শনিবার, অক্টোবর ২৯, ২০১৬

জয়িতা দে সরকার

sobdermichil | অক্টোবর ২৯, ২০১৬ |
জয়িতা দে সরকার
সোহম আর রিয়া...আর? আর আমি।

আজ রবিবার, একটা ছুটির দিন। সকাল থেকে একটু ম্যাজম্যাজেভাব রয়েই যায়। কিন্তু আজ সেইরকম কিছুই বোঝা গেল না। কাকলি মানে রিয়ার মা আজ রিয়াকে দেখে বেশ অবাকই হয়। এত সকালে মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে গেল!

- কখন বেরোচ্ছি আমরা? ....আচ্ছা, ফ্ল্যাটের নীচে এসে মিসকল দিস একটা, আমি চলে আসব।
ফোন রেখে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ালো রিয়া। এককাপ গ্রীন টি করে নিয়ে মেয়ের ঘরে আসে কাকলি।

- কোথাও যাবি?
 -হুঁ।
- আজও কাজ?

রিয়া মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে গালে একটা চুমু খেয়ে বলে

- এখন আমি আর সোহম লং ড্রাইভে যাবো, তারপর লাঞ্চ...এরপর পূজোর শপিং এবং সব শেষে রাতের ডিনার সেরে বাড়ি।
-ও বুঝলাম।

মুখ হাঁড়ি করে রিয়ার মা। অবশ্যই মিছিমিছি । কারণ আগামী অগ্রহায়ণে ওদের বিয়ে, আর বিয়ের আগে সকলের মনেই যে দুরন্ত প্রেমটা ঝড়ের মতোন আছড়ে পড়ে সেটার আভাস এর আগেও কাকলি পেয়েছে । ওর আর প্রদীপের বিয়ের আগের সব ছবি স্পষ্ট মনে পড়ে যায়। মেয়েকে বাধা দেবেনা ও। শুধু মনটা অল্প খারাপ হয় এই মনে করে ক'দিন পরেই তো মেয়েটা অন্য সংসারে চলে যাবে। আবার এটাও ভাবে যাক গিয়ে খুব দূরে তো নয়। সোহমদের বাড়িও একই শহরে ।

- মা,তুমি মন খারাপ করছো?
- আসলে সপ্তাহে একটা দিনই তো তোকে পাই।
- কাল ১৫'ই আগস্টের ছুটি। কাল সারাদিন বাড়িতেই থাকবো আমি।

এবার হেসে ফেলে কাকলি

- কত খেয়াল রাখিস তুই ।
- আমি না রাখলে কে রাখবে? আচ্ছা এবার বলো কেমন লাগছে আমাকে?

মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে সাজুগুজুটা সেরে ফেলেছে রিয়া। সাজগোজের ব্যাপারে খুব সিম্পল রিয়া। একটা লাল কালো সিফন, সাথে একটা কালো টিপ,লম্বা বিনুনি ঝুলিয়ে দেওয়া আছে অনেকখানি খোলা পিঠের উপর দিয়ে । আর হালকা লিপস্টিক, কাজল- এইটুকু সাজেই অসাধারণ মিষ্টি লাগছে রিয়া কে। কাকলি ওর আঙুলে কামড়ে দিয়ে বলে ... 

- সাবধানে যাস। আর ছেলেটাকে বেশী জ্বালাতন করিস না কিন্তু....

কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই একটা চুমু ছুটে আসে কাকলির গালে।

- বাপি আসছি, মা আসছি....

বলতে বলতে দরজার বাইরে চলে যায় রিয়া।

গাড়ীর গতি ক্রমশ দ্রুত হচ্ছে। ঠিক সেই সময় হঠাৎ ব্রেকে পা রাখে সোহম।

- ব্রেকফাস্ট করেছো?
- সময় পেলাম কই?
- আচ্ছা, তাহলে চলো ব্রেকফাস্ট করে নি?

কিছু ভাবা বা বোঝার আগেই নিজের ঠোঁটে একটা উষ্ণতা অনুভব করে রিয়া। বুঝতে পারে সোহমের দুষ্টুমি। নিজেও ডুবে যায় সেই উষ্ণতায়....।

শহর থেকে অনেক দুরে ওরা এখন। পথের ধারের একটা ধাবায় নেমেছে লাঞ্চ করবে বলে। অফিসে ওরা এক জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই লাঞ্চ করে। শুধুই লাঞ্চ করে বললে একটু ভুলই বলা হয়। বরং মারামারি করে বলাই যেতে পারে। খাবার ব্যাপারে ওদের পছন্দ অনেকটাই একরকম। সব খাবার নিয়েই তাই চলে কাড়াকাড়ি, মারামারি। আশেপাশের টেবিলের লোকগুলো খাবে কি! হেসেই যাচ্ছে মুচকি মুচকি। অনেক ঝামেলার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটা মিষ্টি পানের রসে ঠোঁট রাঙায় রিয়া। ছুটির দিনের ক্লান্ত শরীরটাকে ছুঁড়ে দেয় সোহমের পাশের সিটটায়। সবে ঘুমে চোখ দুটো জুড়ে আসে ওর। ঠিক সেই সময়ই....

"Wanna be my chammak challo, o o o..
Wanna be my chammak challo, o o o.."

গানটা বিকট শব্দে বাজিয়ে দেয় সোহম, গাড়ির সিটে একপ্রকার লাফিয়েই ওঠে রিয়া! সিডির সুইচ অফ করে এক মোচড়ে। গোল গোল চোখে সোহমের দিকে তাকিয়ে বলে ...

- কি হচ্ছে সোহম!

সোহম আরও গোল গোল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বলে

- এটা তোর সাধের বেডরুম নয়। এখানে ভাতঘুম এলাও নয়..... দেবো না এক্ষুনি এ.সি'টা বন্ধ করে,ঘুম জানালা দিয়ে দৌড় লাগাবে।
- ফেসবুক করা যাবে না! পাশের সিটে বসে চোখ বোজাও বারন...গাড়ি না জেলখানা এটা! এক্ষুনি আমাকে বাড়ি দিয়ে আয়, এক্ষুনি.....
বলতে বলতেই সোহমের পিঠে দুটো-চার'টে দমাদম লাগিয়ে দেয় রিয়া।

- কি হচ্ছে কি রিয়া? আমি না তোর হবু বর!
- সো হোয়াট? বিয়ের পরেও এভাবেই চলবে.... অতএব অনেক সাবধানে চলবে  বুঝলি মি.সোহম বসু?

কথাগুলো শুনে হো হো করে হেসে ফেলে সোহম । গাড়ির এক্সেলেটরে পা দাবিয়ে গাড়ির গতিকে আরও দ্রুত করে সোহম ।

আমি তখন পিছনের সিটে বসে একমনে হাসছি আর ভাবছি.....পরের পর্বে কি হবে দেখাই যাক!!



#

সারাদিন একসাথে ঘুরে ব্যাগ ভর্তি শপিং করে রেঁস্তোরায় খেয়ে বাড়ি ফিরতে বেশ রাতই হয়েছে ওদের। যদিও এখন শীতকাল নয় তবু যখন তখন বৃষ্টি এসে ভেজাচ্ছে নিঝুম শহরটাকে। কলকাতায় অল্প বৃষ্টি মানেই এক হাঁটু জল। যাক সেই সব জল ডিঙিয়ে রিয়াদের ফ্ল্যাটের নীচে রিয়াকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয় সোহম। এইরকম সপ্তাহে প্রায় রোজই হয়, বেশীরভাগ দিনই সোহমের গাড়িতেই অফিস থেকে বাড়ি ফেরে রিয়া। তাও প্রতিদিনই নতুন করে একইরকম মন খারাপ হয় ওদের। বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পর থেকেই আবার ওরা চ্যাটিং এ কথা বলবে নয়তো বা ফোনে... তাও কেন এমনি হয়! বোঝে না ওরা। হাসি মুখে 'বাই' বললেও দুজনের মনেই একটা মন খারাপ ঘুরপাক খায়।

- এত বাজার করেছিস কেন! সোহমটা যে কেন তোকে এত আসকারা দেয়,কে জানে!!
- এত কই? মাত্র তো দুটো সেট! আর এগুলো তো আমার পূজোর শপিং।
- আমি জানি না বাবা, এইভাবে অকারণে ,অসময়ে এত কিছু কেনার কোনও মানেই হয় কি! এই জামাগুলোকে তো পূজো অবধি বাঁচিয়ে রাখতে পারবি না তুই? তারপর আবার বিয়ের বাজার। হ্যাঁ রে মা, সোহম তোর এত দস্যিপনায় বিরক্ত হয় না তো?
- তুমিই না হয় ফোন করে জেনে নাও। বিরক্ত হয় কি না। ও মা একটা স্ট্রং কফি খাওয়াবে, মাথাটা অল্প ব্যথা করছে।
- দিচ্ছি দাঁড়া।

