Monday, July 25, 2016

শ্রী প্রণব বসু রায়

sobdermichil | July 25, 2016 |
pranab


রথযাত্রা এবং ঈদের মাসে একগাদা রক্তপাতের মাঝে আমরা কবিতার মতো অস্ত্র তুলে নেই প্রতিবাদে আর প্রতিরোধে। ধর্ম ধর্ম করে চেঁচালেও শত চোখ রাঙ্গিয়ে, আমরা কবিতার ধর্ম ছাড়ি না। মানবতার ধর্ম ছাড়ি না। ছাড়িনা পথ দুর্ভেদ্য জেনেও আগামীর প্রতিটি ক্রোশ। 

এমাসের 'একমুঠো প্রলাপে' শব্দের মিছিলের পক্ষ থেকে আমি শর্মিষ্ঠা  যে মানুষটির মুখোমুখি হয়েছি, তিনি একাধারে যেমন পেশাগত জীবনের নিয়ম রক্ষায় অটুট থেকেও অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দায়িত্ববোধে উদ্দীপ্ত একজন সমাজকর্মী, তেমনি সক্রিয় একজন সাহিত্যসেবী।  তিনি বরিষ্ঠ কবি শ্রদ্ধেয় শ্রী প্রণব বসু রায়।


লিখছেন তো অনেকদিন ধরেই । বাংলা কবিতা জগতের পরিবেশের কোনো হেরফের দেখছেন ? একটু বিশদে বলুন না , প্লিজ … 




