শুক্রবার, মে ২৬, ২০১৭

রিয়া চক্রবর্তী

শব্দের মিছিল | মে ২৬, ২০১৭ |
Views:
গল্পে অনুভবে প্রিয় কবি নজরুল
নজরুল ইসলাম বাঙালির আর এক প্রিয় কবি। তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাতে অনেকেই তাঁর জীবনী লিখবেন। সেই চুরুলিয়ায় কবির জন্ম থেকে বাংলদেশে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত। আবার কেউ লিখবেন তাঁর সৈনিক জীবন নিয়ে। আবার কেউ হয়তো লিখবেন তাঁর বাল্য বয়সেই লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে একটি লেটো দলে যোগ দেওয়া নিয়ে।

কিন্তু আমি কি লিখি? রবীন্দ্রনাথকে তো ছোট থেকেই আমরা দূরের তারা বলেই জানি, আমাদের ঈশ্বরের আসনে তিনি বিরাজমান। কিন্তু নজরুল ইসলাম! তিনি যে ভীষণ আপন, শুধু লেখা দিয়ে আপন নয় একই পাড়া ছিলো আমাদের। কি যে লিখি! আকাশ পাতাল ভেবে ঠিক করলাম কবির জীবনে নারীদের নিয়ে লিখি। তাই নিয়েই শুরু করি তবে।

কবির জীবনে নারী :-

আমরা সবাই জানি তাঁর জীবনে তিনজন নারীর প্রভাব ছিলো সবথেকে বেশি। প্রেমিকাদের জন্য লিখেছেন অজস্র গান, কবিতা, ঘটিয়েছেন নানা ঘটনা। প্রেমের কবিতায় তাঁর তুলনা নেই। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি প্রেমে পড়েছিলেন বারবার।

কবি যাঁদের প্রেমে পড়েছিলেন, প্রথমেই আসে নার্গিসের কথা। ১৯২১ সালে কবি তাঁর বন্ধু আলী আকবর খানের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন কুমিল্লার দৌলতপুরে। সেখানে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সৈয়দা খাতুনের । কবি ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে সবাইকে গান শুনিয়েছিলেন। নজরুলের গানের সুরে মুগ্ধ হলেন সৈয়দা খাতুন আর সৈয়দা খাতুনের রূপে মুগ্ধ নজরুল। কবি প্রেমে পড়ে গেলেন প্রথম দর্শনেই। সৈয়দা খাতুনও সমান আগ্রহে কবির প্রেমে সাড়া দিয়েছিলেন। সৈয়দা খাতুনকে ভালোবেসে কবি তাঁর নামও বদলে দিলেন। তিনি তাঁর নাম দিলেন নার্গিস। নার্গিস ইরানি শব্দ, যা এক সাদা ফুলের নাম। দৌলতপুরে থাকা অবস্থাতেই কবি সিদ্ধান্ত নিলেন, নার্গিসকেই তিনি বিয়ে করবেন। বিয়েও হয়ে গেল কয়েক দিনের মধ্যে। কিন্তু ইতিহাস রচনা করল এক দুঃখের নাটক। বিয়ে হলো ঠিকই, বাসর আর হলো না। কোনো এক অজানা অভিমানে বাসর রাতেই নজরুল বাড়ি ছেড়ে যান। দৌলতপুর থেকে চলে আসেন কুমিল্লায়। কিন্তু কবির সেই অভিমানের কারণ কবি কোনো দিন কাউকে মুখ ফুটে বলেননি।