রান্নাঘরে কফি করতে করতে কাকলির মনটা একটু ভিজে যায়। ভাবে, আহারে আর ক'দিন পর থেকে মেয়েটার দায়িত্ব অনেকগুণ বেড়ে যাবে। চাকরী,সংসার সব একাকেই তাল মিলিয়ে করতে হবে । পারবে তো মেয়েটা? পারবে,পারবে। কাকলির ভরসা আছে নিজের মেয়ের উপর। শুধুই পড়ালেখা নয়, সাথে সাথে সংসারের সমস্ত কাজ মেয়েকে শিখিয়েছে কাকলি। একটা সন্তান বলে আলাদা করে কখনও প্রশ্রয় দেয় নি ওকে।

- কলি?
শোবার ঘর থেকে প্রদীপের গলার শব্দ ভেসে আসে।

- আসছি,

সাড়া দেয় কাকলি। মানুষটা শেষ জীবনটায় এসে বড্ড অসহায় হয়ে গেল। গতবছর পূজোর পরপর হঠাৎ করেই সুস্থ মানুষটার স্ট্রোক হল। সাথে সাথে প্যারালাইসিস। ডানদিকটা অসাড় এখন। কাকলি, রিয়া ছাড়াও আয়া আছে, নিয়মিত ডাক্তারের দেখাশোনায় রাখার পরেও অসুবিধা হয়, স্বাধীনতা শব্দটাই যেন ওর জীবন থেকে চলে গেছে। এখন হুইলচেয়ার সর্বস্ব জীবন! তবে ডাক্তার বলছেন, এখন অনেক ভালোর দিকে। ধরে ধরে হাঁটানোও যায় প্রদীপকে। দুবেলাই অল্প অল্প হাঁটায় ওরা।

- ডাকছিলে? বলো?
- মামনি ফিরেছে?
- এই তো মিনিট দশ হল।
- মেয়েটার জন্য সবসময় মন কেমন করে আমার। আজ ও একবারও আমার ঘরে এলো না তো!

- টিং টং.....এই দেখো বাপি আমি এসে গেছি।
- আস্তে, আস্তে.... উফ্... মেয়ে তো নয় যেন কালবৈশাখী!

ঘরে এসেই বাপিকে জড়িয়ে ধরলো একবার।

এইবার শুরু হল রিয়ার বকবক, একবার হেসে লুটিয়ে পড়ছে, আবার পরক্ষনেই গোমরা মুখে নালিশ করছে সোহমের নামে। ওর ওই ছেলেমানুষীতে সমানে তাল দেয় ওর মা আর বাপি।

আমার চোখ জলে ভরে যায়, মনে মনে শুধু ভাবি....মেয়েটা চলে গেলে কাকলিরা বড্ড একা হয়ে যাবে!


#

সোহম যখন বাড়ি ফিরলো ঘড়িতে প্রায় রাত দশটা। দশটা মানে এমন কিছু রাত নয়। এক-দুই-তিন...পরপর তিন বার বেল বাজানোর পরেও যখন কেউ দরজা খুললো না। তখন নিজের পকেট থেকে চাবি বের করে ফ্ল্যাটে ঢুকলো সোহম। ড্রয়িং রুমের আলো জ্বালতেই চোখে পড়ে গেল খুব পরিচিত ছবিটা। ঘরময় জিনিসপত্র ছেটানো। মদের গ্লাস থেকে শুরু করে সোফার কুশন,সব ওলোট-পালট। নিত্যদিনের এই ছবিটা এখন আর মানসিকভাবে দুর্বল করে না সোহম কে। নিজের জুতো সু-কেস-এ রেখে ধীরে ধীরে সমস্ত জিনিসগুলোকে গুছিয়ে নিজের জায়গায় রাখে এক এক করে। এদিক-ওদিক মা'কে খোঁজে। হঠাৎ চোখে পড়ে যায় ফ্ল্যাটের কমন বাথরুমের ঠিক পাশে মা বসে আছে। পুরোনো ছবি এটা সোহমের বাড়ির। মদ্যপ মা'কে ধীরে সুস্থে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের খাটে শুইয়ে দেয় সোহম । এ.সি-টা চলছিল,তাই দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এসে নিজের ঘরের দিকে চলে যায় ধীর পায়ে।

জামা প্যান্ট ছেড়ে, হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় এসে শুলো এ.সিটা চললেও বড্ড গরম লাগছিলো সোহমের, কিছুতেই শান্ত হতে পারছিলো না ও। বারবার একটাই কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে খালি। রিয়ার কি হবে! মেয়েটা পারবে তো এইসব মানিয়ে নিতে? যদিও রিয়ার কাছে কিছুই লুকায়নি সোহম আর রিয়াও সব জেনেই সোহম কে আপন করে নিয়েছে।

ফোন টা বাজছে, রিয়া ছাড়া এসময় অন্য কেউই হবে না। ইচ্ছে করছিলো না তবুও ফোন না ধরলে মেয়েটা চিন্তা করবে এই ভেবেই ফোন ধরলো সোহম।

-বলো।

ফোনের ওপারে তখন খুশির ফোয়ারা ছুটছে। অফুরন্ত প্রাণশক্তি মেয়েটার মধ্যে। আর সেকারনেই ওকে এতখানি ভালোবাসে সোহম। বেশ কিছুক্ষণ পরে হুঁশ হয় রিয়ার যে সোহমের কোনও সাড়া নেই।

- সোহম? কি হয়েছে? আজ আবার কাকিমণি?
- হুঁ।
- তুমি চিন্তা করোনা বাবু। আর তো মাত্র কয়েকটা মাস। তারপর আমি সব সামলে নেবো। কাকিমণিকে সুস্থ করার দায়িত্ব আমার।

এই বলে সোহমকে শান্ত করতে চায় রিয়া। সোহম তখন ডুকরে কেঁদে ওঠে-ফোনেই। রিয়া ছটফট করতে থাকে। কি করবে বুঝতে পারে না। অনেক বোঝায়। আদর করে কথা বলে। সান্ত্বনা দেয় ওকে-ফোনে যতটা বোঝানো যায় তার থেকেও বেশী। আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকে। সোহম রিয়া অনেক অনেক কথা বলে ফোনে। রিয়ার ভালোবাসা অনুভব করে সোহম। মনকে বোঝায়, শান্ত করে। ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

পাশের বেডরুমে পিয়ালীর নেশাতুর দেহটা পড়ে আছে। 

আমি শুধুই ভেবে যাই....প্রতিটা ফ্ল্যাটের গল্পগুলো একে অপরের থেকে একেবারেই আলাদা। আবার মনে হয় অনেকটাই একই।


#

ভাদ্রের শুরু। শহরজুড়ে একটা চ্যাটচ্যাটানি গরম। পূজোরও আর খুব বেশি দেরি নেই,মনের কাশ বনে অনেকের মতই শরতের আনাগোনা রিয়ারও। শুধুই ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন করে সোহমের মাথার এবং কানের পোকাদের ঘুম ভাঙাচ্ছে। এই কিনবো,সেই কিনবো,এই খাবো,সেই খাবো,কোথায় কোথায় ঠাকুর দেখতে যাবে আরও কত কি! সোহম বিরক্ত হয় না কখনই। কারণ রিয়া না থাকলে সোহমের পক্ষে লড়াইটা খুব অসম্ভব হত। বড়ই নিষ্ঠুর এই পৃথিবী,আমাদের সমাজ...সব কিছুর থেকেই মন উঠে গেছিলো সোহমের। রিয়া ওকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। ভালোবাসতে শিখিয়েছে। সম্পর্কের উপরে কোনরকম আস্থা ছিল না সোহমের। সেই সব কিছুই আবার নতুন করে ফিরে পেয়েছে রিয়ার সাথে পরিচয়ের পরেই। রিসিভার কানে নিয়েই স্মৃতিদের দরজায় কড়া নাড়ে সোহম। ওরা দরজা খুলে দিলে চোখেমুখে লাগে এক ঝাঁক ফুরফুরে হাওয়া...যার নাম-রিয়া।

আজ থেকে প্রায় বছর খানেক আগের কথা। নন্দনে বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে গেছিলো রিয়া। কলকল,হুল্লোড়,হইচই। মেয়েদের কিচিরমিচিরটা বেশ বিরক্তই লাগছিল অফিস ফেরতা সোহমের। সিগারেটের পর সিগারেট,ধোঁয়ায় ডুবে থাকতে ভালো লাগছিল। এই পরিস্থিতি ক্লান্তি কাটায়, না শরীরের শিরায় শিরায় আরও ক্লান্তি টেনে আনে জানা নেই ওর...তবে সারাদিন সিগারেট আর রাতভর গানে ডুবে থাকতে থাকতেই দিন কাটছিল ছেলেটার। বন্ধুরা পার্টি করে,মদ খায়,গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ফুর্তি করে...ওকেও ডাকে ওদের সাথে যোগ দিতে। ও যায় না,ওর ভালো লাগে না...একদম ভালো লাগে না। একদিন-দুদিন অন্তরেই নেশায় বুঁদ হওয়া মায়ের শরীরটাকে টেনে টেনে ক্লান্ত সোহমের হাত,শিরদাঁড়ায় আজকাল যেন কোনও বল পায়না ও,পা দুটোতে হাজার হাজার বছরের ক্লান্তি!

