সোমবার, জুন ২০, ২০১৬

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

শব্দের মিছিল | জুন ২০, ২০১৬ |
Views:
aniruddhu


পাঁঠা নিয়ে ডাউন কাটোয়া-ব্যান্ডেল লোকালে আমি উঠে পড়লাম। সামনের দিকে ভীড় হয় বলে পিছনের কামরাই আমার পছন্দের। অন্তত সেখানে পাঁঠা নিয়ে দাঁড়ান অনেক নিরাপদ। এইসব জীব নিয়ে চলাফেরার অব্যেস নেই। তবে আমি পাঁঠার বিশেষ পরিচিত। তাই সে আমাকে বিশেষ ঘাঁটাল না। নিজেও কোন গোল করল না। কেবল বেহুলা আসতে একবার নাদ ছাড়ল মাত্র। হিসি করল জিরাট আসার পর। এছাড়া মাঝে মধ্যে নিচু গলায় ডাকছিল ও ইতিউতি তাকাচ্ছিল। পাঁঠার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও চোখের ভাষা পড়ে বুঝলাম মৃত্যুভয় কেটে গেছে তার। এখন তাকে ফ্রেশ লাগছে। হকারের থেকে দশ টাকার ঝালমুড়ি কিনে তাকে খাওয়ালাম। আগের মতই দিব্যি খেয়ে নিল। তারপর ছুটন্ত ট্রেন থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল। 

কিন্তু ঝোঁকের বশে এই কাজটা কি ঠিক করলাম? ট্রেনে বসে সেই ভাবনার অবসর মিলল। আমাদের বাড়িতে কেউ কখনও পাঁঠা পোষেনি। আমাদের বাড়িতে মস্ত উঠোন আছে, গাছপালা আছে। দাদুর আমলের বাড়ি। বড় বড় ঘর। আছে নারকেল, আম, জাম ঘেরা উঠোন। তাই রাখার সমস্যা নেই। পাখি অবদি পোষা হয়েছে। কুকুর নৈন নৈব চ। কিন্তু পাঁঠা? আমি পাঁঠাকে বললাম, কি রে? কি হবে? পাঁঠা বলল,ব্যা। 

