শুক্রবার, মে ২৬, ২০১৭

নাসির ওয়াদেন

শব্দের মিছিল | মে ২৬, ২০১৭ |
Views:
শিল্পী নজরুল ইসলামের সংগীত চর্চা
আমাদের দেশে সনাতনী ঐতিহ্যের বুকে একখণ্ড কালো পাথর গেড়ে বসতে চাইছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষ চায় সৌহার্দ্যের স্নেহজলে অবগাহন করে স্নিগ্ধ কিরণ বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে --মানুষ প্রত্যাশী যে, জাতিতে জাতিতে, ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে দাঙ্গা নয় --মহামিলনের ঐক্যে একতাবদ্ধ হওয়া । "জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন "--লাভের অদম্য স্পৃহা এবং অভিলাষ বৃহদংশের মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে, তখন ক্ষুদ্রাংশের অতুচ্চ লোভ, মানবতা বিরোধী ঝোঁক, সংস্কৃতির বন্ধন ছিন্ন করে, হিংসার দড়ি জড়িয়ে বারুদের পলতে বানাতে চাইছে । জতুগৃহের কাহিনী আমরা পড়েছি,শুনেছি এবং জ্বলন্ত অঙ্গারে পুড়তে ও দেখেছি ভাগলপুর, মজফ্ফরপুরের দাঙ্গা, শেষে গোধরা কাণ্ড--আমরা এতটাই অকুতোভয় যে ধরাকে সরা মনে করি না। অথচ ইতিহাস বলছে, উন্মত্ততা, উচ্চ জিঘাংসা, লালসা, দাম্ভিকতা পর্যুদস্ত হয়েছে, সত্যের কাছে, সনাতনের কাছে, মানবতার ছোঁবলে --ভারত এক বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের দেশ । সর্ব ধর্ম সমন্বয়ে ভারত আজও অখণ্ডিত-- যারা ভারতে জন্মেছে,বসবাস করে, তাদের মাতৃভূমি এই ভারত,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভারতের মূলমন্ত্র--এই মন্ত্রে আমরা দীক্ষিত, পরীক্ষিত ও পরিচালিত। মহান কবি নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে আমরা তাঁর সাম্যের আদর্শ ও বাণী স্মরণ করি--সংগীত সাধনার বিভিন্ন দিকের আলোকপাত করি---

"মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু -মুসলমান •••"

