শুক্রবার, মে ২৬, ২০১৭

সমীর ভাদুড়ী

শব্দের মিছিল | মে ২৬, ২০১৭ |
Views:
সঙ্গীত সাধনায় নজরুল


বহু বছর আগেই বুদ্ধদেব বসু নজরুল সম্পর্কে একটা কথা বলেছিলেন:”His best songs are his best poems”.সংক্ষিপ্ত হলেও মন্তব্যটায় কিন্ত সামগ্রিকতার ব্যঞ্জনা রয়েছে নিঃসন্দেহে। নজরুল গানের সুরবৈচিত্র নিয়ে আলোচনার পরিমান কম না হলেও, তাঁর লিরিকধর্ম এবং শব্দনির্ভর ভাব-রূপ-চিএকল্প ইত্যাদির বিশ্লেষন হয়েছে খুব সামান্যই। অবশ্যই নজরুলের লেখা তিন হাজারেরও বেশি গানের প্রতিটির পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে কাব্যরূপ বিশ্লেষন করা সম্ভব ও নয়; প্রত্যাশিত ও নয়। বাংলা সংগীত জগতে রবীন্দ্র সংগীতের পাশাপাশি উচ্চারিত হয় নজরুল সংগীতের নামটি। রবীন্দ্র সঙ্গীত যতটা মানুষের মধ্যে প্রসারলাভ করেছে বা মানুষ চর্চা করছে সেই ক্ষেত্রে নজরুলগীতি তুলনামূলক ভাবে খুব কম মানুষের মধ্যে প্রসার এবং চর্চা দেখা যায়। 

শুধুমাত্র কয়েকজন সংগীত শিল্পী এবং আবৃত্তিকারের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই বাঙ্গালি সমাজে আজও স্থান করে নিয়েছে কাজী নজরুল রচিত অনবদ্য সংগীত, কবিতাগুলি। সংগীতের ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন বিরল ও বিষ্ময়কর এক প্রতিভা। তাঁর সকল গীতিকবিতার পাশাপাশি কালোত্তীর্ন সংগীত নৈপুন্য অনস্বীকার্য। অগ্রজ রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল বা রজনীকান্ত সেনও ছিলেন সমকালীন সফল গীতিকার ও সুরস্রস্টা।  নজরুল ইসলাম শুধু সংগীতের সফল রূপকার ই নন তিনি সংগীতের গবেষকও বটে। 

কাজী নজরুল ইসলাম ধ্রুপদী রাগ রাগিনীর সংমিশ্রনে বাংলা গানকে ফিরিয়ে দিয়েছেন অনির্বচনীয় মাধুর্য। জীবনের প্রারম্ভে কবি মূ্লত রবীন্দ্রনাথের গানই গাইতেন। তারপর তিনি প্রকাশ্য সভায় নিজের গান গাইতে শুরূ করলেন। প্রথম জীবনে তিনি স্বদেশী গান, প্রেম সংগীত ,হাসির গান, ছড়া বা নাটকের গান লিখতে শুরূ করেন। সংগীত বিষয়ক ব্যপক চর্চা ও সাধনার গুনে ক্রমশ নজরুল ইসলাম তখন হয়ে উঠেছিলেন সমকালীন সংগীত ভাবনার অন্যতম প্রধান পুরুষ। নজরুলের সংগীত ভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর সংগীতে অসংখ্য রাগ-রাগিনী, তাল ও ছন্দের অন্তহীন বৈচিত্র। নজরুলসৃস্ট রাগগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:- উদাসী ভৈরব, অরূন ভৈরব, দোলনচাঁপা, দেবযানী, মিণাক্ষী, নীলাম্বরী্ ইত্যাদি। তেমনি নজরুলসৃস্ট তাল গুলি হল:- প্রিয়াছন্দ, মন্দাকিনীছন্দ, স্বাগতাছন্দ, মনিমালাছন্দ, নবনন্দন তাল। 