এর পর যদি কারও নাম আসে, তিনি হলেন মিস ফজিলাতুন্নেসার। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতকোত্তর  ছাত্রী। ইতিহাস বলে, এই প্রেম ছিল একতরফা, মানে শুধু কাজী নজরুল ইসলামের দিক থেকেই। ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে কবির পরিচয় হয় ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। কবি তখন মুসলিম সাহিত্যসমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছেন ঢাকায়। কবি একটু-আধটু জ্যোতির্বিদ্যা জানতেন। কাজী মোতাহার হোসেন সে কারণে কবিকে নিয়ে যান ফজিলাতুন্নেসার বাসায়। ব্যস! শুরু হয়ে গেল হাত দেখা। প্রথমে হাতে হাত, পরে চোখে চোখ। কবির মন প্রেমে টালমাটাল হয়ে উঠল। কবি চলে গেলেন ঢাকা ছেড়ে। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা থেকে গেলেন তাঁর মন জুড়ে। তার পর থেকে নজরুল লিখে চললেন একটার পর একটা প্রেমপত্র।

তবে শেষ পর্যন্ত নজরুলের জীবনসঙ্গিনী হয়েছিলেন প্রমীলা সেনগুপ্তা। প্রমীলাদেবীর ডাকনাম ছিল দুলি। জানা যায়, নজরুল ইসলাম কুমিল্লায় থাকা কালীন প্রমীলাদেবীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পরেন। প্রমীলাদেবীর সঙ্গে তাঁর আলাপ-পরিচয় ক্রমশ প্রেমে পরিণত হয়। তিমি তাঁর এই প্রেমের কথা লিখেছেন, তাঁর ‘বিজয়িনী’ কবিতায় । তাঁদের বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে। বিয়েতে বাধা ছিল একটাই,ধর্ম। বিবাহ-আইনের নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে তাঁদের বিয়েটা হয়েছিল স্ব-স্ব ধর্মপরিচয় বহাল রেখেই। তখন প্রমীলার বয়স ছিল ১৪ আর নজরুলের ২৩। নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে কবি লিখেছিলেন, ‘হার-মানা-হার’। অবশেষে সেই 'হার-মানা-হার' পড়ালেন প্রমীলা সেনগুপ্তার কন্ঠে।

দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৬২ সালের ৩০ জুন মৃত্যুবরণ করেন কবিপত্নী প্রমিলা নজরুল। প্রায় ২৩ বছর পক্ষাঘাতগ্রস্থ ছিলেন তিনি। বাকরুদ্ধ অপ্রকৃতিস্থ কবিকে স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ দেন বন্ধু শৈলজানন্দঃ ''নূরু, দুলী আর নেই।'' কবি ফ্যাল ফ্যাল করে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো চেষ্টা করছিলেন, দুলী কে ছিলো তাঁর জীবনে, মনে করতে। বিষাদাক্রান্ত হয়ে পরে মন। মনে পড়ে কবির অমর গানঃ

'ঘুমায়েছে ফুল পথের ধুলায় ওগো জাগিও না।'

শুনেছি প্রেম নাকি কবি মানসের প্রধান প্রেরণা। প্রেমিক কবি নজরুলের মন তো প্রেমময় হবেই। আর তাই প্রেম নজরুলের জীবনে এসেছিল বারবার—কখনো ঝড়ের মতো, কখনো নিভৃতে।কখনো রানু সোম (প্রতিভা বসু), কখনো কানন দেবী, আবার কখনো জাহানারা বেগম চৌধুরী, কখনো উমা মৈত্র। কবি বারবার ভেসে গেছেন প্রেমের জোয়ারে।

এতো গেলো কবির প্রেম পর্ব। এইবার কিছু কথা কবির পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়ে। কবির ছেলেরা ও নাতি নাতনীরা ...