কবি নজরুল আর সংগীত সাধক নজরুল কখনও আলাদা সত্বা নয়। মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে। নজরুলের সাহিত্যে গবেষণা করার মতো কিছুই নেই অনেকে মনে করতেন। কিন্তু বাস্তবজীবনে দেখা যায় নজরুল অনন্য। বাংলা সাহিত্যে নজরুল এক স্বতন্ত্র-জ্ঞান অধিকার করেছেন। বিশেষ করে বাংলা কাব্য-গীতের বিশ্ব-বাগিচায়, গুলবাগের বুলবুল তাঁর গানের সুর বৈচিত্র্য ও বিষয় বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। তাঁর গান নিয়ে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হতে থাকবে । ঝুমুর, কাওয়ালি, গজল, ঠুংরি, শ্যামা সংগীত, দেশাত্মবোধক, আধুনিক, মার্চ সংগীত ,বাউল গান, সম্প্রীতির গান, চাষের গান, প্রেমের গান, রচনা করে সুর দিয়ে অনুরণিত করে তুলছেন। আজ থেকে হাজার বছর আগে তৎকালীন সমাজে নিম্নবর্গীয় বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ তাদের সহজিয়া গানের কাঠামোকে সুর, তাল ও ভাবের সংমিশ্রণে গড়ে তুলে মানব জাতির প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তুলতো ।তেমনি নজরুল ইসলামও তাঁর গানের বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে গানের ভুবনকে আলোকিত করেছেন ।বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণের হৃদয় স্পর্শী বৈষ্ণব পদাবলী যেমন গ্রাম-বাংলার জনজীবনের যন্ত্রণাকে ভুলতে শিখিয়েছিল । পরবর্তী শাক্ত কবিগণও তাঁদের গানের মুর্চ্ছনাতে প্রাণ ভরে দিয়েছেন তাঁরই উত্তরসূরি, নজরুল সংগীতের মধ্য দিয়ে বাংলার জনগণের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হয়েছিলেন । বিয়ের গান, মহরমের গান, দরবেশীর গানের মধ্য দিয়ে মুসলিম জাতির গ্রামীণ সুরকে যেমন বেঁধে ফেলেছিলেন, তেমনি শ্যামা-সংগীত রচনা করে অমুসলিম জাতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন । " বল রে জবা বল / কোন সাধনায় পেলি রে তুই শ্যামা মায়ের চরণ তল ।" --গানের সুরে আজও বাঙালির হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠে । টপ্পা গানের সুর বাংলায় অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে গানের দিগন্ত খুলে দিয়েছেন । "আমার শ্যামা মায়ের --"গানের মধ্য দিয়ে সামাজিক সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছেন ।" শুকনো পাতার নূপুর পায়ে " কিংবা "মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে " গানের মধ্য দিয়ে বিদেশীয় সুরের সংযোজন ঘটেছে । " আমি চির তরে দূরে চলে যাব / তোমারে দেব না ভুলিতে "--রোমান্টিক গানের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন । অতীতের নানা ঘাত-প্রতিঘাত তাঁর জীবনের দোলাচল থেকে নানা সুর, নানা কথা ও নানা ভাব স্ফুটিত হয়ে বাঙালির সংগীত সাধনাকে পূর্ণ করে তোলে ।" শূণ্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয় "--গানের মধ্য দিয়ে কবি পুত্রশোককে ভুলতে চেয়েছেন, তেমনি গানের বিস্তৃতির সুর বিশ্বজননীর হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত লেগেছে । বাঙালির জীবন চেতনায় শোকের ছায়া যেমন নেমে আসে, তেমনি শোক-দুঃখ'জ্বালাকে পরাস্ত করার দক্ষতা জেগে ওঠে ।

সুরের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে উজ্জ্বল কবি প্রতিনিয়ত সুরের ঝলকানিতে বাঙালির তন মনকে শোকহীন করে তুলতে সমর্থ হয়েছেন । দারিদ্র, রোগ, শোক, হতাশা, যন্ত্রণা বিদ্ধ বাঙালি জাতি পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ করার যোজন হাত দূরে থাকলেও শিল্পী তার শিল্প সাধনার ভাব রসে সিক্ত হয়ে দুর্দশাগ্রস্ত বাঙালির চিত্তে সাহসের বীজ রোপন করেন । বিদ্রোহী কবি চেতনায় শান দিয়ে বাঙালি জাতির হৃদয়ে যে, বরাভয় জাগিয়ে তুলে বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন দেখিয়েছেন , সেই কবি মধুর মিলনের মধুময় পিয়েৎ করে অনাদৃত হৃদয় বনে, সুরের ভেলা ভাসিয়ে নিশ্চয়তার নিঃশ্বাস ফেলতে সহায়তা করেছেন ।

বাঙালি সমাজে গ্রামীণ ও শিষ্ঠ দুই শ্রেণীর চিহ্নিত হয়ে আছে ।একদিকে অজস্র গ্রাম-বাংলার অশিক্ষিত গেঁয়ো (ফ্লক) জনগণ, অন্যদিকে শহুরে শিষ্ঠ (ফ্লাইট )সমাজ । দুইয়ের মধ্যে যে বিভেদ রেখা •••