- কি রে বল? কখন ফিরবি তোরা? মায়ের ফোন এসে গেছে এই নিয়ে অলরেডি বার তিন। কি বলবো মাকে?

সোহমের পাশের জটলাটা থেকেই ভেসে আসে মিষ্টি কণ্ঠস্বরটা! ধোঁয়া চোখে ঘুরে তাকায় সোহম। কণ্ঠস্বর যার তার খোলা পিঠটায় প্রথমেই নজর যায় সোহমের। কারণ মেয়েটি সোহমের দিকে পিঠ করেই বসেছিল। রবিন ব্লু রঙের ব্লাউজ আর লাল শাড়ির ফাঁক দিয়ে দেখা গেল ফর্সা চকচকে পিঠটা। কি জানি কেন ,সোহম চোখ ফেরাতে পারছিল না কিছুতেই! অপেক্ষা করছিল এই ভেবেই-যদি এই দিকে তাকায়? রিয়াকে কুনুই দিয়ে গুঁতো মারে সুচরিতা,

- তোকে হাঁ করে গিলছে দ্যাখ রিয়া।

কথাটা কানে যাওয়াতে বেশ লজ্জায় পড়ে যায় সোহম। সাথে সাথেই সেখান থেকে উঠে চলে যাচ্ছিল ও।

- এই যে শুনুন?
- আমাকে বলছেন?
- হ্যাঁ আপনাকেই। কি দেখছেন অমন করে?

দুম করে মুখ ফসকে বেড়িয়ে আসে যে শব্দগুচ্ছগুলো, সেটা মোটেও বলবে বলে ভাবেনি সোহম।

- আপনাকে দেখছিলাম।

ভীষণ অবাক হয় রিয়া। তবে সহজে হেরে যাওয়ার পাত্রী ও নয় তাই বাকিরা “ছেড়ে দে রিয়া...” বলার পরেও ওদের কথায় কান না দিয়ে ছেলেটার দিকে এগিয়ে যায়। হাসি মুখে বলে

- আমি রিয়া, আপনি?

মিষ্টি সহজ স্বভাবের মেয়েটি। প্রথম দেখায় তাই তো মনে হয়েছিল সোহমের।

- আমি সোহম।

প্রথম দিন এইটুকুই কথা হয়েছিল ওদের। এরপর হাসি মুখে ফিরে গেছিল যে যার গন্তব্যে। রিয়ার কলকল কানে কানে পথ চলছিল সোহমের সাথে। বাড়ি ফেরার পথে শুধু বারবার মনে হচ্ছিল কেন ফোন নম্বর চাইল না, কেন আরও আরও কথা বলল না ও। কেন জিজ্ঞাসা করল না কোথায় থাকে?

“হোওওও...এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা......জ্যায়সে” মনে মনে হাসছে সোহম,এই গানটা এখনই বাজাতে হল এফ.এম-ওয়ালাদের। ওরা কি মন পড়তে পারে!

বাড়ি ফিরেই একচোট বকা খেল রিয়া। ওর নাকি কোনও কাণ্ডজ্ঞানই নেই। কথাটা কাকলির মুখে শুনে হেসে ফেলে রিয়া। বলে,

 -মা প্লিস নতুন কিছু বলো। এটা বড্ড একঘেয়ে ডায়লগ।

এবার হেসে ফেলে কাকলিও।

- তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না রিয়া! কবজি উলটিয়ে একবার ঘড়িটা দ্যাখ তো কটা বাজে? রাস্তাঘাটের যা অবস্থা। চিন্তা হওয়াটা কি খুব ভুল? কাকলির চোখে স্পষ্ট ভয় ফুটে ওঠে।

- কি রে...আমাকে কোথায় কোথায় খাওয়াতে নিয়ে যাবি বলছিস না কেন!

এতক্ষণে হুঁশ ফেরে সোহমের।

- শোন। এখন ফোন রাখ,কাল সারারাত ভালো ঘুম হয়নি। খুব ঘুম পাচ্ছে,এটা চা খেয়ে আসছি। এসে কথা বলছি।

ফোন কেটে গেল। রিয়া বুকের ভিতরে ঠিক যেন ঝমঝমিয়ে কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ হল! মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করল রিয়া

- আমি পারব তো? কাকিমণি এবং সোহমকে এক গলা আগুন থেকে বাঁচাতে আমি পারব তো?

আমি কিছুদূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললাম......“পারলে তুমিই পারবে রিয়া।”


#

সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অফিস করে বাড়ি ফিরেছে রিয়া। রোজই ফেরে। কখনো আবার একটু বেশি রাতও হয়ে যায়। কাজের চাপ। আজ মাসের ১০ তারিখ। মাসের শুরুর দিনগুলোতে কাজের প্রেসার বেশিই থাকে। বেশিরভাগ দিনই সোহম নিজের গাড়িতে রিয়াকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে যায়। আজ সোহমের ক্লান্তি এবং মন খারাপ দেখে রিয়া ওকে অফিস ছুটির পরে সোজা বাড়িতে যেতে বলেছে। বলেছে বললে কম বলা হয়,বরং বলা ভালো অর্ডার দিয়েছে। প্রেমিকা তথা হবু বৌয়ের অর্ডারের অবহেলা করবে এমন প্রেমিক পুরুষ হাতে গুনে দু-একজনই পাওয়া যাবে এ সংসারে। সোহম এদের মধ্যে পড়েই না। আর তাই রিয়ার চোখ পাকানো দেখেই বুঝে গেছে এটা এক ধরনের ধমকি। তাই বেশি কথা না বাড়িয়ে সুড়সুড় করে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে। যাবার আগে বলে গেছে

- সাবধানে বাড়ি ফিরিস।

প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই বড় বড় চোখে সোহমের দিকে তাকিয়ে রিয়া উত্তর দিয়েছে

 -কচি খুকি নই। তুই যা আমি ঠিক চলে যাবো।

সোহমের গাড়ি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় ছুটির শেষে বাড়ি ফেরা ব্যস্ত শহরের পথ ধরে। মনে মনে বেশ কিছুটা দুশ্চিন্তা এবং মন খারাপ নিয়ে বাড়িমুখো বাস ধরে রিয়া। কলকাতা লন্ডন হল কিনা জানা নেই রিয়ার তবে শহরের রং বদলাচ্ছে এটুকু চোখে পড়ে যায়। শহরে এখন চলে এ.সি বাস। এইরকমই একটা বাসে চেপে বাড়ি ফিরে এল রিয়া। যতই বৃষ্টি হোক না কেন ভাদ্র মাস স্বভাবগত ভাবেই ভ্যাপসা গরম ছড়ানোর কোনও সুযোগই হাতছাড়া করছে না।

ডোরবেল-এ ক্লান্ত আঙুলের চাপ দিয়ে এলানো শরীরে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়া। দরজা খুলল বুলু পিসি।

- এতক্ষণে এলি? বাব্বা! আজাকালকাল মেয়েদের কোনও কায়দাই আমাদের সাথে মেলে না। যেমন ছিরির পোশাক! তেমনই বেপরোয়া জীবনযাপন যাকগে, আয় মা ঘরে আয়। ঘরে খোঁড়া বাপটাকে একা হাতে সারাদিন সামলাচ্ছে প্রেসার-সুগারের রুগীটা। তবু তোদের মনে মায়া দয়া নেই রে মা!

মাথার তালুতে লুকিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরিটা থেকে তখন অলরেডি অগ্নুৎপাত শুরু হয়ে গেছে রিয়ার। ফোনটা ক্রমাগত ভাইভ্রেট করছে। জিন্সের পকেট থেকে এক হ্যাঁচকায় ওটাকে টেনে বের করে রিসিভ বাটনে হাত রেখে বলে দিল

- ঠিক মত পৌঁছে গেছি। তুই এখন ফোন রাখ।
- ঐ ছেলেটার ফোন বুঝি? কি যেন নাম ছেলেটার?