মাত্র একদশকের মধ্যে তিনি প্রেমের গান,ও স্বদেশ তথা আন্তর্জাতিক ভাবনা বিষয়ক গানের পাশাপাশি বিরহের গান, হাসির গান, মার্চিং সং, ইসলামি গান, শ্যামা সঙ্গীত, ভজন, গজল, ঠুংরী গান সহ অন্যান্য গান রচনা করে গেছেন। ফলে তাঁর গানের সংখ্যাই দাড়িয়ে গেল প্রায় তিনহাজারের ও বেশী। একজন গীতিকারের এতগান সংখ্যায় সর্বাধিক। কাজী নজরুলের বিভিন্ন পর্যায়ের গানগুলির মধ্যে প্রকৃতি নানাভাবে প্রকাশিত। কখনো প্রকৃতি এসেছে তার রূপের ডালি নিয়ে, কখনো এসেছে কবি-প্রিয়ার সজ্জার উপকরন হয়ে, ক্ষনে ক্ষনে মুগ্ধ করেছে কবিকে সঙ্গে আমাদেরকে। কবির চোখে প্রকৃতি যখন লাস্যময়ী চঞ্চলা তখন তিনি নিশীথ প্রকৃতিকে সাজিয়েছেন এমন এক অপরূপা নারীর সাজে, যে ঝিল্লির নূপুর বাজিয়ে এলোচুলে নৃত্য করে যার নাচের তালে নাচন লাগে তরূলতা ও ফুলে ,হাওয়ায় লাগে নাচের ছোঁয়া, নদীর জলে ওঠে মৃদঙ্গের তাল। কবি তাঁর আপন অনুভূতির সঙ্গে সমগ্র মানবমনের অনুভূতির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেছেন প্রকৃতিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ভক্তি সঙ্গীতগুলিকে কয়েকটি শ্রেনীতে ভাগ করেছেন। তাঁর আরাধ্য কখনো ঐশ্বর্যশালী দেব, কখনো প্রেমসাধনার আরাধ্য দেবতা, কখনো কন্যারূপিনী মহাশক্তি আবার কখনো বা আমিনা মায়ের কোল আলো করা রফিক। কাজী নজরুলের  গানে প্রচলিত পুরাণের রীতিকে অনুসরন করেই এসেছে রামায়নের কথা, এসেছে বৈষ্ণবপদাবলীর প্রভাবিত পঞ্চরস অনুসারী কৃষ্ণপ্রেমকথা। নজরুল তাঁর লো্কগীতিগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন - পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, ঝুমু্র, খেমটা, বাউল, বেদের গান, লেটোর গান, ছাদপেটানোর গান প্রভৃতি। নজরুলের অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক বিভাগগুলির মধ্যে হাসির গান বিশেষ বৈচিত্রের দাবী রাখে। গানগুলি সংখ্যায় বিস্তর না হলেও, কবি স্বল্প সংখ্যক হাসির গানের মধ্য দিয়েই প্রকাশ করেছেন তাঁর সুতীখ্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, অনুভূতি শক্তিকে। নজরুল ইসলাম রচিত ‘চন্দ্রবিন্দু’ এবং ‘সুরসঙ্গীত’গ্রন্থ দুটিতেই হাসির গানের সম্ভার পরিবেশিত হয়েছে। 

নজরুল ইসলাম ছিলেন সুরের পুজারী এবং সাধক। ঊনবিংশ শতকে বাংলাদেশের গান মোটামোটিভাবে উত্তর ভারতের এবং মার্গ সঙ্গীতের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। কাব্য সঙ্গীত যদিও এই সময়ে অনুপস্থিত ছিলো না তবু তা যেন ততোখানি আভিজাত্য লাভ করেনি। রবীন্দ্রনাথ ই বুঝতে পেরেছিলেন কেবল মার্গ সঙ্গীতের গন্ডীতে আবদ্ধ থাকলে বাংলা গান প্রাণ পাবেনা। তাই একদিকে কাব্য সঙ্গীতের ধারা এবং অপরদিকে দেশী ও বিদেশী সুরের উদার অভ্যর্থনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বাংলা গানের ক্ষেত্রে এক নুতন দিগন্তকে মেলে ধরেছিলেন। নজরুল এসে সেই ধারাকে আরও অনেক দূরে ও বিচিএ পথে টেনে নিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি বিদেশী সুরের মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্ষেত্রেই নিবদ্ধ ছিল কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বিরাট সঙ্গীত জগৎ যেন তাঁর সুরগীতির অঙ্গনে আমন্ত্রন পায়নি। নজরুলের গানে সেই অনিমন্ত্রিত অতিথির প্রথম পদক্ষেপ ঘটেছে। বাংলা সাহিত্যে নজরুল এলেন বিদ্রোহীর বেশে কিন্তু বাংলা গানের ক্ষেত্রে তিনি যেন মধ্যপ্রাচ্যের সুরা ও সাকী; খেজুর গাছ, প্রখর রৌদ্র এবং ওয়েসিসের শ্যামলিমা নিয়ে হাজির হলেন।  

সুর সৃষ্টিতে তিনি অসাধারন প্রতিভার পরিচয় রেখেছেন। সুরের খেলায় মেতে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের গানে অজস্র অপূর্ব সুন্দর সুর প্রয়োগ করেছেন। সুরের উপর প্রচন্ড দখল ছিল বলেই সুর ছিল তাঁর প্রথম অবলম্বন। নজরুল সঙ্গীতের আলাদা আভিজাত্য এবং স্বকীয় ঢং নজরুল প্রেমী মানুষ এবং শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষনীয় হয়ে উঠে। এই স্বকীয়তাই অতি সহজেই নজরুলসঙ্গীতকে চিনতে সাহায্য করে। 

সঙ্গীতের নানা শাখা প্রশাখায় নজরুলের বিস্ময়কর অবাধ এই যাতায়াত তাঁর সঙ্গীত ভাবনার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমানিত করে। শুধু সংখ্যার বিচারে নয় সঙ্গীতের সাধনায় তাঁর অবদান আজ সমগ্র সঙ্গীত জগতের সম্পদ। সঙ্গীতে তাঁর অবদান বিষয়ে কবি নিজেই ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। 

কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, তাঁর গানের স্বকীয়তা আমরা আজও পূর্ন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। যার জন্য আজও নজরুলের  গানের সুর নিয়ে যথেচ্ছার চলছে। তাই আমাদের উচিত নজরুলসঙ্গীতের বানী ও সুরের বিকৃতি না ঘটিয়ে শুদ্ধতা বজায় রেখেই  নজরুল ইসলাম কে আন্তরিক ভাবে শ্রদ্ধা জানানো । 

পরিশেষে, নজরুলসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মমোহন ঠাকুরের এ প্রসঙ্গীয় বক্তব্যে্র উল্লেখ করছি- “ নজরুলের গান আমাদের জাতীয় সম্পত্তি স্বেচ্ছাচারে একে ধ্বংস হতে দিলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবেনা”।


সমীর ভাদুড়ী (গবেষক আইন বিভাগ,আসাম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়) 

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-