বিভেদ রেখা তিনি দেখেছেন, সেখানেই আঘাত হেনেছেন গানের কলি ছড়িয়ে । উচ্চ সংগীতের দীক্ষা নেন শিক্ষক সতীশচন্দ্র কাজ্ঞিলালের কাছে । চর্চা নিয়েছেন ওস্তাদ কাদের বক্স, মঞ্জু সাহেব ও ওস্তাদ জামিরুদ্দিন খাঁ র মতো দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞদের কাছে । তাঁর অধিকাংশ শ্যামা সংগীত ," বন কুন্তলা ", 'দোলন চাঁপা ','উদাসী ভৈরব 'সংগীত জীবনের অনন্য সংকলন ।উচ্চাঙ্গ সংগীতের পাশাপাশি উপজাতি দের মনের কথাও তিনি ভুলে যাননি । তাঁর জীবনাশ্রিত সংগীত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সংকলন । তাঁর উপজাতি জীবনাশ্রিত সংগীত সাধনা সমৃদ্ধ করেছে বাংলা গানের ভুবনকে ।"শাল পিয়ালের বনে গো•••''বা " শোনরে নূপুর পাহাড় তলির মেয়ে " অথবা " ওরে বেদের দুলাল আমার সাথে সাপ খেলবি নাকি রে "মনের মাধুরীকে প্রকাশ করে । পাহাড়ের ঝরণার গতি পেয়েছে গানের কলিতে ---" এই রাঙা মাটির পথে লো মাদল বাজে/ বাজে বাঁশের বাঁশি "অথবা ' নাচের নেশায় ঘোর লেগেছে / নয়ন পড়ে ঢুলে লো ।' গীতি কবিতায় কবির জন্মভূমির কথা মনে পাড়িতে দেয় । রাঙা-মাটি, শালপিয়ানের বন পঞ্চকোট পাহাড়, কয়লা খাদের ধোঁয়া কবির জন্মভূমির প্রতিধ্বনি । ঝাড়খন্ড সীমান্তবর্তী বর্ধমান, বীরভূম, পুরুলিয়ার চিত্র আজও সকলের চোখে ভাসে ।'রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ 'বা " রোজ হাশরে আল্লা আমার করো না বিচার " কিংবা ",তোরা দেখে যা মা আমিনা মায়ের কোলে " যেমন ইসলামী জীবনকে সংগীত মুখর করে তুলেছেন, তেমনি 'এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি " ,বিতরণ করে বাঙালির আতৃপ্ত তৃষিত হৃদয়কে তৃপ্ত করে তুলতে সহায়ক হয়েছেন । 

যারা কাফের ফতোয়া দিয়ে জাতি ভ্রষ্ট করতে চেয়েছিল, নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে তারাও তাঁর গানের সুরে মশগুল হয়ে লুটিয়ে পড়ে । "বাহবা, বাহবা ' দিয়ে জাতে তুলতেও কার্পণ্য করে নি। দেশাত্মবোধক গানের হিসাব দেওয়া মুশকিল। তাঁর অসংখ্য কবিতাও গানের সুরে দোলায়িত। "কারার ঐ লৌহ কপাট ","দুর্গম গিরি কান্তার মরু " অথবা " চলে চল্ চল্ " ইত্যাদি গানের ছন্দে, সুরে এক সময় বাঙালি জাতি উদ্বেলিত হয়ে পড়ে । ভাঙা পাঁজরে তেজ বাড়ে, শুকনো কণ্ঠে মধু ঝরে, বুকে জেদ জাগে। "আমি বিদ্রোহী বীর " বাঙালি জীবনে অলসতা অবজ্ঞা ঝেড়ে মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বার্তা দেয়, এভাবেই কবি শিল্পী হয়ে উঠেন ।জীবনের কোনো এক নিভৃত অন্ধকার থেকে অগ্নি তেজস্বীয়তার লেলিহান শিখা বহির্গত হয়ে মৃতপ্রায় বাঙালির চিত্তকে বলিয়ান করে তোলে ।

মানব জাতিই শ্রেষ্ঠ জাতি, মুসলিম অমুসলিম,হিন্দু অহিন্দু বলে কোন জাতি হতে পারে না । মানুষের বিভেদ রেখাকে ভেঙে চুরে বিশ্ব-মানবতার দরবারে "এক জাতি এক জীব " তত্বে অবতীর্ণ করার প্রয়াস সার্থক হোক । এই বিভেদ-কামী আত্ম-সুখ, পরাস্ব অপহরণকারী জাতির মধ্যে যে যুদ্ধাপরাধ বোধ ঢুকে আছে তা রোধিত হচ্ছে দিনে দিনে । সেই বিষ বৃক্ষের চারা অচিরে নির্মূল করা প্রয়োজন  ।শিল্পী কবি আমাদের সামনে তাঁর রসদ ভাণ্ডার রেখেছেন, অমৃতরূপে পান করে বলিয়ান হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর সংগীত সাধনাকে আমাদের সযত্নে রক্ষা করে বিশ্ব মানবতার বন্ধনে বেঁধে ফেলতে হবে, তবেই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন ।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-