পরিবেশ বলতে ঠিক কি জানতে চাওয়া হচ্ছে, আমি পরিস্কার বুঝিনি। যা বুঝেছি তার উত্তরে বলি কবিতাজগতে প্রচুর হেরফের হয়েছে। এখন কলকাতা থেকে সুদূর যে কোন জায়গায় বাস করে একজন কবি খুব সহজে সবার কাছে পৌঁছতে পারছেন। আগে এটা একেবারেই সম্ভব ছিলো না। যোগাযোগের মাধ্যম বলতে ডাক মারফৎ চিঠিপত্র।ফলে উত্তর বা কোন শুভ সংকেত পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতো। মোবাইল দূরে থাক, ঘরে ঘরে টেলিফোনও ছিলো না। তাই এক অঞ্চলের কবিদের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের কবিদের চেনাজানা হবার সুযোগ ছিলো খুব সীমিত, এক জায়গার পত্র পত্রিকা অন্য জায়গায় পাওয়াই যেতো না। এ কারণে অনেক পত্রিকার নামই শুনি নি বা শুনলেও চোখে দেখার ভাগ্য হতো না। কিন্তু এখন বৈদ্যুতিন মাধ্যম যোগাযোগ, জানাশোনার ব্যাপারটাকে একেবারে সহজ করে দিয়েছে। কবি-লেখকদের ও পত্র পত্রিকার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, মেল আই ডি অন্তর্ভূক্ত করে ডাইরেক্টরি পাওয়া যাছে হাতের কাছেই। এর সঙ্গে বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া, মূলতঃ ফেসবুক এক যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছে পরস্পরে যোগসূত্র স্থাপনে। আগে কোন কাগজে একটি কবিতা মুদ্রিত হলে ২০০/২৫০ জন পাঠকের কাছে পৌঁছনো যেতো (আমি লিটল ম্যাগের কথা বলছি)। ফেসবুক কিন্তু নিজেকে প্রকাশের মস্ত সুযোগ করে দিয়েছে। নিজের দেয়ালে, কাউকে ট্যাগ না করেও সহজেই কমপক্ষে দু তিন হাজারের কাছে নিমেষে হাজির হওয়া যাছে। মনে রাখতে হবে আগেও কিন্তু গোষ্ঠী ছিলো তবে প্রতিদ্বন্দিতা তেমন প্রকট ছিলো না। “আয়, বেঁধে বেঁধে চলি”—এই ফর্মূলা তখন তেমন দানা বাঁধে নি। বর্তমান সময়ে একটি নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে। বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ, যাঁরা জীবনের ৫৫-৬০ বছর বয়স পর্যন্ত সাহিত্য চর্চা বা অনুরক্তির ধার দিয়েও হাঁটেন নি, বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন—কেউ ডাক্তারী, কেউ ইতিহাস, অর্থনীতি, অঙ্ক বা অন্য বিষয় পড়িয়েছেন, অবসর নিয়ে তাঁদের হাতে অঢেল সময় ও অর্থ। নানা জায়গায় এঁরা দলবদ্ধ হয়ে একটা সংগঠন তৈরি করে নিজের কবি বলে জাহির করছেন। এই সব সংস্থা স্ফীত হতেও সময় লাগছে না কারণ কোন জায়গাতেই কবি যশোপ্রার্থীর অভাব নেই। যাঁরা অন্য কোথাও লেখা পাঠিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন (সঙ্গত কারণেই), তাঁদের জন্যে এইসব সংস্থার দরজা সব সময়েই খোলা। এঁদের হাতে বিলাস করার টাকাও থাকে, তাই বার্ষিক ৫০০ বা ১০০০ টাকা চাঁদা সহজেই দিয়ে দেন। মাসে মাসে নিজেরা ঘরোয়া সভা করেন, নিজেদের লেখা পড়েন, সবাই সবাইকে বাহবা দেন। নিজেদের টাকাতেই বার্ষিক সংকলন করেন, নিজেরাই কেনেন। এই করে এক প্রকার শ্যুডো কবি শ্রেণি তৈরি হচ্ছে। সাহিত্যের কোন ক্ষতি হচ্ছে না এতে, কিন্তু বিভিন্ন মহতী অনুষ্ঠানে এঁরা হাজির হয়ে সভার নির্দিষ্ট কর্মসূচি ভন্ডুল করে দেবার উপক্রম করছেন, এ নজির আছে। কেন তাঁদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, কে বলেছে তাঁরা ভাল লিখছেন না—ইত্যাদি বিতন্ডা। এঁরা আবার প্রায় সবাই কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ সবই লিখতে পারেন! পারস্পরিক সম্মাননা প্রদর্শেনের ট্রফিতে ঘর ভরে উঠছে। কলকাতাতেও আঞ্চলিক বইমেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ,যা ৪/৫ দিন ধরে চলে, এঁরা ঠিক জায়গা করে নেন। যে মঞ্চে প্রথমদিন জয় গোস্বামী বা সুবোধ সরকার অথবা শ্রীজাত, রাকা দাশগুপ্তরা কবিতা পাঠ করে গেছেন, সেই মঞ্চেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে এঁদের সমুজ্জ্বল উপস্থিতি অনিবার্য। আর একটি প্রবণতা, যা হালফিলের পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে যে বিষয় ভিত্তিক কবিতার প্রকাশ। আমার ব্যক্তিগত মনে হয় এই পরিসরে কবিতা বানানো সম্ভব, সেটা একটা বিশেষ কৌশল। যাঁরা একটু বেশিদিন ধরে লিখছেন, কবিতার মতো দেখতে একটা লেখা তৈরি করা তাঁদের পক্ষে সহজ সাধ্য কাজ- সেই রচনা আসলে কবিতা নয়। একজন কবি কিছুতেই আগে থেকে জানতে পারেন না যে পরের কবিতাটি তিনি ঠিক কখন লিখবেন, কী নিয়ে লিখবেন, কোন ফর্ম্যাটে লিখবেন... তাই পূর্ব নির্বাচিত / নির্ধারিত বিষয়ের ওপর লেখাগুলি প্রায়ই কবিতা হয়ে উঠতে পারে না।

মাঝেমাঝেই রঙ্গ ব্যঙ্গ দেখি, ‘এত কবি কেন ?’ সেটা নাকি সিরিয়াস কবিতার ক্ষতি করছে । আপনার কি মত ? পরীক্ষা পাশ করে কবি হতে হবে ?