পিসির প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো দূরের কথা,প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই দুমদুম করে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে রিয়া।

- সোহম।

নিচুস্বরে জবাব দিল কাকলী। ফ্ল্যাটের পরিবেশ ততক্ষণে অনেকখানি গুমোট। বুলু পিসি হল বাবার মেঝ দিদি। একেবারে বাংলা সিরিয়ালের খল চরিত্রগুলোর সাথে এই পিসির কোনও তফাৎ খুঁজে পায় না রিয়া। অথচ চার দিদির পরে একটি মাত্র মাত্র ভাই রিয়ার বাবা। আর তাই দিদিদের নয়নের মণি। আর ঠোঁটকাটা এই পিসিগুলোকে চিরজীবন মুখ বুঝে সহ্য করে এসেছে রিয়ার মা। রিয়া যতই গজগজ করুক কোনও ফল হবে না। এরা আসবেই। আর এরা আসা মানেই নিত্যনতুন জট পাকাবে রিয়াদের ছিমছাম সংসারে। এদের মধ্যে সবথেকে ভয়ঙ্কর হল এই বুলু পিসি। সত্তর ছুঁই ছুঁই এই মহিলাটি আপাদমস্তক সুস্থ। রোগবালাইও ওর ধারেকাছে আসতে ভয় পায় মনে হয়। ছেলেপুলেরা যে যার সংসারে ব্যস্ত। পিসি একা থাকেন ওনার স্বামীর ভিটেতে। সাথে থাকে ওনার একটি কাজের মেয়ে। ঝুটঝামেলা নেই। তাই যখন তখনই লোটাকম্বল গুটিয়ে ভাই-বোনেদের বাড়িতে হানা দেয়। আর একবার এসে পড়লে সহজে নড়ার নাম করে না। কাকলির সংসারে ননদদের জন্য নিরামিশ বাসনপত্র আলাদাভাবেই সরানো থাকে। যেকটা দিন পিসিরা বিশেষ করে বুলু পিসি থাকবে সেই কয়েকটাদিন রিয়া বাবার কাছে গিয়ে ঘুমায়। কারণ রিয়ার সারা ঘরময় তখন বুলুপিসির পান,দোক্তা,জর্দার গন্ধ। রাতভর পিসির সাথে শোয়া! সে এক যুদ্ধ! নিজের কানের সাথে চোখের। চোখেরা ঘুমে ঢুলে পড়লেও কান ওদের ডিস্টার্ব করে। বেচারা কান! ওদেরই বা দোষ কোথায়? পিসির বিকট নাক ডাকার পাশে কোনও সুস্থ মানুষই ঘুমতে পারবে না বলে রিয়া মনে করে। আর তাই সারাদিনের ক্লান্ত দেহটা নিয়ে আর নিজের পছন্দের বালিশ এবং পাশবালিশ নিয়ে রিয়া সোজা হাঁটা দেয় বাবার ঘরের দিকে। এতে বাবাও বেশ খুশি হয়। সেটা রিয়া বোঝে।

বাইরের জামাকাপড় ছেড়ে সোফায় এসে বসল রিয়া। প্রতিদিনের মতই ওর জন্য কফি এনে দিল কাকলি। পাশের সোফাটায় বসে তখন জি-বাংলায় মন দিয়েছে বুলু পিসি। হঠাৎ করেই বলে উঠল

- খুকুমণিকে মুখের সামনে চা-জল সবই জোগাড় করে দিতে হয় নাকি রে? আর কতদিন চলবে শুনি এইসব?

কাকলি চুপ করে আছে। ওর অবস্থা এই ক’টা দিন শাঁখের করাতের মতই। একদিকে মেয়ের দাঁত কিড়মিড়,অন্যদিকে ননদের ঝাঁঝাল বাক্যবাণ যখন তখন। কাকলি জানে এই কয়েকটাদিন ওকে চরম ধৈর্যের পরীক্ষা দিতেই হবে,প্রতিবারই হয়। মুখ বন্ধ রাখাই সব থেকে ভালো।

- না ঠিক নয় মেঝদি। মেয়েটা এখুনি এলো খেটেখুটে অফিস থেকে তাই আর কি...
- থাক। আর কত শাক দিয়ে মাছ ঢাকবি। ও না হয় জগৎ উদ্ধার করে এলো,মানে খেটেখুটে এলো। তা বলে কি তুই সারাদিন শুয়েবসে ছিলিস? এভাবে আর কতদিন চলবে বলতে পারিস? সারাদিন তো নিজের অসুস্থ শরীরটা নিয়ে ঐ খোঁড়া মানুষটার সেবা করে চলেছিস। এরপর আবার এই ধিঙ্গি মেয়ের ফাইফরমাশও তোকেই খাটতে হবে? কি জানি বাপু,বুঝিনা এইসব! আসলে কি জানিস তো কাকলি আমাদের সময় তো এইসব ছিল না,তাই ঠিক বুঝতে পারি না।

এতক্ষণ চুপচাপ থাকার পরে এবার মুখ খোলে রিয়া

- পিসি তুমি কতদিন থাকবে?

কেলেঙ্কারি! ঘরের মধ্যে হঠাৎ করেই কেউ যেন খুব জোরে ড্রাম পেটালো। রিয়ার এই প্রশ্নের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না কেউই। প্রদীপ মেয়ের প্রশ্নে ফিক করে হেসে ফেলল। অবশ্যই মেঝদিকে আড়াল করে। চোখ কড়া করল কাকলি। হাসি তো তারও পাচ্ছিল। কিন্তু সে নিরুপায়। বুলু পিসি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,দিদিকে থামিয়ে দিয়ে প্রদীপ বলল

- রিয়া মা,কাল অফিস থেকে ফেরার সময় আমার ওষুধ গুলো নিয়ে আসিস তো,সাথে তোর মাকেও জিজ্ঞাসা করিস মায়ের কি কি লাগবে।

রিয়া,কাকলি দুজনেই বুঝতে পারে প্রদীপ তার দিদিকে বোঝাতে চাইছে যে রিয়া নিজের অফিস ছাড়াও ওর বাবা-মায়ের খেয়াল রাখে।

- আর কথা ঘোরাস না ভাই।

ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে ওঠে বুলু পিসি।

রিয়া,প্রদীপ,কাকলির মতন বাড়ির বাকি সব আত্মীয়রাই জানে। বুলুর পিসির বুলি যতটা তিতো। মনটা ততটা খারাপ নয়। অনেক অল্প বয়সে বিয়ে এবং বিধবা হয়েছে বুলু পিসি। একা হাতে সংসারের সমস্ত দায়দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এত বয়সেও একটুও ফাঁকি দেয়না,কোনরকম ত্রুটি রাখেন না বুলু পিসি। নিজের ক্ষমতার তুলনায় একটু বেশিই বোঝা বইতে হয়েছে বুলু পিসিকে সারাজীবন। তাই হয়তো এতটা কর্কশ। এই রকম বাকবিতণ্ডা এখন ওদের ঘরে চলতেই থাকবে,কথায় কথায় চোখের জলও বেড়িয়ে পড়বে বুলু পিসির...সিরিয়ালে যেমন হয়।

রিয়া বলে- “পিসি তো নয় একটা আস্ত ডেলিসোপ।” 

ওকে চিমটি কেটে থামায় কাকলি। আমারও ইচ্ছে করে রিয়াকে চিমটি কেটে চুপ করতে বলি-তার তো কোনও উপায় নেই। আমি শুধুই দেখি,উপভোগ করি,খুশি হই,দুঃখ পাই।


#


লাস্ট সিন আটটা একুশ। এই নিয়ে চার,পাঁচ বার হোয়াটস্‌ অ্যাপ-এ গেল সোহম। রিয়ার ইনবক্সে দেখল। কিন্তু মেয়েটার হল টা কি,এতক্ষণে তো অনলাইনে এসে যাওয়ার কথা! একটা ফোন করলে হত...ভাবছে সোহম। ভাবতে ভাবতেই ফোনের স্ক্রিন জুড়ে রিয়ার ছবি এবং নাম ভেসে এলো। রিয়া কল করছে।

- কি রে কোথায় তুই?

ফিসফিসে শব্দে রিয়া বলল

- বুলু পিসি এসেছে,কাল কথা হবে বুঝলি।
- দশ মিনিট অনলাইন আয় প্লিস। একটু কথা বলি।
- আজ হবে না,বাবার ঘরে আমি।
- প্লিস,একটু আয়... বলেই ফোনে একটা চুমু দিল সোহম।

রাগ রাগ গলায় বলল রিয়া
- দ্যাখ সোহম,মাথাটা এমনিতেই গরম। তুই আর রাগাস না।

রিয়ার কথায় হেসে ফেলে সোহাম। ও খুব ভালো করেই চেনে বুলু পিসিকে। আর বুলু পিসি এলে যে রিয়ার মুডের চোদ্দটা বেজে যায়,সেটাও সোহমের অজানা নয়। তাই আর বেশি কথা না বাড়িয়েই ফোন রেখে দেয় সোহম। আজ সহজে ঘুম আসবে না,সেটা সোহম জানে। তাই ইউ টিউবে যায়...ওর আর রিয়ার পছন্দের কিছু গান শুনবে মনে করে।

- সোহম শুয়ে পড়েছিস?

