বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

পবিত্র চক্রবর্তী

sobdermichil | মার্চ ২৩, ২০১৬ |


আজিমপুরের জঙ্গলটা ভয়ানক গভীর । রাত হলেই পরীরা সেখানে ফুটফুটে ডানা মেলে আসে । অন্যান্য দিনের মতই পরীদের রানী তার সখীদের সাথে এসে দেখে , এ কী ! ফুল তো নেই ! বাতাস আজ বইছে না ! চারিদিকে কেমন দুঃখ ভাব ! রানী তখন সখীদের দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে বলে –

“ সখী আজ কেন স্তব্ধ সব –
নেই বাতাসের গান , নেই সৌরভ !”

সখীদের মধ্যে যে প্রধানা সে তখন জাদু আয়নার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে –

“ আয়না সখী আয়না –
গেল কোথায়!
রানীর বড়ই ভাবনা !”

আয়নায় ফুটে উঠল এক দৃশ্য । সবাই দেখে , একদল রাক্ষস এই জঙ্গলে প্রাসাদ গড়ছে । তারজন্য গাছপালা , ফুল-ফল সকলকে ধমক দিয়ে শাসিয়েছে –

“ শোন হে গাছ ফুল বাতাস
থাকবো আমরা –
গোটাতে হবে তোদের নিবাস ।”

সেদিন রাতে পরী রানী তার সখীদের নিয়ে মনের দুঃখে চলে গেল অন্য এক গ্রহে । কিন্তু মনে মনে ঠিক করলে এই রাক্ষসদের শেষ করতেই হবে ।

২।

রাক্ষসদের দলবল রাতের আঁধারে যায় অন্য রাজ্যে হানা দিতে । আর দিন হলেই জঙ্গলে ঢুকে তৈরী করে প্রাসাদের কাজকর্ম । রাক্ষস রাজের হুকুম শ্রমিক রাক্ষসদের –

“ যদি না হয় শেষ প্রাসাদ সাতদিনে –
কটাকট করে মাথা কাটব এই বনে ।”

হাতে আর মাত্র দু’রাত !
বাদশার মনে কিছুকাল হল শান্তি নষ্ট হয়েছে । তার সাধের রাজ্যে ফুল , ফল , নদীগুলো যাচ্ছে শুকিয়ে ।
এমনি এক রাতে পালঙ্কে সবে মাত্র চোখের পাতা লেগেছে রাজকন্যা নুরজাহানের । ঠিক তখনই রানী পরী ডানা নাড়তে নাড়তে রাজকন্যার কানের কাছে ফিসফিস করে বলতে লাগল –

“ রাজকন্যা ওগো নুরজাহান –
তুমিই পারো ফিরিয়ে দিতে
ফুল-ফলের প্রাণ ।”

হঠাৎ ঘুম ভেঙে ভাবে , এ কার কথা ! ভাল করে চারিপাশ চেয়ে দেখতে লাগলেন । নজরে পরে তার পালকের বালিশের কাছে কে যেন তাকে ডাকছে ! অবাক হয়ে গেলেন ! নুরজাহান পদ্মের মত কোমল মুখটি নামিয়ে দেখেন সেই পরী রানীকে ।
ওমা ! পরী রানী হাপুস নয়নে কাঁদছে ! তিনি জিজ্ঞাসা করলেন –

“ মিষ্টি আমার রানী পরী , কাঁদিস কেন ভাই !
আছি আমি , নরম চোখের অশ্রু মোছো তাই ।”

পরী রানী তখন বিষণ্ণ মুখে বলে –

“ নুরজাহান তোমার বড্ড সাহস ,
ফুলের রেণু মলয় বাতাস -
নিয়েছে একদল রাক্ষস ।”

বুদ্ধিমতী রাজকন্যা এবার বুঝলেন , কেন রাজ্যের এমন দশা !  তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ক’টা কথা বলতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল প্রজাপতির মত পরীর মুখে ।

৩।

সারারাত রাক্ষসদের দল আরেক রাজ্যে হানা দিয়ে প্রচুর খেয়ে সকালের প্রথম আলো ফিরে এসেছে জঙ্গলে । রাক্ষস রাজ প্রকান্ড হাঁই তুলে ঘুমাতে গেল । আজ শ্রমিকদেরও শরীরে ক্লান্তির ছাপ । গত রাতে তারাও মহাভোজ করেছে ।  তাই তাদের চোখের পাতাও ভারী । তারা ভাবলে কিছুক্ষণ ঘুম দিয়ে প্রাসাদের বাকী কাজটা সেরে ফেলবে । খানিক পরেই সারা জঙ্গল কাঁপিয়ে ঘোড়ৎ ঘোড়ৎ করে নাক ডাকিয়ে মাত করে তুলে ফেলল ।
রাজকুমারী নুরজাহান সাহসিনী । তার হাতে পরী রানীর দেওয়া জাদুকাঠি । গত রাতে রানী এটি দিয়ে বলেছিল –

