সোমবার, মে ১৫, ২০১৭

পাপ্পু আচার্য্য

শব্দের মিছিল | মে ১৫, ২০১৭ |
Views:


 দ্য আমব্রেলা  (গল্প

১।।

পার্কের হাওয়ায় ঘাসগুলো দোল খায় । সুস্মিতা চেয়ে থাকে সেদিকে রানার কোলে মাথা রেখে । অদুরে একটা কাপল আদুরে গলায় খুনসুটি করে । বর্ষায় মাটি হাল্কা ভিজে আছে,তাই প্লাটফর্মে পেতে বসার যে প্লাস্টিকটা রানা কিনেছিল সেটার উপর দুজন বসে থাকে । সুস্মিতা লজ্জায় বাঁ দিকে তাকায় না, বাঁ দিকের ছেলেমেয়েদুটো ঠোঁটে-ঠোঁট চুবিয়ে বসে আছে, বর্ষার সময় বলে সবাই প্রায় ছাতার তলে, সুস্মিতা ছাতাটা আনতে ভুলে গেছে । সুস্মিতাও চায় নিজের মুখটা রানার বুক থেকে মুখে তুলতে । লজ্জা হয় । তবু বাঁচোয়া বৃষ্টিটা হয়নি বলে, সেটা হলে আর রক্ষে থাকত না । সময় বয়ে চলে, রানা গান করে শোনায় সুস্মিতাকে । যে কাপলটা ওদের সবচেয়ে সামনে তারাও শুনতে পায়না সে গান । শুধু সুস্মিতা শুনতে পায় । বাথরুম সিঙ্গার যেন তানসেন হয়ে যায়, ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি শুরু হয় । আচমকা একটা তরঙ্গ শুরু হয় কাপলস্রোতে । কে সি পাল, হরিদাস পাল থেকে শুরু করে সস্তা ফ্যাশনের রঙ্গিন ছাতাগুলোও সোজা হয়ে যায়। সামনের দিকটা মায়াময় হয়ে ওঠে , কিছুদূর গিয়ে বৃষ্টির একটা ঝুরো রেখা অপরটার সাথে মিশে গিয়ে দেওয়াল তৈরী করে । যে দেওয়াল খালি চোখে ভেদ করা যায় না । সেই দেওয়ালের ভেতরে মোটামুটি চারখানা জোড় । একে অপরকে দেখতে পায় সবাই । কিন্তু যেসব জোড়ের কাছে দেওয়াল না থাকাটা কোন বাধা ছিলনা, তাদের কাছে একটা দেওয়ালও কিছু আনন্দ দেয় না । রানা কিন্তু ভীষণ আনন্দ পায় । সুস্মিতার ঠোঁটের কাছে রানা মুখ নিয়ে গেলে লজ্জায় মুখ নিচু করে সুস্মিতা । নিচের প্লাস্টিকটার দিকে ইঙ্গিত করে । রানা ইঙ্গিতটা বুঝে যায়, বরুণ দেবটাকে যে এত সহজে পরাস্ত করা যায় ভাবতে রোমাঞ্চ হয় । ভিজে মাটিতেই বসে পড়ে দুজন, হাল্কা ভেজা মাটি পেছনে কাদা লাগায়, তবু ভাল পেছনে কাদা লাগলে সর্দি হয় না, মাথায় জল লাগলে হয় ।

২ ।। 

টানা ১৭ দিন স্কুলে যায়না ভুবন, এই বৃষ্টিতেই ধানের আফর ফেলতে হয় জমিতে । প্রচুর জমি তাদের , বহু লোক কাজ করে । ৭০ বছরের ঠাকুরদা বলে ' এই বয়সে যদি নিজের কাজ না করবি তবে আমার মত বুড়ো হলে করবিটা কি ?' তাই শত খানেক মজুরের সাথে সে ও তার ঠাকুরদা টানা কাজ করে যায় । আফর ফেলাও যেন এক নেশা, ভিজে মাটির ভেতর পা ঢুকে যায়, কখনো বা হেলে সাপ পা ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়, কখনও বা ফর্সা মাছ কাদায় লটপট করতে করতে উঠে আসে । সেইসব মাছ সীতার মত , কিন্তু তাকে অগ্নিপরীক্ষায় পাশ হতে হতে হয় না, পাশের ডোবাতে ছুড়ে ছুড়ে ফেলে ভুবন । ১৭ দিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সবুজ করে তোলে ক্ষেতটাকে । এত যে পরিশ্রম তবু গা দিয়ে ঘাম হয় না, অনবরত জলধারা এসে চান করিয়ে দেয় । মাথা থেকে জলরাশি নিজের পথ করে নেয় এগোবার, প্রথমে কয়েকটা সরু রাস্তা হয় পেটে , হাতে , পিঠে । তারপর সব রাস্তা মিশে যায়, কোন বৃষ্টিকে আলাদা করে চেনা যায় না । মাঝে মাঝে ঝড়ো হাওয়া বুকখানা কাঁপিয়ে দিয়ে যায়, কাঁপা বুকে নতুন বৃষ্টির গরম ফোঁটা মলমের কাজ করে ।