মায়ের গলা পেয়ে চমকে ওঠে। এইসময় হঠাৎ মা ওর ঘরে!

- না। এখনও ঘুমাইনি বলো?
- না তেমন কিছু নয় রে। এমনি আজ একটু কথা বলতে ইচ্ছে হল তোর সাথে। আজকাল খুব কম কথা হয় আমাদের!

অবাক হল সোহম মায়ের কথায়। কথাটা ভীষণই সত্যি। কিন্তু মায়ের গলার স্বরে যেন অনেকটা কান্না লুকানো-সোহম টের পেল ভালোভাবেই। সরে গিয়ে বসতে দিল মা’কে। মা-ও বসলো।

- রিয়া কেমন আছে রে? দু-তিন দিন ওকে ফোন করা হয়নি ওকে। কাল ভাবছি একবার কথা বলব।
- ঠিকই আছে।
- তুই ওকে আজ এখন ফোন করলি না!
- করেছিলাম তো। মহারাণীর এখন সময় নেই কথা বলার।
 -সে কি রে! সোহমের সাথে কথা বলার সময় নেই রিয়ার! এটাও কি সম্ভব?
- বুলু পিসি এসেছে। আর বুলু পিসি এলেই ওর মেজাজ তুঙ্গে উঠে বসে থাকে। এখন যতদিন উনি থাকবেন ততদিন আমার এবং বাকিদের সময় খুব খারাপ যাবে। বুঝলে?

বলেই সোহম মুখটা বেজার করে। সোহমের মুখ দেখে হাসি পায় জয়ার। জয়া হেসে ফেলে। মা হাসলে মা’কে খুব সুন্দর দেখায়। সোহম মায়ের হাসি মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। রাতের আবছা আলোয় মায়ের ওই মধুর হাসি...কি যে সুন্দর। রিয়া আর মা-এই নিয়েই সোহমের দুনিয়া। এর বাইরে অফিস ছাড়া ও আর কিছুই বোঝে না। ওর গণ্ডী খুবই সীমিত করে নিয়েছে ও। ওর ভালো লাগে না সমাজের নানান প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে। সবার সব প্রশ্নের উত্তর দিতেও চায় না ও,কারণ ও জানে সমাজকে যতই বুঝিয়ে বলো,সমাজের কৌতূহল কখনও শেষ হওয়ার নয়,আর সব প্রশ্নের উত্তর তো ওর কাছেও নেই। তাই...মুখে কুলুপ আঁটা অথবা নিজের গণ্ডী বেশ কিছুটা ছোট করে নেওয়াটাই মনে হয় শান্তির পথ-সোহম অন্তত এটাই মনে করে।

- কি রে ওভাবে কি এত দেখছিস?

জয়ার প্রশ্নে আদর ঝরে পড়ে। সোহম মায়ের কোলে মাথা রাখে।

- হাসলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগে মা।
- রিয়ার থেকেও বেশী সুন্দর লাগে?

এবার হেসে ফেলে সোহমও। ওর হাসিতে যোগ দেয় জয়াও। অনেকদিন পর সোহম আর জয়া একসাথে বসে কথা বলছে। একসাথে হাসছে। মায়ের আদর অনুভব করতে পারছে আজ সোহম।

- মা,একটা কথা বলব?
- বল। যদিও আমি বুঝতে পারছি তুই কি বলবি,তবুও বল তোর কাছ থেকে শুনি।
- বুঝতেই যখন পারছো তাহলে কেন মা? তোমার তো বয়স হচ্ছে,এবার আস্তে আস্তে নিজেকে সামলাও। আর কতদিন এভাবে চলবে বলো তো? ক’দিন পরে তো রিয়াও থাকবে আমাদের সাথেই। ওর এইসব দেখতে ভালো লাগবে?

একঝাঁক প্রশ্ন হঠাৎ করেই জয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। জয়ার দু-গাল বেয়ে জলধারা নামতে শুরু করেছে তখন। কোনমতে ঢোঁক গিলল ও। নিচু স্বরে বলল

- চেষ্টা তো করছি। কিন্তু পারছি না রে বাবু। ভীষণই একা লাগে জানিস।
- বুঝি মা। আমি সব বুঝি। তাই বলে তুমি যেগুলো করছো নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য,সেগুলো কি ঠিক?
- পার্থও আমাকে সারাক্ষণ এইসবই বোঝায়। তাও...

পার্থর নাম শুনেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলল সোহম। মাঝে মাঝে সোহমের ইচ্ছা হয় মায়ের জীবনের এই অধ্যায়টার সাথে পরিচয় করতে। কিন্তু ভাবতে গিয়েই কেমন যেন গা গুলিয়ে ওঠে ওর। মায়ের মুখেই শোনা,পার্থ সোহমের থেকে বছর দশেকেরই মাত্র বড়। তার মানে চল্লিশ ছোঁয়নি এখনও। ছিঃ। ভাবলেই কেমন একটা লাগে।

- কি রে চুপ করে গেলি যে! কিছু বলবি না?
- নাহ্‌। ঘুম পাচ্ছে।

জয়া বুঝতে পারে সোহম প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চাইছে। আজ প্রায় বছর দুই হল। পার্থর প্রসঙ্গে সোহমের সাথে সেতু বন্ধনটা কিছুতেই সম্ভব করতে পারে নি জয়া। কিন্তু এটা খুবই জরুরী। পার্থ অনেকবার দেখা করতে চেয়েছে সোহমের সাথে। কিন্তু সোহমকে রাজী করাতে পারেনি জয়া। রিয়াকেও জানিয়েছিলো। তবে বিশেষ লাভ কিছুই হয় নি। রিয়া বলেছে,সময় দাও। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। মন খারাপ করে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল জয়া। মন খারাপের সুরে বলল,

- আচ্ছা তুই ঘুমা,আমি আসছি।

সোহম সারা দিল না কোনও। ধীর পায়ে ঘর ছাড়ল জয়া।

- কেউ আমাকে বুঝল না! তাহলে কি আমারই ভুল?

নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করল জয়া। নিজের শোবার ঘরে গিয়ে একটা পেগ বানালো নিজের জন্য। বারান্দায় গিয়ে বসল। আকাশের চাঁদের দিকে তাকাল। একা লাগছিলো নিজেকে,চাঁদের মতই একা।

“তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগী হয়রান হুঁ ম্যায়...হয়রান হুঁ ম্যায়” সোহমের শোয়ার ঘর থেকে ছুটে আসছিল গানের কলিগুলো। ছুঁয়ে যাচ্ছিলো জয়া কে। জয়া জানে ও ঘরে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে সোহম। অসহায় লাগে নিজেকে। রিয়াটাকে খুব তাড়াতাড়ি ওদের বাড়িতে নিয়ে আসতে হবে। অবশ্য অগ্রহায়ণ মাস আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই। এবার শপিং শুরু করা উচিৎ। এইভেবেই নিজেকে জোর করে কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করে জয়া।

জীবনের অধ্যায় অনেক,তবে জরুরী নয়, পাশাপাশি থাকলেও অধ্যায় গুলো একে অপরের সাথে মুখোমুখি থাকবে কিংবা তাদের মধ্যে চেনা জানা থাকবেই।


