মঙ্গলবার, মে ০৯, ২০১৭

রিয়া চক্রবর্তী

শব্দের মিছিল | মে ০৯, ২০১৭ |
Views:
অনন্য এক পান্ডুলিপি

City of paris জাহাজে কলকাতা থেকে ৬ই চৈত্র ১৩১৮ মঙ্গলবার ,১৯শে মার্চ ১৯১২ তারিখে পুত্র ও পুত্রবধূসহ রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড যাত্রা করবেন এমনটিই ঠিক হয়ে ছিলো।ডাঃ দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র ইংল্যান্ড যাচ্ছিলেন, on a tear's furlough on an educational tour' এ। তিনিও সঙ্গী হবেন এমনটি ঠিক । বিদেশ যাত্রার আগের কয়েকটি দিন কবির কেটেছিল বিবিধ ব্যাস্ততায়। তার আগে সপ্তাহখানেক তিনি ছিলেন শিলাইদহের নির্জনতায়। সেখানথেকে প্রিয়ম্বদা দেবী কে লিখেছিলেন ..

"এই বার এখানে এসে ভারি আরাম পেয়েছি। এখানকার আকাশে বসন্তের আনন্দ রসে ফাল্গুনমাসের স্বর্ণরৌদ্রখচিত পেয়ালাটি একেবারে উপচে পড়েছে। আমার এই তেতলার একলা ঘরটিতে সমস্ত দরজা চারিদিকে খুলে দিয়ে বসে আছি। বসন্ত তার পীত উত্তরীয় উড়িয়ে দিয়ে অবাধে আমার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আম্রমুকুলের গন্ধে আমার ঘর ভরে যাচ্ছে।চোখ যেন খাঁচার দরজা খোলা পাখীর মত বেড়িয়ে কোথায় উড়ে চলে যায়, তাকে ডাকলেও সে আর ফিরে আসতে চায় না। আমার সমস্ত দেহ মন সমস্ত দিন এই মাধুর্যে অভিষিক্ত হয়ে রয়েছে। আমার এই বহুদিনের পদ্মার তটভূমি আমাকে কিছুতে যেন বিদায় দিতে চাচ্ছে না। আজ তার এই উতলাহ্নে সে তার আতপ্ত বাহু দিয়ে আমাকে বেষ্টন করে ধরেছে- তার এই পাখীর ডাক , আম্রবনের গন্ধ তার এই উতলা হাওয়াটি, এই নবপল্লবদলের ভিতর দিয়ে ছাঁকা রৌদ্রটির লাবণ্য সমস্তই আমাকে বলছে তুমি যেও না, তুমি যেও না। কিন্তু তবু জেতে হবে। আমার চিরাভ্যাসের বাইরে গিয়ে এই পৃথিবীকেই তার বাহির মহলে দেখে আসতে হবে।"

চিঠি লিখলেন যে দিন, তার তিন দিন পরেই ২৮এ ফাল্গুন সোমবার রাত্রে কলকাতায় ফিরলেন। শুক্রবার সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের হলে প্রবন্ধ পাঠ,বক্তা ছিলেন কবিগুরু সহ আরও কয়েকজন।প্রথমে রবীন্দ্রনাথের একটি ছোটো প্রবন্ধ পাঠের পর প্রবীন ও নবীন ছাত্রেরা বলতে উঠলেন। ফল যা হলো তাতে মনে হয় , ভালো করে প্রস্তুত না হয়ে এ চেষ্টা তাঁরা না করলেই পারতেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও অনেক জায়গায় হাসি সম্বরণ করতে পারছিলেন না। পরদিন শনিবার কলেজ স্ট্রীটের ওভারটুন হলে কবি 'ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা' প্রবন্ধ পাঠ করলেন।কবির শরীর অসুস্থ ছিল বলে তিনি চেয়ারে বসে প্রবন্ধটি পড়লেন। রবিবার সকালে ছিল ভবানীপুর ব্রাহ্মসম্মিলন। এই প্রসঙ্গে সীতাদেবী লিখেছেন '"সেদিন তাঁহাকে বড়ই অসুস্থ দেখাইতেছিল , ভাবিলাম হয়ত বেশি পরিশ্রমে এইরূপ হইয়াছে।... উপাসনান্তে রবীন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি চলিয়া গেলেন। কাহারও সঙ্গে দেখা করিবার জন্য অপেক্ষা করিলেন না।"

ডাক্তারদের বিশ্রামের পরামর্শ বাস্তবায়িত হল না, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় অসুস্থ কবিকে দেখে এসে কন্যাদের জানালেন ' বিশ্রাম না করিয়াই সব কাজ করিতেছেন' । অবশ্য পরের রবিবার ১১ই চৈত্র পুত্র- পুত্রবধু সহ শিলাইদহের নির্জনে আবার ফিরলেন রবীন্দ্রনাথ। বৃহস্পতিবার জগানন্দ রায়কে চিঠি লিখলেন , 'কয়দিন এখানে এসে সুস্থ বোধ করছিলুম। মনে করেছিলুম যে ধাক্কাটা খেয়েছিলুম সেটা কিছুই নয়। সুস্থ হয়ে উঠলেই অসুখটাকে মিথ্যা বলে মনে হয়।আবার দেখি সকালবেলায় মাথাটা রীতিমত টলমল করছে। কাল বুধবার ছিল বলে,মেয়েদের নিয়ে একটু আলোচনা করছিলুম- এই টুকুতেই আমার মাথা যখন কাবু হয়ে পড়ল তখন বুঝতে পারছি নিতান্ত উড়িয়ে দিলে চলবে না।'