এই প্রশ্নটি আমাকে অট্টহাস্যের সুযোগ করে দিল। সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি—কথাটা প্রথম শুনতে পাই সম্ভবতঃ কবি জীবনানন্দের কন্ঠে। অর্থাৎ তাঁর সময়েও অনেকে কবিতা চর্চা করতেন আর জীবনানন্দের বিচারে তাঁদের অনেকেই কবি ছিলেন না। এই কথাটি ত্বরণ পায় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মুখে—এত কবি কেন! সে সময়ে তিনি ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দুজনেই আনন্দবাজারে যুক্ত। সহজেই অনুমেয় প্রতিদিন দেশ দপ্তরে রাশি রাশি কবিতা, ডাকে আসতো। তাই দেখে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঐ পরিহাস বাক্য। না, আমি মনে করি না এটা সিরিয়াস কবিতার কোন ক্ষতি করছে। কবিতা আলু নয় যে একটা পচা আলু বস্তার সবটাকে পচিয়ে দেবে। যিনি ভালো লেখেন তিনি ভালোই লিখবেন। অন্যের খারাপ লেখা তাঁকে প্রভাবিত করে না। প্রত্যেক সিরিয়াস কবিই তাঁর লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে লেখেন। পরিবেশ, বিশেষ পরিস্থিতি, পড়াশোনার গভীরতা কবিকে নানা ভাবে ঋদ্ধ করে। এর সঙ্গে, অবশ্য স্বীকার্য, কবির লেখবার ক্ষমতা। সবাই একই রকম ক্ষমতার (একে অন্য নামে প্রতিভাও বলতে পারি) অধিকারী হন না।এটাই একজনের সঙ্গে অন্যের তফাৎ গড়ে দেয়—শব্দ চয়ন, শৈলী, মনোভাবে প্রত্যেক কবিই আলাদা ও সম্পূর্ণ।প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আমি শ্যুডো কবির কথা বলেছি—না, এঁদেরও ক্ষমতা নেই সিরিয়াস কবিতার ক্ষতি করার। পরীক্ষা পাশ করে কবি—এমন পরীক্ষা চালু হয়েছে নাকি বা দূর ভবিষ্যতে হবার আশংকা আছো? নাচ গানের পরীক্ষা হয়, পাশ করে হাজারে হাজারে, কিন্তু প্রকৃত গায়ক বা নৃত্য শিল্পী হয়ে ওঠে কয়েকজন মাত্র—এও সংস্কৃতি জগতের ন্যাচারাল সিলেকসন।কবি, গল্পকারের ব্যাপারটাও সে রকমই।


সম্পাদনা করেন ? কবি আর সম্পাদকের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি ? মানে , কবি হলেই সে সম্পাদক হবার যোগ্য বা পরেরটা ?



সম্পাদনা, হ্যাঁ করেছি এক সময়ে। কবি ও সম্পাদকের মধ্যে যোগসূত্র মাত্র এটাই যে সম্পাদক নিজেও যদি কবি হন তবে জোগাড় হওয়া কবিতার মধ্যে থেকে অপেক্ষাকৃত ভালোগুলো বেছে নেবার কাজ অনেকটা সহায়তা পায়। একজন ভালো কবি মানেই ভালো সম্পাদক—এটা কিন্তু একেবারেই ঠিক নয়। কবিতা লেখা আর সম্পাদনা, দুটো ভিন্ন প্রকৃতির কাজ। একজন সম্পাদককে পত্রিকার সমগ্র ব্যালেন্সের দিকে নজর রাখতে হয়। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, কোন লেখার পরে কোনটি যাবে, এমনকি পেজ মেক আপ, প্রচ্ছদ নির্বাচন, প্রুফ দেখা বা তার জন্য যোগ্য মানুষকে নিয়োগ করা, ঠিক সময়ে পত্রিকার প্রকাশ—সবই সম্পাদকের ওপর বর্তায়। সম্পাদককে এক কথায় একটা মিউজিক্যাল কনসার্টের ব্যান্ড মাস্টার বলা যায়। কবি কবিতা লিখেই মুক্ত, সম্পাদকের কাজ ঠিক এর পর থেকে শুরু। ব্যাতিক্রম যে নেই তা বলব না কিন্তু বেশির ভাগ কবির মধ্যে সম্পাদনার দক্ষতা থাকে না। অন্যদিকে একজন ভালো সম্পাদক নিজে কিন্তু ভালো কবি নাও হতে পারেন। এ কারণেই আমরা দেখে আসছি যে অনেক পত্রিকায় সম্পাদকের নিজের লেখা থাকেই না। অর্থাৎ তিনি নিজেই নিজের লেখাকে নির্বাচন করেন নি। একজন ভালো সম্পাদকের মধ্যে এই গুণ থাকা খুবই জরুরী। নিজের লেখারও সঠিক মূল্যায়ন করতে সম্পাদককেই হয়। আসলে আমি বলতে চাইছি কবি ও সম্পাদক—দুটো আলাদা ব্যক্তিত্ব। একজনের মধ্যেই এ দুটির বাস, একান্তই বিরল।


কবিতা লিখে পয়সা হয় না । কিছু খ্যাতি বা অখ্যাতি হয় । অন্তত এই বঙ্গদেশে ঘটনাটা এরকমই । অন্য কোথাও কি এর কোনো ব্যত্যয় হয় ?