#


পঞ্চাশ-একান্ন বছর বয়সী জয়া শারীরিক ভাবে এখনও একদমই সুস্থ বলা যেতে পারে। তবে মনের দিক থেকে ভীষণভাবেই দুর্বল। এটা হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। জয়ার যখন সবে চল্লিশ তখন সোহমের বাবা হঠাৎ-ই মারা যান। বিনা নোটিশে একেবারে সমস্ত আকাশটা ভেঙ্গে পড়ে জয়ার মাথার উপর। সোহমের বাবা মারা যাওয়ার সময় ও সবে উনিশ-কুড়ি হবে । একমাত্র ছেলেকে নিয়ে যদিও পথে বসে নি জয়া,তবুও তো মাথার উপর থেকে ছাদ টা উঠে গিয়েছিল ওদের। জীবনটা সেই থেকে বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো যেন। কেমন একটা খামখেয়ালী সর্বক্ষণ কাজ করতো জয়ার মধ্যে। অসহায় লাগত নিজেকে,চেনা-পরিচিত মানুষগুলো হঠাৎ করেই যেন একটা করে মুখোশ পরে নিয়েছিল। অন্ধকার পথে চলতে চলতে বারবারই খেই হারাচ্ছিল জয়া। স্বামীর অফিসের কাজটি জুটে যাওয়ায় ভাতের অভাব হয় নি কখনও ঠিকই,তবুও...বেশ কয়েকটা বছর এভাবেই কাটছিল মা-ছেলের। ধীরে ধীরে হলেও এগিয়ে চলছিল সংসার। তবে ওই ভেসে যাওয়াই,ব্যস এর থেকে বেশি কিছু নয়। জয়ার খামখেয়ালীপনার শেষ ছিল না। ও হয়তো নিজেও জানত না ও এইসব কেন করছে। হয়তো একাকীত্বটাকে মানতে পারছিল না কিছুতেই,হয়তো দায়িত্বগুলো নিতে ভয় পাচ্ছিলো,হয়তো হঠাৎ করে লাগাম ছিঁড়ে গিয়ে উন্মাদের মতন হয়ে ছুটছিল ও! এইরকম অসংখ্য ‘হয়তো’ তখন জয়াকে ঘিরে রেখেছিলো। আর এর সম্পূর্ণ প্রভাব গিয়ে পড়ছিল সোহমের উপর। সোহমের সাথে জয়ার বন্ধনটা ক্রমশঃ আলগা হয়ে যাচ্ছিল। একটা গভীর খাদ তৈরি হচ্ছিল ওদের সম্পর্কের মাঝখানে। পৃথিবীর এক কোণায় তখন সর্বক্ষণ মুখ লুকাচ্ছিলো সোহম। নিজের গণ্ডী ছোট,আরও ছোট করে নিচ্ছিল সদ্য বাবা মারা যাওয়া ছেলেটা। এইরকম সময়েই সোহমের জীবনে আসে রিয়া। রিয়ার সাথে আলাপ হওয়ার পরে সোহম রিয়ার হাত ধরেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে। তবে এটা ঠিক মা'কে সোহম প্রচণ্ডই ভালোবাসত। কিন্তু একই সাথে মায়ের সমস্ত খামখেয়ালীপনাকে মেনেও নিতে পারত না। রাত-বেরাতে অফিসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নেশাতুর পায়ে ঘরে ফেরা। সোহম কি খেলো কি না খেলো তার খোঁজ না নিয়ে বন্ধুদের সাথে কিটি পার্টি,সিনেমায় মেতে থাকা। অনেক সময় অফিস ট্যুরে বাইরে চলে যাওয়া এইসব ক্রমশঃ বেড়েই চলে জয়ার নিত্যদিনের জীবনে। কিছুটা হলেও স্বামীর মৃত্যুর পর একেবারে অভিভাবকহীন হয়ে গেছিলো জয়া। আর ততটাই একা যাচ্ছিলো সোহমও....জয়া কি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিলো না! নাকি শুধুই টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজেকে জিতিয়ে দিতে এইসব করতে শুরু করেছিল? এই প্রশ্নের কোনও সঠিক উত্তর জয়া নিজেও দিতে পারত না-ও কেবলই গা ভাসিয়ে দিচ্ছিলো,পাঁকের ভয় করছিল না একটুও। এই অস্থির অবস্থার ঠিক এগারো বছর পর ওদের জীবনে সব কিছুই প্রায় বদলে গেছিল। সোহমের চাকরী পাওয়া,রিয়ার সাথে প্রেম এবং বিয়ের ঠিক হওয়া এছাড়াও যেটা সব থেকে বেশী করে হয়েছিল রিয়ার মত একটা মিষ্টি,লক্ষ্মী মেয়ের সাথে জয়ারও ভীষণ ভাবে সখ্যতা গড়ে ওঠা। যতটা সোহম ওর মা’কে এতগুলো বছরে চেনেনি,তার থেকে বেশী রিয়া ওর কাকিমণিকে চিনেছে খুব অল্প দিনেই। ওদের সম্পর্কটা তথাকথিত শাশুড়ি-বৌ’এর মত নয়ই। বরং ওরা খুব ভালো বন্ধু। রিয়া ওর কাকিমনি কে অনেক বুঝিয়েছে,সফলও হয়েছে। কিন্তু সোহমকে বোঝাতে পারেনি এখনও। পার্থ আর কাকিমণির সম্পর্কের কথাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না সোহম। যতই হোক মা তো। মায়ের কোনও বয়সে ছোট ছেলে বন্ধু থাকতে পারে-এটা মানতে পারবে না কোনও ছেলে-মেয়েই। তবে রিয়া কিন্তু ওর কাকিমনিকে বিশ্বাস করে,বিশ্বাস করে পার্থ কেও। অবশ্যই ওরা শুধু মাত্র অফিস কলিগ নয়,তার থেকেও বেশী কিছু। কিন্তু ওরা ওদের দায় দায়িত্ব এড়িয়ে শুধুই নিজেদের সুখের কথা ভাবে না। একই অফিসে পাশাপাশি চেয়ারে বসে প্রতিদিন আট-দশ ঘণ্টা একসাথে কাজ করে পার্থ এবং জয়া। প্রথমদিকে জুনিয়ার হিসাবে পার্থকে স্নেহের চোখেই দেখত জয়া। আস্তে আস্তে সেই স্নেহ থেকেই জন্ম নেয় ভালোলাগা। বন্ধুত্ব গভীর হয়। সমাজের চোখে যদিও ওরা খুব ঘৃণ্য কাজ করছিল,কিন্তু ওরা দুজনেই জানে ওদের বন্ধুত্ব,ওদের ভালোলাগাটা কতখানি জরুরী ওদের কাছে এবং একাকীত্বের মত একটা কঠিন রোগের ওষুধ কিছু কিছু মানুষের কাছেই থাকে। সবাই পারে না এই রোগের উপশম করতে। পার্থর গোটা পৃথিবীতে জয়া ছাড়া ভালোলাগা বা ভালোবাসার আর কেউই নেই। পৃথিবীতে আপন বলতে একটি অসুস্থ বৃদ্ধা মা এবং একটি ডিভোর্স করে চলে যাওয়া বৌ-যাকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলো পার্থ। মায়ের লড়াই চলছে মৃত্যুর সাথে,পার্থ লড়ছে মা’কে যতদিন পৃথিবীতে আটকে রাখা যায় এই ভেবে।

মর্নিং ওয়ার্কে বেরিয়ে আজ পার্থ কে নয় বরং রিয়াকে ফোন করল জয়া। জানে পার্থ অপেক্ষা করে থাকবে তবুও। এত সকালে কাকিমনির ফোন!

- বলো? এত সকালে?

ঘুম চোখে বলল রিয়া।

- সারাদিন সময় কই পাই বলতো?

- তা ঠিকই বলেছ।

- শোন না, যে জন্য ফোন করলাম-বিয়ের বাজার শুরু করতে হবে তো? এর মধ্যে একদিন তোদের বাড়ি যাবো ভাবছিলাম। কাকলির সাথে কথা বলে একটা লিস্ট বানিয়ে নেব কি কি কিনতে হবে,তার লিস্ট।

কথাটা শুনেই আমতা আমতা শুরু করল রিয়া,একটু থেমে বলল

- আসবে? এখুনি? শোনো না বলছিলাম যে পূজোটা যাক না তারপর না হয়...

- আচ্ছা,সে নয় হল। কিন্তু পূজোর শপিং? তার কি হবে?

- সে হবে না হয়।

- বুঝলাম। বুলু পিসি এসেছে শুনলাম?

- হুম,

- তাই তুই ভয় পাচ্ছিস? তোর কাকিমনিকে যদি কিছু উল্টোপাল্টা বলে বসে তুই সহ্য করতে পারবি না,তাই তো?

রিয়া সারা দেয় না।

- পাগলী মেয়ে একটা,এত ভালোবাসিস আমায়!

- বাসিই তো,তোমার বুঝি বিশ্বাস হয় না?

- না রে মা! আমার তো মেয়ে ছিল না,কিন্তু সে সাধটাও ঠাকুর পূরণ করে দিলো,তোকে পাঠিয়ে। তুই একদম ভয় পাস না,তোর বুলু পিসিকে আমি ঠিক সামলে নেবো। তাহলে আগামী রবিবার সন্ধ্যায় আমি যাচ্ছি তোদের বাড়ি।

রিয়া হ্যাঁ,না কিছু বলার সুযোগ পেল না। তার আগেই ‘এখন রাখি,বাই’ বলে তড়িঘড়ি ফোন কেটে দিল কাকিমনি।

ফোন কাটার পরেই সামনে মাথা তুলে জয়া দেখলো অভিমানী মুখে ওর কিছুটা দূরে রাস্তার ওপারে পার্থ দাঁড়িয়ে আছে। ঘড়ির দিকে চোখ গেল জয়ার,মিনিট পনেরো লেট। হেসে ফেলে জয়া... মনে মনে ভাবে,ছেলেটা সত্যিই পাগল!

