Friday, September 30, 2016

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়







পঞ্চাশ –ষাট :সৃজনশীলতার চাঁদের হাট

আগের সংখ্যায় প্রথম পর্বে আমার কলম, ফেলেআসা সময়ের চালচিত্রে আমার জীবনবৃত্তের একটা খন্ডাংশ লিখেছিল । ১৯৬৫র প্রথম মাসে চাকুরিজীবনে প্রবেশ পর্যন্ত । সময়কে ফিরে দেখা মানে তো শুধু নিজেকে ফিরে দেখা নয় । তাই আমার জীবনবৃত্তের বাকি অংশটুকু আসবে ফিরে দেখা সময়ের স্রোতে, ঘটনার বাঁক আর পাওয়া-না পাওয়ার হিসাবের খাতায় আমার সংপৃক্ত থাকার সূত্রে । 

বিয়াল্লিশে জন্ম, ৪৭-৪৮এ জ্ঞান হয়েছে, মানে বুঝতে শিখেছি । অতয়েব নিজেকে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রজন্মের প্রতিনিধি বলতে পারি । তো, স্বাধীনতার ব্যাপারটা তখন একদমই বুঝিনি , এখন পঁচাত্তর বছর বয়সেই বা কতটুকু বুঝেছি ! বাবার হাতধরে এক সের আটার জন্য রেশনের দোকানে লাইন দেওয়া আর কিভাবে এক সের চাল পাওয়া যায় বাবা মায়ের সেইসব চিন্তার মাঝে স্বাধীনতার মানে বোঝা আমার হয়নি । একদল লোকের সেই সময়ের চোঙা ফোঁকা শব্দগুলো ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়, ভুলো মাৎ, ভুলো মাৎ’ শুনতে বেশ লাগতো ।

যাইহোক সময় তো থেমে থাকে না । বুঝতে শিখলাম সমাজ ও সময়টাকে । আর অন্যরকম এক সমাজ বন্দোবস্তের কথা বলতো যারা, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো । সেদিন সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা যেন ছিল আমাদের জীবনবেদ । সেই যে, সেই কবিতাটা ... 

“আঠেরো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,
আঠেরো বছর বয়সেই অহরহ
বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি” ।

আমি স্কুলের পাঠ শেষ করে কলেজে পা রাখলাম, তখন আমারও বয়স আঠেরো ছুঁয়েছে । তার আগে পঞ্চাশের দশকটাকে দেখেছি তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা যেন এক চেহারা নিতে চাইছে আর ষাটে পৌছে প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার চেহারাটা স্পষ্টতর হল । পঞ্চাশের দশক জোড়া কারখানায় কারখানায় ধর্মঘট, হরতাল শিক্ষক ধর্মঘট, খাদ্যের জন্য কলকাতার রাজপথে মানুষের মিছিল, পুলিশের গুলিতে রাজপথে রক্তের স্রোত । এইসব ঘটনার দিনলিপি আমার মধ্যেও অন্যরকম সমাজ বন্দোবস্তের স্বপ্ন জাগিয়েছিল বৈকি! ১৯৫৮তে আট ক্লাসে পড়ার সময়েই বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য হয়ে গিয়েছিলাম । আজ জীবনের উপান্তে পৌছে সেদিনের দেখা সেই অন্যরকম বন্দোবস্তের স্বপ্নটা এখনও অধরা থাকার যন্ত্রণাবোধ থাকলেও আমি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি আমার মত স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম প্রজন্মের মানুষের চোখে পঞ্চাশ আর ষাটের দশকটা ছিল বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির সেরা সময় । নাটক, গান আর সাহিত্যের ক্ষেত্রগুলির সৃজনকর্মে যেন চাঁদের হাট । সৃজনকর্মের সেই চাঁদেরহাটের উত্তাপ আমিও পেয়েছিলাম ।

থিয়েটারের কাছে এসেছিলাম মধ্যপঞ্চাশেই আট ক্লাসে পড়ার সময় । তারপর থিয়েটার আমাকে কিলতে শুরু করেছিল ষাটের দশক থেকে । মধ্যষাটে রেলের চাকরী নিয়ে চলে গেলাম ছত্তিশগড়ে (তখন মধ্যপ্রদেশ), থিয়েটারও আমার সঙ্গে গেল । সেই মধ্যপঞ্চাশে থিয়েটারের কাছাকাছি আসা থেকে পরের ষাট বছর থিয়েটার আমাকে ছেড়ে যায়নি, আমিও যাইনি । বাংলা থিয়েটারের সেই স্বর্ণ-সময়টাকে ফিরে দেখলে, দেখতে পাই শুধুই ঐশ্বর্য – সৃজনের ঐশ্বর্য ! ১৯৫০এ গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে বেরিয়ে এসে শম্ভূ মিত্র গড়লেন ‘বহুরূপী’ । কলকাতায়, মফঃস্বল বাংলায় গড়ে উঠলো অসংখ্য থিয়েটারের দল । ১৮৫৪তে থিয়েটার সেন্টার খুলে দিল এক নতুন দিগন্ত একাঙ্ক নাট্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করে । মফঃস্বলে, প্রত্যন্ত বাংলার গ্রামে গঞ্জে নাট্যাভিনয়ের অভুতপূর্ব জোয়ার । সে জোয়ারে ভাসলাম প্রবাসে থাকা আমরাও । 