বাড়িতে ঢুকলাম সন্ধ্যের পর। পাড়ার কেউ তাই খেয়াল করল না আমি একটা পাঁঠা নিয়ে হাঁটছি। গেট ঠেলে বাড়ির ভেতর ঢুকলাম। আমার ভাইঝি বিদরি লাফাতে লাফাতে এসে রোজকার মত বলল, কাকাই আজ কি এনেছ? তারপর সে পাঁঠা দেখে বিরাট উত্তেজিত হয়ে উঠল। হাততালি দিয়ে লাফাতে লাগল, ওমা! কি সুন্দর কি সুন্দর! 
তা শুনে বউদি রান্না ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল, তোর কাকাই কি এনেছে রে মানু, কাকিমা? 
বিদরি চেঁচিয়ে বলল, কাকিমা নয় মা, পাঁঠা। 
পাঁঠা? কি বলছিস তুই? বলে বউদি হনহন করে বাইরে চলে এল। হাতে খুন্তি। বলল, ওমা! এই আপদটা আবার কোত্থেকে এসে উদয় হল? কাদের পাঁঠা? বের কর শিগগিরি, ওকে বের করে দে মানু। 
পাঁঠার দড়িটা গ্রিলে বেঁধে বললুম, এটা অন্য কারও নয় বউদি। আমাদের। আমি এনেছি।
মানে? তোমার সবেতেই ইয়ার্কি! 
আনলাম বিদরির জন্য। ও পাঁঠা নিয়ে খেলবে।
খেলবে! পাঁঠা কি খেলার জিনিস?
তোমাদের সময় এই বয়সের মেয়েরা পুতুলের বিয়ে দিত। এখন হোয়াটসআপের যুগ। এযুগের মেয়েদের কাছে পুতুল অচল, ওরা পাঁঠা চেনে।
বল কি ঠাকুরপো, নেট প্লাস পাঁঠা? ব্যাপারটা কিরকম একটু লাগছে না? 
না। লাগছে না। কারণ পাঁঠা পাঁঠার। এর কোন বিকল্প নেই। আগেও ছিল না। আর হবেও না। 
বাব্বা! লেকচারে তোমার সঙ্গে কে পারবে ঠাকুরপো। কেবল সুন্দরপানা দেখে একটে মেয়ে জোটাতে পারলে না। 
বিয়েতে আমার রুচি নেই বউদি, তুমি আমাকে আগাপাশতলা চেন। 
দেখব দেখব এই তম্বি কোথা থাকে। কেউ একজন ম্যাও ডেকে ঝুপ করে কোলে এসে পড়ুক, তখন আর পাঁঠা কিনতে হবে না, নিজেই পাঁঠা হয়ে যাবে। তা এটাকে জোটালে কোত্থেকে? 
পরে বলব। এখন এটার জন্য কিছু বন্দবস্ত কর দিকিনি। ব্যাটা আমার রুমালটাকে সাবড়ে দিয়েছে। 
বিরদি লাফাতে লাগল। ও খুশি হওয়ায় আর কেউ তেমন আপত্তি করল না। বিশেষত মা যখন এসে বলল, আমাদের এত বড় উঠোন আছে, সেখানেই থাকবে ও। আমার নাতনির পছন্দ হয়েছে, ও থাক। শুনে  আমি হাঁফ ছাড়লাম। যাক বাবা, ফাঁড়া কাটল! 
এর দিন পনের পর এক ছুটির দিন সকালের দিকে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। এক সুন্দরি যুবতি আমার সামনে এসে বলল, আচ্ছা, এটা কি পাঁঠাবাড়ি? 
আমি বললাম, পাঠকবাড়ি? না না, এটা পাঠকবাড়ি নয়। সেটা আমাদের বাড়ির পিছন দিকটায়। আপনাকে এই রাস্তা দিয়েই ঘুরে যেতে হবে। 
সে বললে, না, পাঠকবাড়ি নয়। পাঁঠাবাড়ি। মনে তো হচ্ছে এটাই। বলে সে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল একবার।
আমি অবাক হয়ে বলি, পাঁঠাবাড়ি? এমন নামে কোন বাড়ি তো এদিকে নেই। আপনি কাদের বাড়ি খুঁজছেন? 
এখানে কী কুসুমঞ্জলিকা থাকে? 
হ্যাঁ। সে আমার ভাইঝি। কিন্তু আমাদের বাড়ির নাম তো পাঁঠাবাড়ি নয়! পাড়ার যদি কেউ বলে থাকে আপনাকে, তাহলে ভুল বলেছে।
পাড়ার কেউ কিছু বলেনি। আপনার ভাইঝিই বলেছে। আমার একটু দরকার ছিল ওর গার্জেনের সঙ্গে। তাই আসা। কুসুমঞ্জলিকা জানে আজ আসব। ওই বলল, আমাদের বাড়ির ল্যান্ডমার্ক হল পাঁঠা। যাকে বলবে মিস, সেই দেখিয়ে দেবে।
আপনি? 
আমার নাম নীলাঞ্জনা। বাংলা পড়াই। কাল গরুর রচনা লিখতে দিয়েছিলাম। তখন  কুসুমঞ্জলিকা বলে যে সে পাঁঠার রচনা লিখবে। আমি খুব আশ্চর্য হয়ে যাই, বুঝলেন। ও বলে, আমার কাকাই এক দুঃখী পাঁঠা কিনে এনেছে। কাকা না কিনলে সেটা এতক্ষণ মানুষের পেটে চালান হয়ে যেত। পাঁঠাটাকে ও খুব ভালবাসে। বিকেলে পাঁঠা নিয়ে খেলা করে। তাই  লিখতে চায়। 
বলে সে নিজেই গেট ঠেলে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে। বলে, আমি তো ঠিক করেছি এবার থেকে ছেলেমেয়েদের আর গরুর রচনা লিখতে দেব না। আমিও তো ছোটবেলায় লিখেছি, আপনিও লিখেছেন। ফেসবুকেও ত একজন দেখলুম গরুর রচনা পোষ্ট করেছে। কি বিতিবিচ্ছিরি ব্যাপার বলুন ত! ফেসবুকেরও গরুর রচনা থেকে মুক্তি নেই, ভাবা যায়? তাই ঠিক করেছি এবার থেকে সেই ক্লাট ফিগার গরুর বদলে পাঁঠার রচনা লেখাব।