কেউ না জানুক আমি তো জানিই,ভোরের সূর্যের প্রথম আলোর মতই সত্যি এবং পবিত্র ওদের ভালোবাসা। ওরা একে অন্যের সাহারা...পৃথিবীর সব জটিলতা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে সব দুঃখের সাথে লড়াই করতে পারে এখন ওরা। রিয়ার মতই আমিও চাই ওরা ভালো থাকুক,সোহমকে একদিন বুঝতেই হবে-ওদের ভালোবাসা অপবিত্র নয়,কিছুতেই নয়।।


#

বিয়ের বাজার,আচার-অনুষ্ঠান এসব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রিয়ার বুলুর পিসির কাছে চরমভাবেই অপদস্থ হয়ে ফিরে আসছিল জয়া। একটা ছুটির দিনের সন্ধ্যায় রিয়াদের বাড়িতে গেছিল জয়া। রিয়া বাড়িতে ছিল না। ও আর সোহম আজ অনেকদিন বাদে একটু ঘুরতে বেড়িয়েছিল। নন্দন চত্বরে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে নানান আলোচনায় মেতেছিল রিয়া এবং সোহম। আর কিছুদিন পরেই পূজো। পূজোর রেশ শেষ হতে না হতেই ওদের বিয়ে। কত প্ল্যান,কত আনন্দ,কত ভয় এখন ওদের চারপাশে বুদবুদ কাটছে। ওরাও গা ভাসাতে চাইছে। কিন্তু অফিসের কাজের ফাঁকে সময় পাচ্ছে কই? ওরা দুজনেই বেসরকারি ব্যাঙ্ক-এ কাজ করে। সারাদিন গাধার খাটুনি খাটতে হয় ঠাণ্ডা ঘরে বসে। এক একসময় তো মাথা তোলার সময় থাকে না। তবে সুবিধা একটাই ওরা এক ব্রাঞ্চে কাজ করে। তাই দিনের প্রায় আট-দশ ঘণ্টা সময় ওরা একসাথে কাটায়। ব্যস ওইটুকুই। -তোর শপিং শেষ হল রিয়া? শপিং বলাতেই চমকে উঠল রিয়া, আজ তো কাকিমণি গেছে ওদের বাড়ি। কি হচ্ছে সেখানে কে জানে। রিয়া যখন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়েছে সোহমের সাথে দেখা করবে বলে এবং অনেকখানি পথ চলেও এসেছে তখন কাকিমণি ফোন করে বলছে

- আমি কোথায় জানিস রিয়া?
- কোথায়?
- তোদের ডোরবেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি... 

- তুমি আমাদের বাড়িতে! আমাকে জানাও নি কেন? আমি তো সোহমের সাথে একটু... 

- হ্যাঁ। সেজন্যই তো জানাইনি। আজ দুপুরেই সোহম বলল আজ নাকি তোরা দেখা করবি। তাই আর তোকে বলিনি। তুই চিন্তা করিস না,আমি ম্যানেজ করে নেব ঠিক। 

বলেই হো হো করে হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিল জয়া। কাকিমণির মনটা ভীষণ ভালো। 

- এই রিয়া কি ভবাছিস বলতো? 

- আজ কাকিমণি আমাদের বাড়ি গেছে। বিয়ের শপিং এবং নিয়ম-কানুন সব জানতে। বুলু পিসি বাড়িতে। বড্ড চিন্তা হচ্ছে রে! দাঁড়া মা’কে একটা ফোন করি। 

কাকলির ফোনটা কেটে রিয়া চোখ মোছে। কাকিমণিকে মনের সুখে যা-তা কথা শুনিয়েছে ওর বুলু পিসি। কাকলির কোনও উপায় ছিল না যে ও ওর তিতকুটে ননদকে বাধা দেয়। বাবাও দিদির ভয়ে প্রথমে চুপ করেই ছিল কিন্তু শেষে বাবাই পিসিকে থামায়। বলে উনি আমাদের আত্মীয়। তুমি ওনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলাটা বন্ধ কর দিদি। একতরফা বাকযুদ্ধে বুলু পিসিই জিতেছে আজ। আর কাকিমণি সোহম এবং রিয়ার কথা ভেবেই বোধহয় সব শুনে মুখ বুজে সেখান থেকে ফিরে এসেছে। যদিও পার্থ’র প্রসঙ্গে কিংবা ওর উশৃঙ্খল জীবন যাপন সম্পর্কে কাউকেই কৈফিয়ত দেওয়া পছন্দ করে না। সোহমকেও নয়। আসলে কাকিমণি ওর ভালোলাগা মন্দলাগা গুলো কারুর সাথেই শেয়ার করতে চায় না। শুধু রিয়া জানে সবকিছু।

- আর বসব না আজ বুঝলি। 

হঠাৎ করেই বলে ওঠে রিয়া। সোহম বুঝতে পারে সব ব্যাপারটা। ওর আজ ইচ্ছে করছিল রিয়াকে জড়িয়ে ধরতে। রিয়ার ঠোঁটে কিছু সময়ের জন্য ডুবে যেতে। আজ আর সেটা হবে না বুঝল সোহম। কারণ রিয়া সঙ্গ দেবে না। আর রিয়ার অমতে কিছুই করতে ওর ভালো লাগে না। -চলে যাবি? 

- হুঁ। 
- আচ্ছা চল পৌঁছে দিয়ে আসি। 

গাড়িতে যেতে যেতেও চুপ করেই ছিল রিয়া। ট্রাফিকে আটকে গাড়িটা... 

- একটা কিস করবো? 

মুচকি হাসে রিয়া। অসহায় সোহমের গালে আলতো করে ঠোঁট বোলায় রিয়া। সোহমের ভালো লাগে,খুব ভালো লাগে। রিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলে 

- এইভাবেই সাথে থাকবি তো রিয়া? 

- থাকবো। 

কাকিমণির ফোন এল, 

- সব ঠিক আছে বুঝলি? শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছিলি তুই। বললাম না আমি সব সামলে নেবো। 

রিয়া কিছু বলতে পারল না। শুধুই অবাক হল...। ফোন কেটে দিয়েছে কাকিমণি। 

বাড়ি পৌঁছে বুলু পিসির দিকে শুধু একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ল রিয়া।
- মা রাতে আমার রান্না করো না। আমার খিদে নেই। পরিস্থিতি বুঝতে সময় লাগে না রিয়ার বাবা-মায়ের। জয়া বা সোহমকে ওদের পরিবার ভালো করেই চেনে। জয়ার জীবনযাপন কে হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতে পারে না ওরা। তবুও রিয়ার খুশিতেই ওরা খুশি। এবং সোহমের মত ভালো ছেলে সত্যিই বর্তমানে পাওয়া খুব মুশকিল। ওদের একটি মাত্র মেয়ে রিয়া। আর রিয়ার উপরে ওরা ভীষণভাবেই নির্ভরশীল এখন। আর তাই সব মিলিয়ে রিয়ার এই বিয়েতে ওদের কোনওরকম আপত্তি নেই। আগামী অগ্রহায়ণে ওদের বিয়ে। ওরা সুখী হোক-বাবা মা হিসাবে এটাই এখন ওদের কাম্য।


#

সকালের জলখাবারের টেবিলে রিয়া। ছবিটা রিয়ার বিয়ের বছর খানেক পরের। একসাথে জয়া আর রিয়া বসে জলখাবার খাচ্ছিল। মন ভার দুজনেরই। আজ বিকালের ট্রেনে দিল্লী চলে যাচ্ছে জয়া। নতুন চাকরী নিয়েছে সেখানে। না রিয়া পারেনি। কিছুতেই পারে নি সোহমকে বোঝাতে। সোহমের ভাবনার গণ্ডীটায় সোহম নিজেই একটা লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছিল। আর সেই গণ্ডীর এপাশে আসার অধিকার রিয়াও পায়নি। বিয়ের পরে অনেক চেষ্টা করছে রিয়া। কাকিমণিও যথাযথ চেষ্টা করেছে নিজেকে সামলানোর,কিন্তু শেষরক্ষা হল না। আর তাই কাকিমণির এই সিদ্ধান্ত। দিন পনের আগে হঠাৎ একদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে কাকিমণি জানাল

- আগামীমাসের পয়লা তারিখ থেকে একটা নতুন চাকরী জয়েন করব বুঝলি রিয়া।

সোহম এবং রিয়া দুজনেই খাবার থেকে মুখ তুলল একসাথে প্রশ্ন করল

- হঠাৎ!
- এখানে ভালো লাগছিল না,তাই।

সোহম বলল,বেশ কড়া গলাতেই বলল

- তোমার চাকরী করার কি দরকার মা? আমরা তো করছি। তুমি ঘরে থাকতে পারো তো?
- তোর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে করছি। যতদিন ক্ষমতা আছে করব।

এবার রিয়া প্রশ্ন করল,

- কাকিমণি কোন কম্পানীতে যাচ্ছ তুমি?
- দিল্লির একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানী।

থ’ বনে যায় দুজনেই।

- তার মানে তুমি দিল্লী যাচ্ছ?