কিছুদিনের মধ্যেই তিনি রথীন্দ্রনাথ , প্রতীমা দেবি সহ ইংল্যান্ড রওনা হলেন, যে নোটবইতে অনুবাদ শুরু করেছিলেন সেতি তাঁর সঙ্গে ছিল।সমুদ্রপথের দিন গুলিতে তিনি নিজের রচনা অনুবাদের নেশায় আগাগোড়াই মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লন্ডন পৌঁছে স্বল্প হলেও পূর্বপরিচিত রটেনষ্টাইনের সঙ্গে তাঁর Oak Hill Park- এর বাড়িতে দেখা করতে গেলেন এবং গীতাঞ্জলি-র অনবাদ পাণ্ডুলিপির সেই নোট খাতাখানি তাঁর হাতে তুলে দিলেন। উপহৃত খাতাটির প্রথম পুস্তানিতে রটেনষ্টাইন-এর মন্তব্যটি এই রকমঃ" original manuscript of Gitanjali which the poet brought me from India on his initial visit to us at Oak Hill Park."

সেই খাতা তখন থেকেই রটেনষ্টাইনের সংগ্রহে থেকে গিয়েছিল। আজও সেইখাতা সংগ্রহ ভাণ্ডারে রাখা আছে। তবে তার ঠিকানা বদল হয়েছে।বর্তমানে সেই খাতা আমেরিকার Havard Universityর গ্রন্থাগারে ( Houghton Library) সংরক্ষিত আছে। হাউটন গ্রন্থাগারে এই খাতাখানির বর্ণনা গ্রন্থাগার পঞ্জিতে বলা হয়েছে এবং সেটি Blue Rayon-এ বাঁধানো আছে সে কথার উল্লেখ করা আছে।

রুলটানা কাগজের ৮৬ টি পৃষ্ঠায় লেখা এই পান্ডুলিপির বাঁ দিকে মূল বাংলা কবিতা ও ডান দিকে তার ইংরেজি অনুবাদ লিখিত। অবশ্য ১৪টি বাংলা কবিতা এখানে পাওয়া যায়। ৮৬ পৃষ্ঠার পান্ডুলিপিতে রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে কেবল মাত্র ডান দিকের পৃষ্ঠাগুলিতে পৃষ্ঠাঙ্ক দেওয়া আছে। ৮৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এই পৃষ্ঠাঙ্কের বিস্তার। পরের বাকি তিনটি পাতাতেও তাঁর করা কবিতার অনুবাদ আছে। সৌরিন্দ্র মিত্র বলেছেন, 'যেহেতু প্রকাশিত গ্রন্থের ৪/৫ অংশ রটেনস্টাইন- খাতা থেকে নেওয়া, এটিকেই ইংরেজি গীতাঞ্জলির আদিম আকরগ্রন্থ বলা যায়'।

যা ঘটেছে তা এই, কিন্তু যা ঘটতে পারত সে কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। হয়তো হারিয়েই যেত এই খাতা, হয়তো রবীন্দ্রনাথ আরও অনুবাদ করে আবার নতুন করে Giatanjali ( song offerings ) তৈরি করতেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে এই অমূল্য রবীন্দ্র পাণ্ডুলিপির খাতা হারিয়ে যেত চিরকালের মত। কী অঘটন যে ঘটতে পারত সে কথা লেখা আছে রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায়। লন্ডনে পৌঁছে ব্লুমসবেরি যাবেন বলে তাঁরা টিউব রেলে উঠেছিলেন। পাতালরেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সেই প্রথম, রথীন্দ্রনাথের ওপর সব দায়িত্ব । তাঁর হাতে পিতা রবীন্দ্রনাথের অ্যাটাচি কেসটি ছিল, যার মধ্যে অন্যান্য অনেক কাগজপত্রের সঙ্গে এই অনুবাদ পাণ্ডুলিপি নোটখাতাখানিও ছিল। ভুলক্রমে সেতা তিনি ট্রেনে ফেলে আসেন , পরদিন উইলিয়াম রটেনস্টাইনের বাড়িতে যাওয়ার সময় নোটখাতাখানির খোঁজ করলেন রবীন্দ্রনাথ - রথীন্দ্রনাথ দেখলেন চামড়ার সেই সুটকেসটা নেই।

উৎকণ্ঠিত মনে রথীন্দ্রনাথ তখনি দৌড়ালেন left luggage office-এ এবং হারাধন ফিরে পেলেন। রথীন্দ্রনাথের নিজের কথায়, "since then I have often wondered what shape the course of events might have taken if the manuscript of Gitanjali hda been lost through my negligence".




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-