সেই সময়, সেই নাট্য-সময়টাকে ফেরে দেখলে এখনও শরীরে রোমাঞ্চ জাগে । ১৯৫০ কি ৫১ই হবে শম্ভূমিত্রর অসামান্য কন্ঠে সামনে বসে প্রবাদ হয়ে যাওয়া আবৃত্তি ‘মধুবংশীর গলি’ আর শিবপুর গণনাট্যর শম্ভূ ভট্টাচার্যর ব্যালে নৃত্য ‘রানার’আমার স্মৃতিতে এখনও শিহরণ তোলে । আর থিয়েটার ? পঞ্চাশ-ষাটের দুটো দশক ছিল বাংলা থিয়েটারের স্বর্ণ সময়, আর আমি সেই স্বর্ণ-সময়ের থিয়েটারকে চেটেপুটে নিতে পেরেছিলাম । ১৯৫৯এ উৎপল দত্তর ‘অঙ্গার’, ‘৬৫তে ‘কল্লোল’এ কল্লোলিত কলকাতা, ১৯৬০এই অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে এলেন ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র’ । ষাট দশকের সেই সময়টাকে স্বর্ণ-সময় বলবো না তো কি বলবো । শম্ভূ মিত্র, উৎপল দত্ত। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভা সেন, শেখর চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, বিজন ভট্টাচার্যদের মঞ্চাভিনয় প্রত্যক্ষ্য করা আমার সারা জীবনের সম্পদ । শুধু থিয়েটারই নয়, সঙ্গীত ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ছিল জনমুখী সৃজনশীলতায় অনন্য । পঞ্চাশের দশকটা ছিল যুদ্ধোত্তর সাহিত্যের কাল । দেশভাগ, ছিল্লমূল উদবাস্তুস্রোত আর তাদের জীবনযুদ্ধম কর্মহীণতা, শিক্ষক-ছাত্র ধর্মঘট, খাদ্য আন্দোলন, কৃষকের রক্তে কলকাতা রাস্তা রক্তাক্ত হওয়া জন্ম দিয়েছিল তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা, যার অনিবার্য প্রভাব দেখেছিলাম পঞ্চাশ-ষাটের সাহিত্যে । বলা ভালো, আমার তারুণ্য কেটেছে সেই সাহিত্যের মধ্যে থেকেই । আবার এই ষাট দশকের শুরুতেই এসেছিল সাহিত্যে এক নতুনতর বাঁক সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘বিবর’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে (১৮৬১) । সাহিত্যে এলো মানুষের তীব্র অস্তিত্বের সংকট । প্রচলিত মূল্যবোধের নিরাপদ আশ্রয় থেকে বেরিয়ে আসতে সে যেন উন্মুখ প্রতিবাদী । একই ধারায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আত্মপ্রকাশ’ নিয়ে (১৯৬৪) । সাহিত্যের এই বহুকথিত নতুন বাঁক, নাটকের ক্ষেত্রে কিমিতিবাদী ধারা, কিংবা কবিতার ক্ষেত্রে ৬১তে শুরু হওয়া ক্ষণস্থায়ী ‘হাংরি’ ধারাকে অন্ধকারের জীবন-বেদ বলেই মনে করেছিলাম । আমরা যে এক অন্যতর সমাজ বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখেছিলাম । ১৮৫৭র ২য় সাধারণ নির্বাচন থেকেই আমি কম্যুনিষ্ট পার্টির পোষ্টার মারা কর্মী । 

ষাটের দশকটা চিহ্নিত হয়েছিল নব নব সৃষ্টি আর ভাঙা –গড়া্র দশক হিসাবে । ৬১তে রবীন্দ্র জন্ম-শতবার্ষিকী । রবীন্দ্রচর্চা আর তাঁর গানের দিগন্তবিস্তারী উন্মোচন ও ব্যাপ্তির কিছুটা সাক্ষিতো থাকতে পেরেছিলাম ! ষাটের দশটা বছরে বাংলার সমাজজীবনে কত ভাঙা, কত গড়া । ১৯৬৪তে কম্যুনিষ্ট পার্টি দুটূকরো হল, প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতির ধাক্কায় জাতীয় কংগ্রেসের একছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে এলো প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার, ১৩ মাস পরে সেই সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি, উনসত্তরে আবার ২য় যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন এবং একই কায়দায় আবার সরকারের পতন ও রাষ্ট্রপতি শাসন । 

পুরো ষাটের দশকটাই বাংলার সামাজিক ক্ষেত্রটি এক অস্থিরতার সাক্ষি । আমার শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্য থেকে যৌবনে পৌছানো এই সামাজিক অস্থিরতা্য সাঁতার কেটে । ১৯৬৫র প্রথম মাসেই রেলের চাকরী পেয়ে ছত্তিশগড়ে (তখন মধ্যপ্রদেশ) । এই ষাট দশকেই ১৯৬৭র ২৫শে মে, বানহ্লার উত্তর প্রান্তে – তরাই অঞ্চলে এক প্রত্যন্ত গ্রামে জ্বলেছিল একটা স্ফুলিঙ্গ । ‘কারা যেন বললেন বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ । স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল। উথাল-পাথাল হল বাংলার সমাজ । পরের দশকটা হয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর দশক । সেকথা বারান্তরে , আগামী সংখ্যায় । সেই অগ্নি-সময়ের উত্তাপ আমাকেও কিছুটা স্পর্শ করেছিল যে !




Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.