সোহম জিজ্ঞাসা করে। বেশ বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞাসা করে।

- হ্যাঁ। দিল্লিতেই ওদের হেডঅফিস। আর আমি সেখানেই জয়েন করছি।
- সেই ছেলেটিও নিশ্চয়......

-তা জেনে তোর কি লাভ। রিয়া ওকে এই প্রসঙ্গে কিছু বলতে বারণ কর।

জয়ার গলার শব্দে চমকে ওঠে রিয়া। কাকিমণির এইরকমের গলার শব্দ এর আগে কখনও শোনেনি রিয়া। একটু থতমত খেয়েই সোহমকে থামতে বলে। কোনও বড় ঝড় সামনে দেখতে পাচ্ছে যেন ও। মুহূর্তের মধ্যে দু’জনের চেহারা বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। রিয়া কি করবে! কাকে সামলাবে বুঝে উঠতে পারছিল না।

- তোমার বলতে আপত্তি কোথায় মা? তোমার সঙ্গে তোমার হাঁটুর বয়সী ওই ছেলেটিও কি যাচ্ছে দিল্লিতে? ওর জন্যই কি তুমি এই বয়সে এসে এতটা সাহস দেখাচ্ছ?

- সোহম তুই থামবি?

বিকট জোরে চিৎকার করে ওঠে জয়া।

- সোহম চুপ করো।
- তুমি আর একটা কথা বললে খুব খারাপ হবে, নিজের ঘরে যাও রিয়া।

এই প্রথমবার রিয়ার সাথে এইভাবে শাসনের সুরে কথা বলল সোহম। ঘরের যা আবহাওয়া তাতে অবাক হওয়ার অবকাশ নেই এখন। রিয়া আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে গেল। ও বুঝল এখন ওর কথা আর কেউই শুনবে না। বিয়ের পর থেকে নিজের চোখের সামনেই অনেক ছবি প্রতিদিন বদলাতে দেখছিল রিয়া। নিজের বাবা-মা’ও ওকে আজকাল ভুল বোঝে। ও নাকি বাড়ির খেয়াল রাখেই না। অথচ শুধু টাকাপয়সা দিয়ে নয়। সবসময় ফোন করে খবর নিচ্ছে। সপ্তাহের ছটা দিন প্রাইভেট বাঙ্কে কাজ করার পরেও সাত নম্বর দিনটা ও নিজের বাবা-মায়ের সাথেই কাটায়। তাদের বাজার-হাট,ওষুধ-পত্র সমস্ত কিনে দিয়ে আসে। সোহম এতে একটু অভিমান করলেও ও সোহমকে বোঝায়। বোঝায় তাদের তো রিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। সোহম ঢোঁক গিলে নেয়। কথা বাড়ায় না। সোহমের অভিমান একটাই ছুটির দিনেও রিয়াকে কাছে না পাওয়ার অভিমান। বাকি আর কোনও আপত্তি নেই। এইসব দিক থেকে সোহম এবং কাকিমণি দুজনেই খুব হেল্পফুল। আর ওরা এইরকম বলেই রিয়া অফিসের পরেও সংসার সামলিয়ে নিজের বাবা-মায়ের এতটা খেয়াল রাখতে পারে।

- তুই থামবি।

ডাইনিং হল থেকে জয়ার চিৎকার ছুটে আসে। ঘোর ভাঙে রিয়ার। নানান চিন্তা মাথায় নিয়ে চেয়ারে গা এলিয়েছিল রিয়া। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে ওর। আজ সকালেই ডাক্তারের কাছ থেকে সিওর হয়েছে ও প্রেগন্যান্ট। খবরটা বাকিদের দেওয়া হয়নি। আজ রাতেই সোহমকে বলবে ভেবেছিল আর কালকে কাকিমণি-মা-বাবাকে জানাত। তার আগেই এই ঝড়। এখন আর এই খবর জানাতে ইচ্ছা করছে না রিয়ার। ও কাকিমণিকে চেনে। আর কাকিমণির দিল্লী যাওয়ার সিদ্ধান্তে যে আর কোনরকম পরিবর্তন হবে না সেটাও রিয়ার জানা। কিন্তু হঠাৎ যে কাকিমণি কেন এইরকম সিদ্ধান্ত নিল সেটাই রিয়া বুঝতে পারছিল না। একবার পার্থ দার সাথে কথা বলতে হবে কাল। জানলে ওই জানবে। কিন্তু সেটা কি করা ঠিক হবে! সোহম জানলে লঙ্কাকাণ্ড ঘটাবে। সাহস করে আবার ডাইনিং এর দিকে পা বাড়ায় রিয়া। দু পা এগোতেই ওর বেডরুমের দরজা ধরাম করে খুলে ভেতরে আসে সোহম। বিছানার উপর ছুঁড়ে দেয় নিজের দেহটা।

- লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ো। গুড নাইট।

কাটা কাটা শব্দে কথাগুলো বলে সোহম শুয়ে পড়ল পাশ ফিরে। এই সোহমকে রিয়া খুব কমই চেনে। মাথায় হাত বোলাতে ইচ্ছে করে। আদর করে বুকের কাছে টানতে ইচ্ছে করে। অনেক আদর করার পরে আগামী খুশীর খবরটা ওকে জানাতে ইচ্ছে করে রিয়ার...কিন্তু সাহস পায়না। আলো নিভিয়ে ঘরের বাইরে আসে রিয়া। কাকিমণির ঘরের দরজা বন্ধ। গজলের সুর ভেসে আসছে ক্ষীণ শব্দে। নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। রিয়া জানে এইসময় কাকিমণি নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছে নেশায়,দুঃখ ভোলার সহজ উপায় এটাই। টেবিল গুছিয়ে ঘরে ফিরে নিজের বিছানায় শোয় রিয়া।

- তুমি থেকে যাও কাকিমণি।

- না রিয়া আর সেটা হয় না। আমি আমার এই জবটাও ছেড়ে দিয়েছি তুই তো জানিস।
- তাতে কি? কলকাতায় অন্য চাকরী পেয়ে যাবে তুমি। একমাসও লাগবে না তোমার চাকরী পেতে।
- তোর ডেলিভারির সময় একমাসের ছুটি নিয়ে আসব আমি। তুই ভয় পাস না। সব গুছিয়ে দিয়েই ফিরব।
- তোমার নাতিকে কে মানুষ করবে? ওর দিদা-ঠাকুমা থাকতেও কি ও আয়ার কাছে...
- কাকলি যতটা পারবে করবে আমি জানি সেটা। তোর উপর ওরা যতই অভিমান করুক না কেন তোর সন্তানকে ফেলতে পারবে না ও।

রিয়া বেশ কিছুটা চমকাল। মা-বাবা রিয়ার উপর অভিমান করে আছে এটা কাকিমণি জানল কিভাবে! রিয়া তো কাউকে কিছুই বলে নি এ বিষয়ে।

- তোমায় এসব কে বলল!

- সব বলতে হয় না রিয়া। সংসারে অনেক কিছুই বুঝে নিতে হয়। আজ তোকে একটা কথা বলি শোন সংসারে যতই করিস না কেন সুনাম পাবি না। পৃথিবীতে কেউই কারুর নয় সবাই আলাদা,সবাই ইন্ডিভিসুয়াল। তাই সবসময় নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হবে।

কথাগুলো বলতে গলা ভিজে আসছিল জয়ার। চোখ মুছল জয়া। চারপাশটা অসম্ভব রকমের শান্তি বিরাজ করছিল যেন। একটা শীত সিলিং থেকে নেমে আসছে। রিয়া আর জয়ার মাঝখানে এখন অনেক গ্যাপ! ভাবনার নয়,মনের নয়...তবুও গ্যাপ!


সিগন্যাল গ্রিন হয়ে গেছে। রাজধানী আজ রাইট টাইমেই তার যাত্রা শুরু করল। ট্রেন ধীরে ধীরে হাওড়া ছাড়ছিল। রিয়া জয়া সোহম নিয়মমাফিক হাত নাড়ছে। ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছে কায়াগুলো। দূরত্ব বাড়ছে...ঝাপসা হচ্ছে চোখ। আমার চোখেও জল। আমি ভালোবাসা,আমি প্রেম। আমি শুরু থেকে রিয়ার গল্পের সাক্ষী। আমি ছাড়া কেউ জানতে পারল না জয়া কেন চলে গেল, সোহম কেন মানতে পারল না সবটুকু, কেন রিয়া পারছে না ওর বাবা-মায়ের ভুল ভাঙাতে, কেন রিয়া শেষরক্ষা করতে পারল না..... সবকিছুকে ঘিরে আছে ভালোবাসা। আর এই ভালোবাসা কাউকে ত্যাগ করতে শেখায়। আবার কাউকে করে তোলে ভীষণরকম স্বার্থপর।




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-