এই প্রশ্নের উত্তর আমার সঠিক জানা নেই। বাংলা ভাষায় কবিতা লিখলে তার প্রকাশ মূলতঃ ছোট পত্রিকায়, যেখান থেকে কোন টাকা পাওয়া যায় না। বাণিজ্যিক পত্রিকা কিছু দেয়, কিন্তু সে আর ক’টা? এই সামান্য আয়ে জীবন ধারণ সম্ভব হয় নয় বলেই কবিকে চাকরি, ব্যবসায় যুক্ত হতে হয়। তবু তিনি কবিতা লেখেন কারণ তাঁর ভেতরে যে দুর্মর আবেগ কাজ করে—সেটাই তাঁকে ঘাড় ধরে কবিতা লিখিয়ে নেয়।পত্রিকাগুলির আর্থিক অবস্থা জোরদার হলে হয়ত কবিদের কবিতা লিখেই খ্যাতি ও অর্থ, দুটোই জুটবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর কবিতা কোথাও ছাপা হয়েছে, এ খবরেই তাঁকে খুশি থাকতে হচ্ছে, কারণ অনেক সময়ে লেখক কপিও তাঁদের হাতে পৌঁছোয় না। 


রাজসভার কবিরা আগেও ছিলেন , এখনো আছেন । আপনি কি মনে করেন তারাই সত্যিকারের কবিশ্রেষ্ঠ ? তাহার উপরে নাই ?



বাদশা আকবরের নবরত্ন সভা ছিল। কৃষ্ণনগরের মহারাজের সভায়ও নবরত্নের সন্ধান পাওয়া যায়। সমকালের কোন বিষয়ের শ্রেষ্ঠ মানুষকে রত্ন হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে রাজসভায় স্থান দেওয়া হতো। খুব সম্মানের সে পদ। এরপর হীরক রাজার দেশে মুভিতে ব্যাঙ্গার্থে আবার রাজ পারিষদ দেখলাম, একজন কবিও ছিলেন সেখানে। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ওই সিনেমায় কবির চরিত্রটি ছিলো চাটুকারের। তার রচনায় কোন কবিতা পাওয়া যায় নি...ইচ্ছে করেই এই চরিত্রটির সৃষ্টি করেছিলেন সত্যজিৎ। সম্ভবতঃ সত্যজিৎ এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন ক্ষমতা-কেন্দ্রর নিকট সান্নিধ্যে একদল মানুষ জড়ো হয় নানা শাখা থেকে, এঁদের সব থেকে বড়ো গুণ এঁরা শ্রেষ্ঠ চাটুকার। নিছক মনোরঞ্জনের জন্যে বা নিছক ফিল্মমেকার হিসেবে সত্যজিৎ ওই ছবিটা করেন নি। তারপর থেকে ৩৬টা বছর কেটেছে, চাটুকারদের ছায়া উপস্থিতি এখনও রয়েছে। জানতে চাওয়া হচ্ছে তাঁরাই শ্রেষ্ঠ কবি কিনা? আমি করজোড়ে জানাই, এ প্রশের উত্তর আমার জানা নেই। বিচারক তো আসলে মহাকাল। ঠিক সময়ে সে-ই বলে দেবে কে ছিলো শ্রেষ্ঠ। সমকালে কে কত সম্মাননা, সংবর্ধনা পেল, পুরস্কার পেল, কোন পদে আসীন হলো—মহাকালের বিচারে এইগুলো কোন ক্রাইটেরিয়া নয়। রেকর্ড কিপার ছাড়া কারোর এত মনেও থাকে না।


কোথায় আপনার কবিতারা যাতায়াত করে ? জনতায় না নির্জনে ? আপনার কি মনে হয় , কবিরা কোনো ভিন্ন জাতের প্রাণী ?