সোফায় বসে নীলাঞ্জনা একাই বকে যাচ্ছে। তার সামনে হাসি মুখে বসে আছে বিদরি। মেঝেতে। হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে বৌদি আর মা। তারা কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছে না। আমি দরজার কাছে ঘুরঘুর করছি। যতটা না ওর কথা শোনার জন্য, তার চেয়ে বেশি পলকে পলকে ওকে দেখার জন্য। বেসরকারি ইস্কুলের দিদিমণিরা এমন সুন্দরি হয়, জানা ছিল না। যেমন গায়ের রঙ, তেমনি চোখ মুখ। ফুল আঁকা কুর্তি পরেছে, নীল লেগিন্স। পনিটেল করা চুল। চুলের লেয়ার কাটের একটা অংশ সামনে ঝুলছে। সেটা মেরুন রঙের। ওকে দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি নার্সারিতে ভর্তি হয়ে যাই। 

বকে চলেছে নীলাঞ্জনা, ও আমাকে বলে জানো মিস, আমাদের পাঁঠা কথা বলে মানুষের মতন। আমি বলি, আরে ও তো পাঁঠা, ব্যা বলবে। ব্যা বলাই যে ওদের কাজ। কুসুমঞ্জলিকা বলে, না গো দিদিমণি; ওই ব্যা মানে ধরে নিতে হয় সে অনেক কথা বলতে চাইছে। তুমি ওর সঙ্গে কথা বলে দেখ, তোমাকেও বলবে। 
মা, বৌদির হাতে নীলাঞ্জনার খাতির যত্ন শুরু হয়ে গেল। আমার কেন জানি মনে হতে লাগল, পাঁঠাকে বলির আগে যেমন খাতির করা হয়, এ হল সেই। যেমন বিদরি, তেমনি তার ইস্কুল, তেমনি দিদিমণি! আজব মাইরি। দাদা আর ইস্কুল খুঁজে পেল না। শহরের মেয়ে, কাউকে কোনদিন ঘরে পাঁঠা পুষতে দেখেনি। কি আজব! বিদরি সকলকে বলে বেড়ায় আমাদের বাড়ির নাম পাঁঠাবাড়ি। ঝোঁকের মাথায় পাঁঠা কিনে তো আচ্ছে ফ্যাসাদে পরা গেল! 
নীলাঞ্জনার চোখ এবার পড়ল আমার দিকে। গলা তুলে বলল, এদিকে আসুন না আবীরবাবু, বাইরে বাইরে ঘুরছেন কেন?
বৌদি গালে হাত রেখে বলল, ওমা! তুমি ওকে চেন নাকি? 
আপনার মেয়ের মাধ্যমেই চিনি। উনি তো কবিতা লেখেন।
ও বাবা! কই, আমায় তো কখনও কিছু বলেনি।  
বৌদি আড়ালে আমাকে বলল, ও কি পাঁঠা দেখতে এসেছে না তোমাকে?
আমি কি পাঁঠা নাকি? 
আহা, না আসার কি আছে। রোজ রোজ তোমার ভাইঝির কাছে তোমার কত গল্প শোনে। গল্প শুনেই হয়ত—
নীলাঞ্জনা বলে, আমি জানি আবীরবাবু, কি অসহায় অবস্থায় থেকে আপনি পাঁঠাটাকে কসাইয়ের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন।  আপনি কালনা স্টেশনে বসে আছেন ঘরে ফেরার জন্য, ট্রেন নেই, তখন পাঁঠা আপনার কাছে এসে জল খেতে চায়। এভাবেই পাঁঠার সঙ্গে আপনার পরিচয়। সেই পরিচয় গাঢ় হয় যখন আপনি ওকে রোজ ঝালমুড়ি, দিশি বিস্কুট খাওয়াতে শুরু করেন।
আমি হাঁ মুখ বন্ধ করে বললাম, এসব কি বিদরি বলেছে আপনাকে? 
কত বয়স ওর ? দশ? তাতে কি ও সবটা বলতে পারে? ও যা বলেছে আমি বাকিটা কল্পনা করে নিয়েছি। একদিন আপনি সাইকেলে চড়ে অফিস থেকে ফেরার পথে দেখলেন পাঁঠাটা বাঁধা আছে আনিশ কুরেশীর গুমটির সামনে। আপনার মায়া হল। এতদিনের চেনা পাঁঠা বলি হয়ে যাবে এক লহমায়? খট করে সাইকেল থেকে নেমে আপনি টাকা গুনে দিয়ে পাঁঠা নিয়ে ট্রেনে চেপে পড়লেন। 