কাজী সব্যসাচীঃ

আবৃত্তিকার কাজী সব্যসাচী কাজী নজরুল ইসলামের বড় ছেলে। তিনি বিয়ে করেন উমা কাজীকে। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়। ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডে, বর্তমান নজরুল ইন্সটিটিউট সংলগ্ন। কাজী সব্যসাচী কাজে কলকাতায় থেকে গেলেও উমা কাজী কবিকে দেখার জন্য ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢাকায় চলে যান। তাঁদের তিন সন্তান। সবার বড় খিলখিল কাজী। তারপর মিষ্টি কাজী। এবং ছোট বাবুল কাজী। কাজী সব্যসাচী ১৯৭৯ সালের ২ মার্চ কোলকাতায় মারা যান। খিলখিল কাজী একজন সঙ্গীত শিল্পী। খিলখিল কাজী নামটি তার বাবার দেয়া। গানের হাতে খড়ি তার বাবার কাছে। কাজি সব্যসাচির দ্বিতীয় সন্তান মিষ্টি কাজী কোলকাতায় থাকেন। নজরুল চর্চ্চা ও গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার স্বামী অরুণ আগরওয়াল। তাদের তিন সন্তান। সবার বড় দূর্জয় ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেছেন। মেয়ে স্নেহা স্কলারশিপ নিয়ে ব্যাংককে পড়াশোনা করেছেন। আর সুইটি কোলকাতয় স্পোর্টস এর সাথে যুক্ত। খিলখিল কাজীর ছোট ভাই বাবুল কাজী পেশায় ব্যবসায়ী। স্ত্রী নাদিরা ফারজানা। তাদের তিন সন্তান। কাজী আনহাফ ইসলাম আরিয়ান, কাজী আজওয়াদ ইসলাম এবং কাজী আবাসা ইসলাম।

কাজী অনিরুদ্ধঃ-

গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। কাজী অনিরুদ্ধ ছিলেন খ্যাতনামা সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি কবির সৃষ্ট অমর সুর সম্পদ সংরক্ষণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। নজরুলের দুষ্প্রাপ্য লুপ্ত, অর্ধলুপ্ত গানের সুর উদ্ধার, স্বরলিপি প্রণয়ন ও প্রকাশের মাধ্যমে কবির সৃষ্টিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন। কবির জীবদ্দশায় তার অকাল প্রয়াণ হয়। কাজী অনিরুদ্ধ এর সহধর্মিণীর নাম কল্যাণী কাজী। কল্যাণী কাজী একজন সঙ্গীত শিল্পী। অনিরুদ্ধের সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯৫২ সালে। তিনি লেখালেখিও করেন। তাদের তিন সন্তান।কাজি অনির্বাণ। কাজি অরিন্দম। অনিন্দিতা কাজি। পুত্র অনির্বাণ নিজে একজন পেইন্টার। কলকাতায় একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা পরিচালনা করেন। অনির্বাণের স্ত্রী সোমা মুখার্জি । তাদের দুই সন্তান অংকন এবং ঐশ্বরিয়া। দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম গিটার বাদক। কলকাতায় থাকেন। অরিন্দমের স্ত্রী সুপর্ণা ভৌমিক। তাদের দুই সন্তান। অভিপ্সা ও অনুরাগ। কাজী অনিরুদ্ধর ছোট মেয়ে অনিন্দিতা একাধারে নজরুল ও রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশা জীবনের শুরু হলেও বর্তমানে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ‘তারা মিউজিকের’ জনপ্রিয় অনুষ্ঠান আজ সকালের আমন্ত্রণের উপস্থাপনা করেন। অনিরুদ্ধ পরিবার কোলকাতায় থাকেন।

কবির প্রেম, কবির পরিবার নিয়ে লেখার পরেও, কত কিছু বাকি থেকে যাচ্ছে, আমার ভালো লাগার কবি, সেই ছোট্ট থেকে যেসব গল্প শুনে বড় হয়েছি সেই কবি, কি লিখবো! সেইসব লিখতে গিয়েও বারবার ভাবছি, শুরু করবো কিভাবে। অবশেষে যতটুকু মনে আছে সেই নিয়েই করি আমার স্মৃতিচারণ।