কোথায় যায়, সে কথা বলা খুব শক্ত, এমন কি আদৌ কোথাও যায় কিনা সে নিয়েও যথেষ্ঠ সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে নিজের লেখালিখি নিয়ে বলতে পারি যে আমি কখনই তাৎক্ষণিক পাঠক মাতানো কবিতা লিখতে পারি নি। এর প্রমাণ কবিতা পাঠের আসরে গিয়ে পেয়েছি। এক এক জনের লেখায় অনেক নাটকীয়তা থাকে, কেউ কেউ স্বরক্ষেপণে মোহিত করে দিতে পারেন উপস্থিত শ্রোতাদের। আমি এটাও মনে করি যে কোন কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে যখন একের পর এক কবি এসে কবিতা পড়ে যান, শ্রোতাদের ওপর তা চাপের সৃষ্টি করে। মাত্র একবার কানে শুনে কোন কবিতার সঠিক মূল্যায়ন করা, আমার ধারণায়, সম্ভব নয়। যাই হোক, নিজের অভিজ্ঞতায় আসি- আমি কবিতা পাঠ করে উচ্চকিত হাততালি বিশেষ পাই নি। কিন্তু আমার কবিতা হাতে নিয়ে পড়ার সুযোগ যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের অনেকের থেকে এ্যাপ্রিসিয়েসন পেয়েছি। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে মনে হয় আমার কবিতা নির্জনতায় বেশি কম্ফর্টেবল। কবিরা আদ্যান্ত বেশি সংবেদনশীল মনুষ্য জাতের প্রাণী বলে মনে হয়।



ভালো কবিতাকে কি জীবনের বেসিক নিডস আর পলিটিক্স থেকে দূরে রাখা উচিৎ ?



কার উচিতের কথা জানতে চাওয়া হচ্ছে? পাঠকের? তাহলে বলি জীবনের বেসিক নিডস আর পলিটিক্স আমাদের জেরবার করে ছাড়ে। জোঁকের মতো কামড়ে ধরে থাকে।এই সময়ে ভাল কবিতা আমাকে শান্ত করে।সুতরাং বলা যায়, নিজের প্রয়োজনেই ভালো কবিতাকে আমি সমান্তরাল ভাবে বহন করি। আর যদি আমাকে কবি হিসেবে জিগ্যেস করা হয় তাহলে বলবো জীবনের বেসিক নিডস আর পলিটিক্স মেনে নিয়েই জীবন অতিবাহিত করতে হয়। আর চলতে চলতেই নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করি, ঋদ্ধ হই, নতুন করে ভাবতে শিখি—এসবের ফসলই আমার পরের কবিতা, সরাসরি হয়ত বলা হয় না, খানিক রেখে ঢেকে, পাঠককে খোঁজার, বোঝার সুযোগ দিয়ে। সুতরাং দু ক্ষেত্রেই দেখছি ভালো কবিতাকে জীবনের বেসিক নিডস আর পলিটিক্স থেকে দূরে রাখতে গেলে এক অলীকপুরীতে গিয়ে বাস করতে হয়।



কবি ও কবিতার কি ধর্ম আছে ? কবিতার কি আলাদা আলাদা দেশ হয় ?



যিনি কবিতা লেখেন, সেই মানুষটি সাধারণতঃ কোন না কোন ধর্মের অনুশাসন মেনে চলেন। লক্ষণ দেখে তাঁকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন, খৃষ্টান... এরকম বলা হয়, তিনি নিজেও তাইই বলেন। কিন্তু যখন তিনি লিখছেন তখন তাঁর কোন ধর্মীয় সত্ত্বা নেই। লেখায় হয়ত এমন কিছু শব্দ চলে এলো যা কোন নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে জড়িত, তখনও দেখা যাবে কবিতাটির মূল বক্তব্য ধর্মাচরণে আবদ্ধ না থেকে একজন মানুষের ভাব, ভাবনা, দুঃখ, সুখ অর্থাৎ মানবিক আবেগের কথা বলা হয়েছে।ফলে সেই কবিতাটির কোন religion থাকলো না। এটাই তো স্বাভাবিক যে যিনি লিখছেন, তিনি যে সমাজে বাস করেন তা থেকেই তাঁর যাবতীয় অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। এই কথাটা আরও স্পষ্ট বোঝা যায় গদ্যের ক্ষেত্রে। একজন হিন্দু লেখক এক মসজিদ বা চার্চের পটভূমিকায় তাঁর রচনাটি নির্মাণ করলেন। এমনও হতে পারে সেই রচনায় ঐ মসজিদ বা চার্চ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তবুও না সেই লেখক, না সেই রচনা কোন ধর্মের চৌহদ্দিতে আবদ্ধ থাকছে। কবিতার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রতি ধর্মেরই প্রচারের বা পালনের জন্য কিছু ছড়া, পাঁচালী ইত্যাদি থাকে, কিন্তু সেগুলোকে তো আর কবিতা বলা যায় না। 