বিদরি মিসকে টেনে নিয়ে গেল উঠোনে। উঠোনটা বাড়ির পিছনে। সেখানে ঘেরা জায়গার মধ্যে পাঁঠা দিব্যি পাতা চিবিয়ে চলেছে। মা কাজের বউটাকে দশটি করে টাকা দেয় প্রায়। সে কোত্থেকে না কোত্থেকে কাঁঠাল গাছের কটি ডাল এনে পাঁঠার সামনে ফেলে দেয়। পাঁঠার কল্যাণে বাড়িতে এখন সিরিয়ালের টিআরপি কমের দিকে। জাস্ট ভাবা যায় না! বাড়ি ফিরে আতলিকো দি কলকাতার খেলা দেখতে রিমোট নিয়ে টানাটানি করতে হয় না। 

এ পাঁঠা এখন ওর। আমার পাঁঠা এই করে ওই করে বলে হাত পা মুখ নেড়ে বিদরি নানা বক্তিমে শুরু করল। পাঁঠাও সেটা বুঝে আমাকে আর থোড়াই কেয়ার করে। সে এখন বিদরিকে চেনে। মাঝে ওর কিছু বন্ধু পাঁঠাটা দেখতে এসেছিল। পাঁঠা যে এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তলে তলে তা কে জানত! এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অন্য মনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। এসময় নীলাঞ্জনা পাঁঠার কানে সুড়সুড়ি দিইয়ে প্রলুব্ধ করতে থাকল ব্যা বলার জন্য। একটা ব্যা মানেই অনেককিছু। পাঁঠাটা চটে গিয়ে তাকে একটা ঢু মারল। জিদান যেমন ঢুসো খেয়েছিল, তেমনি। টাল রাখতে না পেরে সে সোজা আমার ঘাড়ে। শেষে দুজনে জড়াজড়ি করে একেবারে মাটিতে গড়াগড়ি। বিদরি খিলখিল করে হেসে উঠল। বউদি সভয়ে বলল, সেরেছে। মা আঁক করে রান্না ঘরে ঢুকে পরল। যখন দুজনে উঠে দাঁড়ালাম দেখি কনুইয়ে রক্ত। ইঁটের টুকরোয় থেঁতলে গেছে। নীলাঞ্জনা বলল, কেটে গেছে আপনার।
হ্যাঁ। পাঁঠাটা এমন বজ্জাত কে জানত। আজই বিদেয় করে দেব ওকে।
আরে না না। অমন করবেন না। অবলা জীব।
অবলা? অতিথি চেনে না? 
আজ না চিনলেও কাল চিনে যাবে। বলে সে ঘাসপাতা ছিঁড়ে কাটা জায়গায় ডলে দিল। পাশে কেউ নেই দেখে সাহস যেন বেড়ে গেল আমার। আচমকা বললাম, এতে যদি না সারে? 
সে নিচু গলায় বলল, আমাকে বাঁচাতে গিয়ে হয়েছে বলে বলছেন তো? 
আমি মরিয়া হয়ে বললাম, হ্যাঁ। 
সে দায় আমি নিলাম। 
কিভাবে?
রোজ এসে পাতার রস লাগিয়ে দেব।
তারপর?
সেরে যাবে।
না সারলে?
সে দায়ও আমার।
সেটা মেটাবেন কি করে?  
সে আমার চোখে চোখ রেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। পাঁঠা এ সময় বলল সেই বহু প্রতীক্ষীত শব্দ, ব্যা। অমনি লজ্জা পেয়ে গেল নীলাঞ্জনা। হলুদ গাল লাল হয়ে উঠল। কানের দুলের লম্বা নীল পাথর ঝিলিক দিল। আমারও কেন জানি লজ্জা লজ্জা লাগল। যেন সম্বিত ফিরল আমার। ওর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। আবার আড়চোখে তাকালাম। নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে আসা অগ্রহায়ণের রোদ্দুর হলুদ রঙের এই মেয়েটার গালে যেন কাঁচা হলুদ মাখিয়ে দিয়েছে। মাত্র একঘন্টার জন্য বাড়িতে এসে মেয়েটা যে মস্ত এক সুনামি বইয়ে দেবে মনের ভেতর, বাড়ির ভিতর, কে জানত!  



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-