গল্পে গল্পে নজরুল ইসলাম :-

এইবার আসি আমার পাড়ার কবি নজরুল ইসলামের কথায়। যেভাবে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন আমার পরিবার, যা গল্প শুনে আমি বড় হয়েছি। আমার অনুভবে যেভাবে তিনি আছেন সেই নজরুল ইসলামের কথায়। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ কবি বাংলদেশে যাবার আগে পর্যন্ত কবি বসবাস করেন কৃষ্টোফার রোড গভর্নমেন্ট কোয়ার্টার, কলকাতা ১৪। আমার পাশের পাড়ায়। আমার জন্মের আগেই কবি চলে গেছেন বাংলদেশে। কবি তখন অসুস্থ। কথা বলতে পারেন না। পাড়ার কিছু বিশিষ্ট লোকজন প্রায় যেতেন কবির বাসায়, কবিকে দেখতে। বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়া কবি শুধু তাকিয়ে দেখতেন। তাঁর শব্দেরা, তাঁর সুর তখন তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে।কবির জন্মদিনে পাড়ায় বিশিষ্টজন ছাড়াও সবার জন্য কবির বাড়ির দরজা খোলা ছিলো। কেউ নিয়ে যেতেন বাগানে ফুল, কেউ বা নিজের গাছের ফল নিয়ে যেতেন। যে যার ভক্তিমত কবিকে শ্রদ্ধা জানাতেন। কবি একেবারে সামনের দিকের ঘরে বিছানায় বসে থাকতেন। তাঁর দুদিকে দুটো পাশবালিশ দেওয়া থাকতো।যে যার মতো তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যেতেন। আর বাকি দিনগুলোতে কবি সেই ঘরের জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। অবাক দৃষ্টিতে দেখতেন পথচারীদের আসা যাওয়া। ঘটনাচক্রে কবির ছোট ছেলে, কাজি অনিরূদ্ধ ছিলেন আমার জেঠুর বন্ধু। যিনি বিখ্যাত কবির পুত্র হওয়া সত্বেও তিনি নিজেও বিখ্যাত গিটারবাদক ছিলেন। আর বড় ছেলে কাজি সব্যসাচী ছিলেন বিখ্যাত আবৃত্তিকার। উদাত্ত কণ্ঠে তাঁর আবৃত্তি শুনেছি বাড়িতে। তখন ছিলো রেকর্ড এর যুগ। ক্যাসেট এসেছে অনেক পরে। আমাদের বাড়িতে কবিপুত্রের অবাধ যাতায়াত ছিলো। কিন্তু ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে কবির ছোট ছেলে তথা বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধ মৃত্যুবরণ করে। কাজি অনিরূদ্ধ আজও শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন তিন নম্বর গোবরা গোরস্থানে।

আমার অনুভবে নজরুল ইসলামঃ-

ছোট থেকেই কবি এবং তাঁর ছেলেদের অনেক গল্প শুনেই বড় হয়েছি, তাই কবিকে কখনোই দূরের আকাশের তারা মনে হয়নি। ভীষণ কাছের, বাড়ির মানুষ বলেই মনে হয়েছে। যখন বোঝার বয়স হয়েছে যাতায়াতের পথে কবির বাস করা সেই কোয়ার্টারের সামনে থমকে দাঁড়িয়েছি। সেই জানলা, যেখানে কবি দাঁড়িয়ে থাকতেন পরনে থাকতো লুংগি আর পাঞ্জাবি। যখন সেইসব রাস্তা দিয়ে হেঁটেছি যে রাস্তা দিয়ে কবির দুই পুত্র হেঁটেছেন, শুনেছি ভীষণ সাধারণ পোশাক পরতেন তাঁরা, পাঞ্জাবি আর পাজামা সাথে লম্বা কাঁধের ব্যাগ। ভীষণ গর্ব অনুভব করেছি। আমি সেই পাড়ায় জন্মেছি বলে। যখন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পড়ছি বা পড়া শেষ করার পর প্রায়ই যেতে হতো পাভলভ মেন্টাল হাসপাতালে প্র্যাকটিসের জন্য। যেটা গোবরা গোরস্থানের উল্টো দিকে। একদিন হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে সাহস করে ঢুকলাম সেই গোরস্থানে। কাজি অনিরূদ্ধ যেখানে ঘুমিয়ে আছেন দেখবো বলে। কিছুটা যাওয়া পরে এক বৃদ্ধ এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন এসেছি? বললেন, একা একা যেন খুব ভেতরে না যাই। অনেক বড় জায়গা হারিয়ে যাবো। এখনের মতো এতো ভালো অবস্থায় ছিলো না তখন গোরস্তান। তাকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম কাজি অনিরূদ্ধ কোথায় আছেন, তিনি জানেন কিনা। তিনি বলতে পারেন নি। নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছিলাম।