১৭ দিন পর স্কুলে গিয়ে সৌম্য কে দেখে, প্রাণের বন্ধু । সৌম্যর বাড়ি একটু দুরের গ্রামের তাই টিফিনের সময় সে বাড়ি যায় না , ভুবন যায় । সৌম্য মার হাতের তৈরী রুটি নিয়ে আসে ব্যগে , ভুবন ঘরে গিয়ে ভাত খায় । সেদিন টিফিনে ঝরঝর করে বৃষ্টি নামে , সৌম্য ভুবনকে ঘর যেতে বারণ করে । তার টিফিনের অর্ধেক ভাগ দেবার কথা বলে বন্ধুকে আটকাতে চায় । ভুবন তাকায় টিফিনের দিকে , দুখানা রুটি, মানে তার ভাগে একখানা । ওতে ওর পেট ভরবে না সেটা ভালভাবেই জানে ভুবন । বন্ধুকে মিথ্যে কথাটা বলে ফেলে , ' নারে আজ ঘরে মাংস হয়েছে যেতে হবে । '


ঠিক বেরোবার মুখে পথ আটকে সৌম্য নিজের ব্যগ খুলে ছাতাটা বের করে ।

'এটা নিয়ে যা, ভিজলে সর্দি হতে পারে ।'

হো হো করে হেসে ওঠে ভুবন, ক্লাসের সবাই মুহূর্তে চুপ হয়ে যায় । তাকায় ভুবনের দিকে ।

' কি হল ? হাসছিস কেন বে ? '

' কিছু না' বলে সৌম্যর ছাতাটা নিয়ে ধীরপায়ে বাড়িমুখো হয় ভুবন ।

৩।।

খুব চিন্তায় আছেন স্বামী পদ্মনাভনন্দ । কাল সকালে বাচ্চাগুলোকে কি খাওয়াবেন সে নিয়ে । কাল জন্মাষ্টমী বলে তিনি ভালো কিছু খাওয়াতে ছেয়েছিলেন, কিন্তু গত সাতদিনে কোন অনুদান আসেনি । ৮০ টা বাচ্চা নিয়ে ওনার অনাথাশ্রম । সুধিরবাবু একটা এন জি ও চালান, উনি এখানে মাঝে মাঝে আসেন । চাল, ডাল, তরিতরকারি, মাছ দিয়ে যান কখনও কখনও । স্বামী বারবার ওনাকে ফোন করে যাচ্ছেন , কিন্তু রিং হচ্ছে না । ফোন সুইচ অফ , অবশ্য এই ঝড়জলে কেই বা ফোন চালু রাখে । ঘরে চাল আর ডাল ছাড়া তেমন কিছু নেই । উদাস দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে রাতের বৃষ্টির দিকে তাকান স্বামী পদ্মনাভনন্দ । অন্ধকার আসলে চিরসত্য, সব আলোয় রাঙ্গা হলেও যদি চোখের কাছে হাতের তালু চেপে ধরা হয় তাহলে আলো নিয়ে সব রিসার্চই ব্যর্থ হয়ে যায় । অন্ধকার আসলে সবকিছু জাগিয়ে তোলে । তারপর যদি সেই অন্ধকারের গায়ে বৃষ্টি হুল ফোটাতে শুরু করে তাহলে পুরো অন্ধকারটাই এক রহস্যময়ী নারী হয়ে ওঠে । অন্ধকারটাকে খুলে ফেলতে মন চায় - এ অপার রহস্যর সমাধান পাওয়ার বাসনায় উন্মুখ হয়ে ওঠে । তবে এ ভাবনা স্থায়ী হয় না - ছেলেগুলোর কথা ভেবে প্রশমিত হয় খানিক । কালকের এই বিশেষ দিনে ছেলেগুলোর সাথেই কাটাবেন তিনি । ছেলেদের সাথে পাশের মাঠটায় ফুটবল খেলার কথা তাঁর । ছেলেরাও বড় উত্তেজিত এ ব্যাপারটা নিয়ে । স্বামী তাদের সাথে খেলবে এ যেন তাদের কল্পনার অতীত । বহু ছেলের চোখে ঘুম নেই, কাল খাওয়াদাওয়াও তো ...। পদ্মনাভ ভাবতে থাকেন কাল সকালে উঠে যাবেন কারো কাছে । বৃষ্টির ঝাঁট আসায় জানালাটা বন্ধ করে খিল এঁটে দেন । তারপর হটাৎ একসময় বসে বসেই চোখ বন্ধ হয়ে আসে ।

ভোর হতে না হতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় চিরকালীন অভ্যাসে । বৃষ্টি কখন থেমে গেছে । আবছা আলোয় ঘাসের উপর জলের বিন্দুগুলো নিজেদের মধ্যে খেলা করে । চাদরটা গায়ে জড়িয়ে ঘাসের উপর মোলায়েম ভাবে পা ফেলেন । সামনে তাকিয়ে একমুখ হাসি ছড়িয়ে যায় তাঁর । পুরো মাঠ জুড়ে সবুজের মাঝে কে যেন সাদা রঙ্গের তুলি বুলিয়েছে রাত জেগে । যতদূর চোখ যায় শুধু ছাতা আর ছাতা ।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-