“ গাছ-নদী-ফুল শান্তি যারা করে ভাগ –
জাদুকাঠির স্পর্শে ভাঙবে তাদের দেমাক ।”

রাজকন্যা জাদুকাঠি একহাতে বাগিয়ে ধরে এগিয়ে চললেন ।
কিছুটা এগোতেই দেখলেন জঙ্গল শেষ । মরুভূমির মত চারিদিক ! পরে রয়েছে টুকরো গাছের খন্ড । তাদের গা বেয়ে পড়ছে রক্তের ধারা । আরেকটু যেতেই এক বৃদ্ধ জামরুল গাছ রাজকন্যাকে পিছন থেকে ডাকল । ঘুড়ে দাঁড়িয়ে নুরজাহান দেখলেন , বেচারীর হাত পা প্রায় সবকটাই কেটে গেলেছে রাক্ষসেরা ! গাছ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল –

“ অকাল বেলায় ভাঙলে ঘুম –
রাক্ষসগণ হবে চিরতরে নিঝুম ।”

রাজকন্যা বুঝলেন জামরুল গাছ কী বলতে চাইছে । অসময়ে ঘুম ভাঙালে মানুষদের মত রাক্ষসদেরও প্রচণ্ড কষ্ট হবে ! দিনের আলো সহ্য হবে না ।  রাক্ষস প্রাসাদের এক কোণায় ঢুকে রাজকন্যা রাক্ষসরাজের নাকের কাছে জাদুকাঠি বোলাতেই একটা সুন্দর মিষ্টি ধোঁয়া বেড়োতে লাগল । তাতেই ঘুম ভাঙে রাজার । আলো পড়তেই চোখের মধ্যে যেন হাজারটা বিছে কামড়াচ্ছে । দুর্বল লাগছে সারা শরীর তার । রেগে গিয়ে রাক্ষসরাজ বলে ওঠে –

“ কে এমন করল সর্বনাশ -
রোদের তাপে আটকে গেল শ্বাস !”

কষ্ট করে চোখ মেলতেই বিকট রাক্ষস দেখে নুরজাহানকে । তেড়ে যাবে কিন্তু শক্তি যেন শেষ ! সারা শরীরে কারা যেন চাবুক মারছে ! ওদিকে অন্য রাক্ষসরাও রোদের তাপে চিৎকার করছে । তখন রাজকন্যা বলে রাক্ষস রাজাকে –

“ তোমার আমার নেই সংঘাত –
প্রকৃতি করলে নষ্ট
তোমার বংশ হবে নিপাত ।”

মাথামোটা রাক্ষসরাজ থম মেরে বসে থাকে । সে বোঝে কী ভুলটাই না করেছে ! রাক্ষস রাজা বাচ্চাদের মত হাউমাউ কেঁদে উঠে বলে –

“ তুমি ঞ্জানী বীরাঙ্গনা প্রকৃতি সমা –
মানুষের মাঝেও রয় রাক্ষস কর ক্ষমা ।”

রাজকন্যা তখন ধমকের সুরে বলে ওঠেন –

“ রাক্ষসরাজ যত করেছ নাশ গাছ আর নদী –
আজই লাগাও আরও বৃক্ষ বাঁচতে চাও যদি ।”

এই কথা শুনে সকল রাক্ষসেরা কোন এক মন্ত্রবলে মরুভূমিকে আবার সুন্দর জঙ্গলে পরিণত করে দেয় । বইতে থাকে বাতাস , ফুলের সৌরভ আর নদী ।  তার থেকেও আশ্চর্যের ! এসবের ছোঁয়া পেতেই দিনের আলোয় প্রথমবার পেয়ে সকল রাক্ষস মানুষে পরিণত হয়ে যায় । শান্তি ফিরে আসে । বাদশা , নুরজাহান ,পরীরা আর সেই রাক্ষস থেকে নব মানুষেরাও পরম সুখে বসবাস করতে থাকে ।।

পরিচিতি

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-