানুষটি বার বার সোচ্চার হয়েছেন প্রকাশ্যে, সম্মুখীন হয়েছেন সমাজ সচেতন প্রেমী মানুষে ... সেই নির্ভীক প্রতিবাদী মানুষের  নীরব প্রস্থান ...  বিদ্ধ করে আমাদের কর্তব্যপরায়ণ বোধশক্তি কে ।

প্রণাম তোমায় -





Facebook Comments
2 Gmail Comments

২টি মন্তব্য:

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-