এবং কবিতার কোন দেশ হয় না। বস্তুতঃ কোন শিল্পেরই দেশ থাকে না। কোনো ভাষায় তা লিখিত বা নির্মিত হতে পারে, কিন্তু সেটির মূলের কথা বা ভাবনা অন্য দেশ বা ভাষার মানুষকে আকর্ষণ করে বলেই সাহিত্য অনুদিত হয়, সিনেমায় সাব টাইটেল যুক্ত হয়। সঙ্গীত, নৃত্য, পেন্টিং, ভাস্কর্য ইত্যাদির আবার অনুবাদ ছাড়াই রসিকজনকে তৃপ্তি দিতে কোন অসুবিধে তো হয় না।



আপনার এখন অবধি প্রকাশিত কাব্যগ্রণ্হ কয়টি ও কি কি ? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি ?



আমি তো বেশ খারাপ লিখি, তাই বই করার সাহস পাই নি কখনও। তাছাড়া খরচের দিকটাও থাকে। অন্যদিকে যা লিখেছি, ছেপেছে, সেগুলোকে যত্ন করে রাখি নি কোনদিনই। বই করতে এগুলো খুব আবশ্যক। তবু, ঘটনাচক্রে ২০১৫-র বইমেলায় ‘প্রণয়রাংতা’ নামে আমার একটা কাব্যগ্রন্থ বেরিয়ে গেলো, প্রকাশকের একান্ত আগ্রহ ও আনুকূল্যে। আবার বই করার কথা আমি ভাবি না। এখনও যা অল্পস্বল্প লিখি তা কেউ চাইলে দিই। ছাপা হলে, যদি সে পত্রিকা আমার হাতে এসে পৌঁছোয় (একথা বললাম কারণ ইদানীং দেখছি বেশ কিছু পত্রিকার লেখক কপি পাচ্ছি না, তাঁরা পাঠান না বলে—এই ট্রেন্ড কিন্তু আগে ছিল না), খুশি হই। রেখে দিই। আবার তা হারায়ও।এভাবেই চলবে, যতদিন চলে... 


যদি বলি কবিতা লিখবেন না , তার বদলে মন্ত্রীত্ব পাবেন , জনতার সেবা করবেন । রাজী হবেন ? 




কবিতা না লিখলে মন্ত্রীত্ব পাবো, এই প্রস্তাবে আমি খুব রাজি। তবে সেটা সংস্কৃতি দপ্তরের হওয়া চাই। আমি কবিতা না লিখলে সাহিত্যের কিচ্ছু ক্ষতি হবে না কিন্তু আমি লিটল ম্যাগগুলোকে আর্থিক সাহায্য করতে পারবো। ওটাই তো আসল ধাত্রীগৃহ। ওখানেই জন্মাবে, লালন পাবে ভাবী সময়ের কবি, লেখকরা যাদের হাতে থাকবে তখনকার সাহিত্যকর্মকে নতুন পথে নিয়ে যাবার, সাহিত্যক্ষেত্রে আবার রেনেসাঁ ঘটানোর রথের রশি। আর আমিও লিখবো লুকিয়ে, সে লেখা কেউ দেখতে পাবে না।


ভালো থাকুন দাদা , লেখার ঢাল তরবারি নিয়ে এই রণাঙ্গনে বিচরণ করুন অনেক অনেক দিন। আমাদের শুভেচ্ছা রইলো ।







Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.