অন্য আর একদিন কবির বাস করা সেই কোয়ার্টার এর সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কবির সেই জানলা। হঠাৎ মনে হল একটু ছুঁয়ে দেখি কবির সেই জানলা, যে জানলার রডগুলোতে তাঁর ছোঁয়া আছে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ব্রিজ থেকে সোজা নেমে, বাঁদিকে ঘুরে বেশ কিছু গাছ গাছালি পেরিয়ে চলে গেলাম কবির সেই জানলার কাছে। মাথাতেও আসেনি যে লোকে কি ভাববে? সেই বাড়ির মানুষজন কি ভাববে? চিরকালই আমার মধ্যে একটা don't care ভাব প্রকট। জানলায় হাত রাখতে যাবো, দেখি এক বয়স্কা মহিলা বসে আছেন। আমাকে দেখে বললেন কি চাই মা? বললাম এই জানলাটা একটু ছুঁয়ে দেখবো? এখানেই তো কবি দাঁড়িয়ে থাকতেন, তাইনা? উনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, হ্যাঁ এই সেই জানলা। তুমি ভেতরে এসো। সঙ্কোচ না করেই সেই কোয়ার্টার এ, সেই ঘরে ঢুকেছিলাম, যে ঘরে কবি থাকতেন। পরম মমতায়, ভক্তিতে হাত রেখেছিলাম সেই জানালায়, মনে হয়েছিল, কবির চরণস্পর্শ করছি। ওই বৃদ্ধা মহিলার থেকেই জানতে পারলাম, কবি চলে যাওয়ার পর থেকে তারাই আছেন সেই বাড়িতে।

আজও যখন পুরনো পাড়ায় যাই, একা একা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই সেই কোয়ার্টার এর সামনে। কিন্তু আগের মতো টান অনুভব করি না আজ। অনেক কিছু পাল্টে গেছে। নতুন রং হয়েছে সেই বাড়ির, সেই জানলার। নতুন মানুষজন। সেই বাড়ির, সেই জানলার শ্বাস প্রশ্বাসে আজ আর কবিকে অনুভব করি না। না কি আমিই বদলে গেছি? জানিনা, তবে এটুকু জানি, কবি আজও ভীষণ আপন। আমার পাশের বাড়ির কবি।

শেষ করি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য, বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত,সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষের উদ্দেশে, কবির লেখা কবিতা দিয়ে। যা গঙ্গা জলে গঙ্গাপুজোর সামিল। '‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থটি বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ-কে উৎসর্গ করেছিলেন কবি। উৎসর্গপত্রে লেখা ছিলো--- “বাঙলার অগ্নিযুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু”। আজ সেই কবিতা দিয়েই কবিকে শ্রদ্ধা জানালাম।

"অগ্নি-ঋষি! অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে।

তাই তো তোমার বহ্নি-রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে॥

দহন-বনের গহন-চারী–

হায় ঋষি– কোন্ বংশীধারী

নিঙ্‌ড়ে আগুন আন্‌লে বারি

অগ্নি-মরুর মাঝে।

সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝ্‌তে পারি না যে॥

দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হান্‌ছিলে বৈশাখে,

হঠাৎ সে কার শুন্‌লে বেণু কদম্বের ঐ শাখে।

বজ্রে তোমার বাজ্‌ল বাঁশি,

বহ্নি হলো কান্না হাসি.

সুরের ব্যথায় প্রাণ উদাসী–

মন সরে না কাজে।

তোমার নয়ন-ঝুরা অগ্নি-সুরেও রক্ত-শিখা বাজে॥ "




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-